বেকারের ঘাড়ে খরচের বোঝা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১১ এএম

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করেছেন লালমনিরহাটের নাহিদা হাসান। বর্তমানে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থেকে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে প্রায়ই তাকে ঢাকায় আসতে হয়। এতে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। নাহিদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সপ্তাহে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির একটি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় গিয়েছিলাম। লালমনিরহাট থেকে ঢাকা যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়া সব মিলিয়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আগামী মাসে অডিট অধিদপ্তর ও সমন্বিত ব্যাংকের পরীক্ষা দিতে আলাদা সময়ে আবার ঢাকায় যেতে হবে। অথচ পরীক্ষাগুলো বিভাগীয় শহরে নেওয়া হলে আমাদের মতো বেকারদের খরচ ও ভোগান্তিÑ দুটিই কমত। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের এসব সমস্যার কথা কেউ ভাবে না।

নাহিদার মতো একই অভিজ্ঞতা দেশের অসংখ্য চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীর। পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা তরুণদের একের পর এক চাকরির আবেদন ফি, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও প্রস্তুতির খরচ বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিন বেকার থাকার অনিশ্চয়তা। অথচ নিয়োগ পরীক্ষা বিভাগীয় শহরগুলোয় আয়োজন করা গেলে অনেক প্রার্থীর আর্থিক চাপ ও ভোগান্তি কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাদের মধ্যে ২০ লাখ ৩২ হাজারের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। বেকারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী। ফলে কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা এই তরুণদের জন্য চাকরির প্রস্তুতির ব্যয়ের পাশাপাশি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার খরচও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকির কথা বলা হলেও তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের ঢাকায় আসতে যেমন আর্থিক লস হচ্ছে তেমনি চাপ বাড়ছে ঢাকার।

আবেদনেই খরচ, পরীক্ষায় আরও ব্যয় : সম্প্রতি একটি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা রাজিব দে। চাকরির আবেদন ফি ও পরীক্ষায় অংশ নিতে যাতায়াতের খরচ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করলে ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি দিতে হয় ৫০ থেকে ৫০০ টাকা। শিক্ষা যদি ব্যবসা না হয়, তাহলে বেকারদের চাকরি দেওয়ার নামে এই প্রহসন কেন? আমরা যেখানে থাকা-খাওয়ার টাকা জোগাড় করতে পারি না, সেখানে আবেদন করতেই কেন হাজার টাকা দিতে হবে? আবেদন করলেই তো শেষ নয়, যাতায়াত করতেই আরও ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চলে যায়। অথচ সমস্যা কেউ দেখে না।’

নাহিদা ও রাজিবের মতো অনেক চাকরিপ্রার্থীকে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আলাদা আলাদা সময়ে ঢাকায় আসতে হয়। ফলে প্রতিটি পরীক্ষার জন্য নতুন করে যাতায়াত ও খাবারের খরচ বহন করতে হয়। দূরবর্তী জেলা থেকে আসা প্রার্থীদের কারও কারও থাকার ব্যবস্থাও করতে হয়। যাদের নিয়মিত আয় নেই, তাদের জন্য এসব ব্যয় বহন করা আরও কঠিন।

প্রজ্ঞাপনে আবেদন ফি সর্বোচ্চ ২০০ টাকা : সরকারি চাকরির আবেদন ফি পুনর্নির্ধারণ করে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পিএসসি পরিচালিত বিসিএস পরীক্ষা ছাড়া বিভিন্ন নন-ক্যাডার পদ এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার আবেদন ফি পদভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে আবেদন করতে তাদের কয়েকশ থেকে ১ হাজার টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। আবেদন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা গেলে কর্মহীন তরুণদের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে জানান তারা।

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পদভেদে ২০০ থেকে ৭৫০ টাকা। কোথাও তার চেয়েও বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষকের দুটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে গত ২৪ সেপ্টেম্বর। এতে আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫০ টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অফিস, বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলে ১০০টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে পদভেদে ২০০ থেকে ৬০০ টাকা আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পদভেদে ৪০০ ও ৫০০ টাকা আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক পদের বিপরীতে হাজারো প্রার্থী : চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে প্রার্থীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এর মধ্যেই প্রতিটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ব্যয় তাদের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১ হাজার ৪৮৫টি পদে আবেদন পড়েছে ২১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি। একটি পদের বিপরীতে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী ১ হাজার ৪৩০ জন। সর্বশেষ ৫০তম বিসিএসে ২ হাজার ১৫০ পদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ২ লাখ ৯০ হাজার। এর আগের ৪৯তম, ৪৭তম, ৪৬তম ও ৪৫তম বিসিএসে যথাক্রমে আবেদন এসেছিল ৩ লাখ ১২ হাজার, ৩ লাখ ৭৪ হাজার, ৩ লাখ ৩৭ হাজার ও ৩ লাখ ৪৬ হাজার।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। গত জুনে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেন ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৯ জন। পদ ছিল ৩১২টি। এমন প্রতিযোগিতার মধ্যে চাকরিপ্রার্থীদের বারবার পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য আলাদা করে যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেকের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি।

ঢাকামুখী চাকরিপ্রত্যাশী, বাড়ছে ভোগান্তি : রাজধানীকেন্দ্রিক নিয়োগ পরীক্ষার কারণে অনেক তরুণ পড়াশোনা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতির জন্য ঢাকায় চলে আসেন। তাদের একটি অংশকে বাসা ভাড়া, খাবার ও পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। ঢাকায় টিউশনি বা খন্ডকালীন কাজ করে ব্যয় মেটানোর সুযোগও সবার থাকে না। ফলে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দীর্ঘদিন চাকরির প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হয় অনেককে। অন্যদিকে, যারা নিজ এলাকায় থেকে প্রস্তুতি নেন, তাদেরও ঢাকায় পরীক্ষা দিতে আসতে হয়। একাধিক নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ আলাদা হলে একই যাত্রায় কয়েকটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে না। এতে যাতায়াতের খরচ বাড়ে, সময়ও নষ্ট হয়।

অথচ সরকারি চাকরির কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ঢাকার বাইরে নেওয়ার নজির রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এবং বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বিভাগীয় শহরগুলোয় অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাও একাধিক কেন্দ্রে আয়োজন করা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যেসব নিয়োগ পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থী অংশ নেন, সেগুলোর ক্ষেত্রেও বিভাগীয় শহরভিত্তিক কেন্দ্র চালু করা যায় কি না।

চাকরিপ্রত্যাশীদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্র বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে তাদের যাতায়াত ব্যয় কমবে, দূরবর্তী জেলা থেকে ঢাকায় আসার প্রয়োজন কমবে এবং রাজধানীর ওপর চাপও কিছুতা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি আবেদন ফি নির্ধারণে বেকার প্রার্থীদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করা এবং অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখাও জরুরি।

কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় থাকা তরুণদের কাছে চাকরির পরীক্ষা শুধু মেধা যাচাইয়ের ধাপ নয়; প্রতিটি পরীক্ষায় অংশ নিতে তাদের ব্যয় করতে হয় অর্থ, সময় ও শ্রম। তাই নিয়োগব্যবস্থাকে আরও প্রার্থীবান্ধব করতে পরীক্ষা কেন্দ্র বিকেন্দ্রীকরণ, আবেদন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেকারদের কষ্টের বিষয়টি হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষাকে ব্যবসা নয়, সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে হিসেবে শিক্ষাজীবন পরবর্তী সময়ে চাকরিতে যে ফি নির্ধারণ করা হয়, তা অমানবিক এবং নিষ্ঠুর।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত