‘বাবা কবে আসবে, কোথায় গেছে?’ সন্তানের আকুতি

স্বামী হত্যার বিচার চান আনন্দিতী

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৪ এএম

“আমি তো বিচার চাই। আমার জন্য না, আমার দুইটা সন্তান এতিম হয়ে গেছে। এরা কি আর বাবাকে পাবে? আমার মেয়েটা নিজেই নিজেকে সান্তনা দিচ্ছে হয়তো বুঝে গেছে। যখন একটু বুঝতে পারছে, আমাকে বুঝাচ্ছে, ‘বাবা স্টার হয়ে গেছে মা, তুমি কান্না করবা না’।”এই আকুতি নেত্রকোনার দুর্গাপুরের নিহত সাংবাদিক লুৎফর জামান ফকিরের স্ত্রী আনন্দিতী সাংমার।

শনিবার সন্ধ্যায় পরিবারটির খোঁজখবর নিতে ব্যারিস্টার কায়সার কামালের পক্ষে তার বাড়িতে যান উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা নিহতের পরিবারকে আর্থিক অনুদান ও পোশাক উপহার দেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আনন্দিতী সাংমা।

তিনি বলেন, “আমার মেয়েটার বয়স মাত্র চার বছর। মাঝে মাঝে হয়তো ভুলে যায়, বাবাকে দেখতে পায় না। তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা কবে আসবে? বা কোথায় গেছে?’ ‘আর আমার ছোট ছেলেটা তো ঠিক করে কথাই বলতে পারে না। যখন একটু বড় হবে, কথা বলতে পারবে, তখন সে জানতে চাইবে বাবা কোথায়? সবারই তো বাবা আছে। বাবা ডাকলে একজন রেসপন্স করে।’ সে তো সারা দিন-সারা রাত বাবা বলে ডাকবে, কিন্তু কেউ তো আর রেসপন্স করবে না! কেউ এসে বলবে না যে, ‘আমি তোমার বাবা!’  তাই আমি এ জন্যই বিচার চাই। আমার স্বামী তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু আমার স্বামীকে যারা খুন করছে, অন্ততপক্ষে আমার সন্তানদের আমি এটুকু তো বলতে পারব যে, তোমাদের বাবাকে ফিরায় দিতে পারিনি। কিন্তু আমি তার বিচার চেয়েছি, আমরা বিচার পেয়েছি। এটা তো আমি আমার সন্তানদের বলতে পারব। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।”

তিনি আরও বলেন, গত বুধবার একটা পোস্ট করেছিলেন যে, ‘কারা জানি ২৫টি বক মেরে খাইছেন।’ এরকম একটা হেডলাইন। আমি শুধু হেডলাইনটা দেখেছি, এখনো ভিডিওটা পুরোপুরি দেখিনি। যে ২৫টি বক মেরে নাকি কারা খাইছেন। উনাকে নিয়মিতই তো অনেকেই থ্রেড বা হুমকি দিত। কিন্তু এই পোস্টটার পরে উনাকে আমি আরও বেশি টেনশনে দেখেছি। প্লাস, এটার পর থেকে উনি যার সঙ্গেই কথা বলতেন, একটু উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন। আর এই কয়েক দিন বিশেষ করে এই দুই দিন আগের কথাগুলো বেশি মনে পড়ছে। উনি বলতেন, ‘থ্রেড দিয়ে কী হবে?’ এগুলা অনেকের মুখেই শুনেছি।

তারপরে বিকেল দিকে উনাকে ফোনে কার সঙ্গে যেন আলাপ করতে শুনলাম। কী জানি, মানে উনাকে কেউ একজন বলছিলেন যে, ‘ভিডিও ডিলিট করার জন্য।’ তখন উনি বললেন যে, ‘চাইলেই তো আর ভিডিও ডিলিট করা যায় না। চাইলেই তো আর সবকিছু হয় না। আমি ভিডিও ডিলিট করব না।’ যার সঙ্গে উনি কথা বলছিলেন, তখন এই কথাটা বলছিলেন। মূলত রিসেন্ট আমি এটুকুই জানি।

তিনি আরও বলেন, এরপরে আবার যেদিন উনার সঙ্গে এই দুর্ঘটনাটা ঘটল। তখনো তো উনি আরেকটা পোস্ট ছাড়ছেন। আর আগেও তো উনি অনেকগুলো পোস্ট ছেড়েছেন। অনেক মানুষের অনিয়মের ব্যাপারে। পোস্টগুলো উনি তো আমাদের দুর্গাপুরে যাদের আমরা সন্ত্রাসী বা শীর্ষ সন্ত্রাসী বলে চিনি তাদের নিয়েও ছেড়েছেন। একটা না, দুইটা না, অনেকটাই! অনেক জনের বিরুদ্ধেই উনি এমন পোস্ট ছেড়েছেন। এখন উনি আর আল্লাহতায়ালাই ভালো বলতে পারবেন যে উনাকে কে কী করছে। আমি তো নিশ্চিত করে বা কনফার্মলি কাউকে কিছু বলতে পারছি না। আমি যতটুকু জানি, ততটুকুই আপনাদের জানালাম।

নিজের নিশ্চয়তা ও সন্তানদের নিশ্চয়তা চেয়ে তিনি বলেন, আমার প্রথম চাওয়া তো হলো খুনিদের দ্রুত বিচার হোক। বিচার শুধু ধরে নিয়ে গিয়ে হাজতে আটকে রাখা নয়, একদম চূড়ান্ত বিচার হোক। আমি ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, এখন তো আমার সব শেষ! মানুষটা যতদিন বেঁচে ছিল, আমাকে চাকরি করতে দেয়নি। কিন্তু এখন যে আমার দুটা বাচ্চা আছে, তাদের তো বড় করতে হবে, মানুষ করতে হবে। আমার বাবাও নেই, শুধু মা আছেন। আমার স্বামী আমাকে সম্পত্তি কিছু না দিয়ে গেলেও শিক্ষিত করে রেখে গেছেন। আমি চাচ্ছি, যদি আমার একটা চাকরি হতো, তাহলে আমার জন্য খুব ভালো হতো।

আমি বিএসসি নার্সিং কমপ্লিট করেছি এবং আমি একজন রেজিস্টার্ড নার্স। আমার নার্সিংয়ের ‘আরএন’ (জঘ) নম্বরও আছে। কিছুদিন আগে যে সরকারি নার্সিংয়ের সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও আবেদন করেছি, দুটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষাও দিয়েছি। তো আমি একটু সহযোগিতা চাচ্ছি যে, আমার একটা চাকরির বড্ড দরকার। আর চাকরিটা যদি ঢাকায় হয়, তাহলে বেশি ভালো হয়। কারণ আমার পরিবারও বর্তমানে ঢাকাতেই থাকে এবং আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজনও সবাই ঢাকায়। এই দুটি বাচ্চাকে একা রেখে মফস্বলে থেকে চাকরি করা কঠিন, ঢাকায় থাকলে অন্তত পরিবারের কেউ না কেউ আমার বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে পারবে। ডেপুটি স্পিকার স্যারের কাছে আমি আকুল আবেদন জানাচ্ছি, উনার কাছে আমার জোর দাবি উনি যেন আমাকে একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেন।

কিউআরএস টিমের উদ্বেগ: সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কুইক রেসপন্স সাপোর্ট (কিউআরএস) টিম। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপর এক গুরুতর আঘাত এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিউআরএস টিম লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মূল পরিকল্পনাকারী, সহযোগী ও প্রত্যক্ষ ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত