ডিজাইনে এআইয়ের প্রভাব

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২২ এএম

একসময় পোস্টার, ব্যানার ও সামাজিক মাধ্যমের জন্য বিজ্ঞাপনের ডিজাইন তৈরি করতেন গ্রাফিক ডিজাইনারা। পণ্যের ছবি তুলতে প্রয়োজন হতো ফটোগ্রাফারের; ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড সরানো বা মান বাড়াতেও আলাদা দক্ষতার দরকার হতো। এখন এসব কাজের অনেকটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা যায়।

এর প্রভাব ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার ও ফ্রিল্যান্সারদের কাজে পড়তে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাফিক ডিজাইনারদের চাহিদা দ্রুত কমছে। প্রতিবেদনটিতে এআই ও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্রাফিক ডিজাইনাররা জানান, আগে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে যে পরিমাণ ডিজাইনের কাজ পাওয়া যেত এখন সে তুলনায় কাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্থানীয় বাজারেও বিজ্ঞাপন ডিজাইন, পোস্টার, ব্যানার, সাধারণ লোগো ও বিভিন্ন ওয়েবভিত্তিক ডিজাইনের কাজের চাহিদা কমছে। সৃজনশীল ডিজাইনারদের একটি অংশ এআইকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের কাজের ধরন বদলাচ্ছেন।

রাজধানীর সবুজবাগের একটি কম্পিউটার দোকানে কাজ করেন রিদওয়ান হোসেন; বেশি দিন হয়নি কাজে যুক্ত হয়েছেন। ফটোশপের অ্যাডভান্স কাজে দক্ষ না হলেও এআইয়ের সহায়তায় পাসপোর্ট সাইজের ছবি তৈরি করে প্রিন্টসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করছেন তিনি। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভ, রিটাচসহ (ছবি পরিমার্জনা) একসময় ফটোশপে করতে হতো এমন ছবির অনেক কাজ মুহূর্তেই এআইয়ের সাহায্যে করে ফেলেন তিনি।

অন্যদিকে প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করছেন রুবেল হাওলাদার। বর্তমানে রাজধানীর ফকিরাপুলে একটি স্টুডিওতে কাজ করেন। এক সময় তার নিজের একটি স্টুডিও ছিল; কিন্তু ব্যবসায় মন্দাবস্থা হওয়ায় ছেড়ে দিয়েছেন। তার কাজে এআইয়ের প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার কাজ অনেক বেশি ছিল। এখন অনেক কমে গেছে। মানুষ পোশাক বা কোট পরা ছবি এআই দিয়ে তৈরি করে নিয়ে আসে, এরপর শুধু প্রিন্ট নেয়। আগে মানুষ ছবি তোলার পর ফোরআর প্রিন্ট করত, লেমিনেটিং করত, এরপর অ্যালবাম বানাত। এখন এসব কাজ নেই বললেই চলে। এখন উপহারের ছবিও এআই দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলো স্টুডিওতে তোলা ছবির মতো হলেও স্টুডিওতে এসে তা তোলা হয় না।’

রুবেল জানান, ফটোগ্রাফি ও স্টুডিও ব্যবসায় লোকসানের কারণে অনেকেই তা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন। তাদেরও বরিশালে দুটি স্টুডিও ছিল। ঢাকার হাসনাবাদে তার একটি স্টুডিও ছিল। কিন্তু ব্যবসা ভালোভাবে না চলায় সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে নয় বছর ধরে কাজ করা মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন সোহেল। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটে এআইয়ের প্রভাব বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিজাইনের কাজের চাহিদা আগের চেয়ে কমেছে। আগে ডিজাইনক্রাউডে দিনে ২০০ থেকে ২৫০টি কাজ থাকত। এখন সেখানে সারা দিনে ৩০ থেকে ৪০টির মতো কাজ থাকে। ব্র্যান্ডিং লোগোর কাজও কমেছে।

তিনি বলেন, তবে বর্তমানে বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে কাজ জমা দেওয়ার সময় সেটি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এআই আসার কারণে মানুষের কাজের সুযোগ একেবারে শেষ হয়ে গেছে বিষয়টি এমন নয়। নতুন নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। যারা নিজেদের এআইয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছেন, তারা এখনো কাজ করছেন এবং তাদের আলাদা ক্লায়েন্টও রয়েছে। ওয়েবভিত্তিক ডিজাইনের কাজের চাহিদা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে বলেও তিনি মনে করেন।

ফকিরাপুলের একটি প্রিন্টিং প্রেসে ডিজাইনের কাজ করেন শহীদুল ইসলাম। প্রিন্টিং আইটেমের ডিজাইনের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কাস্টমাররা এখন এআই দিয়ে ডিজাইন তৈরি করে এনে সেটির প্রিন্ট চান। কিন্তু প্রেসে প্রিন্টের ফরম্যাট তো আলাদা, ইলাস্ট্রেটরে করতে হয়। এআই দিয়ে তৈরি ডিজাইন অনেক সুন্দর হলেও ইলাস্ট্রেটরে একই ধরনের ডিজাইন তৈরি করতে গেলে বেশি সময় লাগে। তাছাড়া এআই দিয়ে তৈরি ছবির ডিজাইন প্রিন্ট করলে ফেটে যায়। প্রায়ই কাস্টমাররা এ ধরনের প্রিন্ট করতে আসেন, কিন্তু সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি, বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাশরুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এআইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে গ্রাফিক ডিজাইনের ওপর। লো-এল ডিজাইন বা ক্রিয়েটিভ ডিজাইনের বিভিন্ন কাজে এর প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, গ্রাফিক ডিজাইনের বড় একটি ক্ষেত্র হলো এডভারটাইজমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি। লোগো ডিজাইন, প্রকাশনাসহ বিভিন্ন কাজেও এআই খুব কম খরচে ভালো ডিজাইন তৈরি করে দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে।

ওয়েবভিত্তিক বিভিন্ন ডিজাইনের কাজ এখন প্রায়শ এআই দিয়ে করা হয়। এসব কাজে আগের মতো গ্রাফিক ডিজাইনারের প্রয়োজন হচ্ছে না। ফাহিম মাশরুর বলেন, এআইয়ের প্রভাব ফ্রিল্যান্সারদের ওপরও পড়ছে। কারণ অনেক ফ্রিল্যান্সার গ্রাফিক ডিজাইনের কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং তারাও এআই দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত