চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের সভাপতিত্বে প্রথম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৬ সদস্যের সিন্ডিকেটে উপস্থিত ছিলেন না প্রো-ভিসিসহ ১০ জন। ভিসি ছাড়া সভায় অংশগ্রহণকারী পাঁচ সদস্যের কেউই সশরীরে সিন্ডিকেটে অংশগ্রহণ করেনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্যরা অংশ নেয়নি।
চুয়েটের ইতিহাসে এমন সিন্ডিকেট সভা নজিরবিহীন, আইনের দৃষ্টিতেও এটি একটি বিরল ঘটনা। এতে করে এই সিন্ডিকেট সভার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ফিরে চুয়েট ভিসি সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধান অনুযায়ী, উপাচার্য সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করলে রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে চিঠি দিয়ে সিন্ডিকেট সদস্যদেরকে তা জানানো হয় এবং প্রত্যেক সদস্যকে কার্যবিবরণী পাঠানো হয়। তবে চুয়েটের ১৪৫তম জরুরি সিন্ডিকেট সভা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন। উপাচার্য নিজেই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বসে সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন। মুঠোফোনে তিনি সিন্ডিকেট সদস্যদেরকে সভায় যোগদান করতে অনুরোধ জানান।একই সঙ্গে খুদেবার্তার মাধ্যমে সদস্যদের কাছে জুম মিটিংয়ের লিংক পাঠান।
অনলাইনে উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সিন্ডিকেট সভায় মাত্র পাঁচ সদস্য অংশ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদ থেকে মনোনীত এবং বিভিন্ন পর্ষদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্যদের মধ্যে কেউই এই সিন্ডিকেট সভায় অংশ নেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন ঘটনায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে দেশজুড়ে। এতে সভার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) আইন অনুসারে, ২০০৩ এর ১১ নং ধারার (৫) অনুযায়ী উপাচার্য সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেছেন। আইন অনুযায়ী, ১৬ সদস্য নিয়ে সিন্ডিকেট গঠিত হবে। এতে উপাচার্য সভাপতি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। আইনের ১৮নম্বর ধারার (১) এ বলা হয়েছে ভাইস-চ্যান্সেলর, যিনি সভার চেয়ারম্যানও হবেন, প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর, সিন্ডিকেট কর্তৃক পালাক্রমে মনোনীত দুইজন করে ডিন ও পরিচালক থাকবে, সরকার কর্তৃক মনোনীত অন্যুন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদাসম্পন্ন একজন কর্মকর্তা, সরকার কর্তৃক মনোনীত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান হইতে দুইজন প্রতিনিধি, বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম, চ্যান্সেলর কর্তৃক মনোনীত তিনজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ যাদের মধ্যে ন্যুনপক্ষে একজন প্রকৌশল শিক্ষাবিদ থাকবেন, চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম, এবং একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য হতে মনোনীত দুইজন অধ্যাপক সিন্ডিকেটের সদস্য হবেন।
এ ছাড়া আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার সিন্ডিকেট সভার কোনো সদস্য নন, বরং তিনি সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ব্যতীত ১৪৫তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অংশ নেওয়া তিনজন সদস্য সরকার মনোনীত এবং দুইজন সদস্য পদাধিকারবলে সিন্ডিকেট সদস্য। তাছাড়া তারা কেউই সশরীরে যোগ না দিয়ে অনলাইনে সভায় অংশ নিয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদ থেকে মনোনীত এবং বিভিন্ন পর্ষদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্যদের মধ্যে কেউই এই সিন্ডিকেট সভায় অংশ নেননি।
বিধান অনুযায়ী, সিন্ডিকেট সভার মোট সদস্যদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ উপস্থিত থাকলে কোরাম পূর্ণ হয়। ১৪৫তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় মোট ১৬ সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্যসহ পাঁচ সদস্য। এতে দেখা যায়, সিন্ডিকেট সভায় কোরাম পূর্ণ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৪৫তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় চুয়েট সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের (শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি) উত্থাপিত দাবিসমূহ পর্যালোচনাপূর্বক একাডেমিক অচলাবস্থা দূরীকরণ ও শ্রেণিকক্ষ কেন্দ্রিক নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পুনরারম্ভের রূপরেখা নির্ধারণ নিয়ে আলোনা হয়। পরে সভায় তিনটি প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে-
১. শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত চালুর আহ্বান এবং উদ্বেগ প্রকাশ।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলমান অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া এবং সম্ভাব্য সেশনজটের ঝুঁকি তৈরিতে সিন্ডিকেট গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থ, শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে (শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী) দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে অবিলম্বে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফেরত আসার জোর আহ্বান জানানো হলো।
২. স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের সিদ্ধান্ত।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে দ্রুত স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ও পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনদের (শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রতিনিধিগণ) নিয়ে সমন্বিত আলোচনা ও মতবিনিময় সভা আয়োজনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত পেলো।
৩. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত বা পরামর্শক কমিটি গঠনের সুপারিশ।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী: বিদ্যমান একাডেমিক অচলাবস্থা নিরসন এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম টেকসই ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখার মাধ্যমে অনতিবিলম্বে পুনরারম্ভ করার লক্ষ্যে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি বিশেষভাবে সুপারিশ পাঠানো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। উক্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই সমাধান প্রস্তাব পেশ করবে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা উপাচার্য ভবনে তালা লাগিয়ে দেন। একই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি শুরু করেন। এতে ক্লাস-পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১২ অক্টোবর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। ওই দিন দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে কার্যালয় ছাড়ার আলটিমেটাম দেন তারা। পরে দুপুর ১২টার পর ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে শিক্ষার্থীরা। এতে উপাচার্যসহ ভবনের ভেতরে ১১ জন আটকা পড়েন। পরদিন উপাচার্য অসুস্থবোধ করলে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় উপাচার্যসহ আটকে পড়া ব্যক্তিরা বের হওয়ার সুযোগ করেন দেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
অনলাইনে চুয়েট উপাচার্যের সিন্ডিকেট সভা, ৯ জনই অনুপস্থিত
চুয়েটের নতুন ভিসিকে শিক্ষকদের প্রত্যাখ্যান, সর্বাত্মক অসহযোগ
২৫ ঘণ্টা অবরুদ্ধ চুয়েট ভিসি, ‘অসুস্থতা’ নিয়ে প্রশ্ন