পেট্রোবাংলা কেন ব্যর্থতার বৃত্তে

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৪ এএম

প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ দেশের স্থলভাগে অনেক জায়গা অনুসন্ধানের বাইরে। নিশ্চিত গ্যাস রয়েছে, এমন কিছু স্থানেও বছরের পর বছর খননযন্ত্র পাঠাতে পারেনি পেট্রোবাংলা। দেশের স্থলভাগের প্রায় সমপরিমাণ জায়গা রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। সেখানেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে কোনো যোগ্য লোকবল গড়ে তুলতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এই পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। আর ব্যয় মেটাতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশীয় উত্তোলন বৃদ্ধি করা সম্ভব না হলে অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোবাংলা এবং এর কোম্পানিগুলো প্রকল্পভিত্তিক কাজ করে থাকে। এর সঙ্গে প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে। একবার কোনো এলাকায় একটি কূপ খনন করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে পেট্রোবাংলা হাত-পা গুটিয়ে চলে আসে। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পাশাপাশি সরকারি দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানটি।

মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে তেল-গ্যাসের মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশের মতো তেল-গ্যাসের মজুদ থাকা দুই দেশ মালয়েশিয়া এবং ভারতে দুটি সফল তেল-গ্যাস কোম্পানি রয়েছে। সম্প্রতি সরকারকে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। পেট্রোনাস ১৯৭৪ সালে গড়ে ওঠে। এর ঠিক দুই বছর আগে পেট্রোবাংলা গঠন করা হয়। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কেবল চেয়ারম্যান নিয়োগের তুলনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৫২ বছরে ১০ জনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। সেখানে ৫৪ বছরে আমাদের পেট্রোবাংলা পেয়েছে ৩৪ জন চেয়ারম্যান। ভারতের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি) ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটিও দেশের বাইরে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করলেও আমাদের পেট্রোবাংলা নিজেদের সাগরে কূপ খনন তো দূরের কথা, অনুসন্ধান করার মতো কোনো জনবলই গড়ে তুলতে পারেনি। সঙ্গত কারণে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, পেট্রোনাস, ওএনজিসি পারলে আমরা কেন ব্যর্থ হচ্ছি।

পেট্রোবাংলায় কেন এত চেয়ারম্যান দরকার হয় : পেট্রোবাংলায় দীর্ঘ জীবন কাজ করেছেন, এমন ব্যক্তিরা বলছেন, ড. এ ওয়াই এম হাবিবুর রহমান, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং সি কে মো. আব্দুল্লাহর মতো ব্যক্তিরা একসময় পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ছিলেন। তাদের দূরদর্শিতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যার সুফল আজও দেশ ভোগ করছে। অন্যদিকে, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান পদটিতে স্থায়ীভাবে আমলা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর আগেও এই পদে আমলা এবং সেনাবাহিনীর পদস্থ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে সেখানে ভূতাত্ত্বিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের সময়ে কাজের গতি ভালো ছিল বলে মনে করছেন পেট্রোবাংলার সাবেক কর্মকর্তারা। ২০১৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে গত ১২ বছরে আটজন অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত তিনজন সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে পেট্রোবাংলা ছেড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন চেয়ারম্যান কাজ বুঝে ওঠার আগেই তিনি বিদায় নিয়ে চলে যান। নতুন জন এসে কাজ বুঝে নিতে নিতে তারও বিদায়ের সময় হয়ে যায়।

অব্যাহতভাবে দেশীয় উৎপাদন কমছে, পেট্রোবাংলা কিছুই করতে পারেনি : ১০ বছর আগে ২০১৬ সালের জুনে দেশের খনিগুলো থেকে পেট্রোবাংলা গ্যাস তুলেছে গড়ে ২ হাজার ৬৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট করে। এই ১০ বছর ধরেই ক্রমাগতভাবে দেশীয় গ্যাসের উত্তোলনের পরিমাণ কমেছে। গত ১২ অক্টোবর দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৬৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ গত ১০ বছরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে ১ হাজার ৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। এখন যে ১ হাজার ৬৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন হচ্ছে, এর মধ্যে ৯১১ মিলিয়ন ঘনফুট তুলছে বিদেশি দুই কোম্পানি শেভরন এবং তাল্লো। আর বাকি ৭২২ মিলিয়ন ঘনফুট তুলছে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড, সিলেট গ্যাস ফিল্ড এবং বাপেক্স। দেশের যেসব এলাকায় এখনো উত্তোলন ও অনুসন্ধান শুরু হয়নি, সেসব জায়গাতে কেবল বাপেক্স ছাড়া বাকি দুই কোম্পানি কোনো কাজই করে না। এই দুই কোম্পানির কাজের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কেবল তারা বিদ্যমান খনিতে গ্যাসকূপ খনন করে। তাদের তহবিলে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা থাকার পরও আশপাশের এলাকায় কোনো কাজই করে না তারা। এর প্রধান কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি এই তিন কোম্পানির দুটিই উত্তোলন কোম্পানি। আর বাপেক্স কেবল অনুসন্ধান, কূপ খনন এবং উত্তোলনে কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাপেক্সের মতোই অন্য দুই কোম্পানির কাছে নতুন নতুন এলাকা ছেড়ে দিয়ে অনুসন্ধানে জোর দেওয়া উচিত।

একবার কোথাও ব্যর্থ হলে আর সেখানে সহজে যেতে চায় না পেট্রোবাংলা : ইতিহাস বলছে, ২০১৪ সালে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পাবনার সুজানগরের মোবারকপুরে সাড়ে চার কিলোমিটার গভীরে কূপ খননের চেষ্টা করে বাপেক্স। তবে ভূগর্ভে গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় এবং সে সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কাজটি স্থগিত করা হয়। গ্যাসের চাপ যেহেতু ছিল, তাই এখানে গ্যাস পাওয়া যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এখন আবার সেখানে কূপ খনন করার জন্য দরপত্র ডেকে চীনা প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের শুরুর দিকে কূপ খনন শুরু হতে পারে। অনেকটা নিশ্চিত গ্যাস রয়েছে, এমন জায়গায় কূপ খনন করতে কেন প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ার পর ১০ বছর সময় প্রয়োজন হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই ঘটনা সিলেট ১০ নম্বর কূপ এবং সিলেটের জকিগঞ্জ নিয়েও করেছে পেট্রোবাংলা।

অনেকটা নিশ্চিত গ্যাসক্ষেত্র, তাও খবর নেই পেট্রোবাংলার : বাপেক্সের সঙ্গে ২০০৩ সালে কানাডীয় কোম্পানি নাইকো রিসোর্স লিমিটেড যৌথ উদ্যোগে টেংরাটিলায় অনুসন্ধানের চুক্তি করে। কূপ খননের সময় ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন সেখানে পরপর দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে গ্যাসক্ষেত্র ও আশপাশের এলাকায় পরিবেশ এবং জনজীবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আদালতের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ মামলা জিতলেও কূপ খনন শুরু করেনি পেট্রোবাংলা। বাপেক্স বলছে, তারা টেংরাটিলায় কূপ খনন করবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কবে?

দেশের প্রথম দিককার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা। ১৯৫৯ সালে এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেশের শিল্প খাতে প্রথম গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন বিস্ফোরণের ২১ বছর পরও টেংরাটিলায় নতুন করে কূপ খনন করতে পারল না পেট্রোবাংলা, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা উচিত।

ছাতক এবং বিবিয়ানা দেশের বড় দুই গ্যাসক্ষেত্রের ঠিক মাঝামাঝি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় ২০১০ সালে সুনেত্র নামে একটি সম্ভাবনাময় এলাকায় গ্যাস পাওয়া যেতে পারে বলে জানায় পেট্রোবাংলা। দ্বিতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপের পর বাপেক্স একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে। ইতিহাস বলছে, ২০১৩ সালের মার্চে এখানে কূপ খনন শেষ হয়। কিন্তু কোনো গ্যাস পাওয়া যায়নি। তখন অভিযোগ ওঠে, বাপেক্সের এক কর্মকর্তা কূপটির অবস্থান বদলে দিয়েছিলেন। প্রথম যেখানে কূপ খনন করার কথা ছিল, সেখানে কূপ খনন না করে অন্যত্র খনন করা হয়েছিল। এ ঘটনায় বাপেক্সের এক কর্মকর্তাকে ওই সময় শাস্তিও দেয় পেট্রোবাংলা। পরে তৃতীয় মাত্রার জরিপ করেও দেখা যায়, সুনেত্রে গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে। এখন আবার ১৩ বছর পর এসে এখানে কূপ খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাগরে কেন দক্ষ জনবল গড়ে তোলা সম্ভব হলো না : বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকা ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে সমুদ্র এলাকাকে মোট ২৬টি ব্লকে বিভক্ত করে অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকে প্রায় ৬২ হাজার ৩৪ বর্গকিলোমিটার এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকে প্রায় ৫২ হাজার ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা রয়েছে। এই বিশাল সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলা কোনো দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি এসব ব্লকে দরপত্র আহ্বান করলেও বেশিরভাগ সময়ে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্টই করতে পারেনি পেট্রোবাংলা। সাগরে যারা কাজ করে, তারা কেউ ভিনগ্রহের মানুষ নয়। পাশের দেশ ভারত যদি সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারে, পেট্রোবাংলা কেন পারবে না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা দিয়েই আমরা ১৯৯০ পর্যন্ত চলেছি। ১৯৭৫ সালে পেট্রোবাংলায় যোগ দেওয়া এই ভূতাত্ত্বিক বলেন, আমলারাই পেট্রোবাংলাকে ধ্বংস করেছেন। তিনি বলেন, চাইলেই সরকার অন্তত ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উত্তোলন বাড়াতে পারে এবং প্রতিদিন যে ২০০ মিলিয়ন গ্যাস চুরি হয়, তা রোধ করতে পারে। তিনি বলেন, একবার ব্যর্থ হলে আর পেট্রোবাংলা সেখানে সহজে যেতে চায় না এটি একটি বড় সমস্যা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই সমস্যা নিরসনের জন্য সরকারের নীতির পরিবর্তন করতে হবে। আমদানির বদলে দেশের সম্পদ আহরণের দিকে নজর দিতে হবে। দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে, তাদের ধরে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি বিভাগ যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকারকে নানা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত