এক পরিবারের ছয়জনসহ ১০ জন পুড়ে মারা গেলেন অনুমোদনহীন একটি রিসোর্টে। ভ্রমণে গিয়ে এমন মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো নয়। এমন রিসোর্ট একটি-দুটিও নয়। দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী কেবল কক্সবাজারেই আছে লাইসেন্সহীন এমন পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট। সবার নজরের আওতায় থাকা কক্সবাজার দেশের প্রধান ভ্রমণ-গন্তব্য। সেখানেই যদি পর্যটনে নিরাপত্তার হাল এমন খারাপ হয়, অন্য স্থান ও স্থাপনাগুলোয় কী অবস্থা?
মানুষকে ভ্রমণে টানে, এমন কী নেই বাংলাদেশে? সাগর, পাহাড়, নদী, হাওর, জলাবন, বিস্তীর্ণ বিল, ঝরনা প্রাকৃতিক এমন বৈচিত্র্য সব দেশের নেই। ঐতিহাসিক, ধর্মীয় এবং মানুষের তৈরি বহু স্থান-স্থাপনাও কম নেই এখানে। ভুটান-নেপালের পাহাড় আছে, সাগর নেই। মালদ্বীপে সাগর আছে, পাহাড় নেই। দেশে মনের শান্তি, নতুন অভিজ্ঞতা, শারীরিক সুস্থতার প্রয়োজনে মানুষ কম-বেশি ছুটে যান দক্ষিণে সুন্দরবন, কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনস দ্বীপ থেকে শুরু করে উত্তরে সিলেট, পঞ্চগড়, মধ্যাঞ্চলে চলনবিল ও মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন স্থানে, কয়েকদিনের জন্য। এই যাওয়াকে কেন্দ্র করে সর্বত্র গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল-রেস্তোরাঁ, জল-স্থল-বনে নানা রকম রিসোর্ট ও পরিবহনসহ অনেক রকম ব্যবসা। কিন্তু ভ্রমণে মানুষের এই টান ধরে রাখতে যা যা অতিপ্রয়োজন ন্যূনতম নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পর্যটন সংস্কৃতির বিকাশ, তা-কি হয়েছে, এদেশে? হয়নি। কেন হয় না? কক্সবাজারে ইনানী সৈকতের টুপটুপ রিসোর্টে দাউ দাউ করে জ¦লে ওঠা আগুন, নিজে প্রাণে বাঁচা ও বাঁচাতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরা বাবা বা মা ও সন্তানের পুড়ে যাওয়া দেহাবশেষ এই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনেছে। আমরা এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভীষণ উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ।
পর্যটন স্থান ও স্থাপনার তদারক যাদের করার কথা, মানুষের নিরাপত্তা যাদের নিশ্চিত করার কথা, যাদের জানাশোনার মধ্যে অনিরাপদ হোটেল-রিসোর্ট তৈরি হয় সেসব সরকারি কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী করছে, বছরের পর বছর?
বলা হচ্ছে টুপটুপ রিসোর্টকে কয়েক মাস আগে সতর্ক করা হয়েছিল। রিসোর্টটি যদি অনিরাপদই হয়, তাহলে বন্ধ করে দেওয়া হয়নি কেন? কার স্বার্থে? এমন প্রাণঘাতী উদাসীনতা কীসের বিনিময়ে? টুপটুপের মালিক-ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিচারে কী হবে? রাষ্ট্রের যেসব কর্মকর্তার জানাশোনার মধ্যে ও অবহেলা-উদাসীনতায় টুপটুপ বন্ধ হয়নি, তদন্ত করে তাদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি আমরা জানাই।
শুধুই কি টুপটুপ? কেবলি কি কক্সবাজার? সুন্দরবন এলাকাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, সিলেট অঞ্চল, পঞ্চগড়-বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলে পর্যটন স্থান ও স্থাপনাগুলো কি নিরাপদ? কতটা নিরাপদ? পাহাড়, টিলা ও বন কেটে এবং নদীতীর ভরাট করে এমন স্থাপনা একের পর এক তৈরি হলেও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কেন প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকে?
পর্যটনের অবকাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ বললেও কম বলা হয়। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৪ সালের ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচকে ১১৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৯তম। মূলত পর্যটনের জন্য পরিষেবা, আবাসন ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশ ছিল সবার নিচে। ২০২৬ সালের সর্বশেষ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানে সামান্য উন্নতি হয়ে ১১০ দেশের মধ্যে ৯৮তম অবস্থানে এসেছে। বলা হয়ে থাকে, পর্যটনে পেশাদারত্বের বেশ অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা, নিরাপত্তাহীনতা, মানসম্মত হোটেল-রিসোর্টের অভাব, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মারাত্মক ঘাটতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অতিরিক্ত খরচের কারণে বাংলাদেশে মানুষ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হয়। কক্সবাজার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সত্যিকারের বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও দিনদিন কমছে।
আমরা মনে করি, পর্যটন খাতের এমন দুরবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন এবং তা দ্রুত। পর্যটন অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি বহুমাত্রিক সেবা। এর বিকাশে টেকসই, নিরাপদ, গ্রহণযোগ্য মান ও পরিবেশসম্মত পর্যটনের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত নীতিমালা, তার কঠোর বাস্তবায়ন, আপসহীন নিরাপত্তা, নিরাপদ অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা, খরচ যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামিয়ে আনা, স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করে দক্ষ জনবল তৈরি। আশপাশের দেশ ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাসহ অন্যরা যদি পর্যটন সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে পারে, বাংলাদেশ কেন পারবে না। আমাদের পারতেই হবে।