বিশ্বজুড়ে ১২০ কোটি তরুণ আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। কিন্তু এই সময়ে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে প্রায় ৮০ কোটি তরুণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের এই সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় মূল বক্তব্যে তিনি এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। গতকাল রবিবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে ডিগ্রি নিয়েও চাকরি না পাওয়া হতাশ তরুণ-তরুণী এবং কাজের দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুতের অভাবে কর্মহীন যুবক। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মেধা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানো না গেলে তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
অজয় বাঙ্গা বলেন, ২০২৩ সালে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যেসব চাপ ও চ্যালেঞ্জ ছিল, সেগুলো এখনো কাটেনি। বরং ভূরাজনৈতিক সংঘাত, উচ্চ ঋণের বোঝা, সরকারি তহবিলের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের উচ্চমূল্যের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৃহৎ পরিসরে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাকে বিশ্বব্যাংক তার মূল কৌশল হিসেবে নিয়েছে।
বক্তব্যে গত তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথাও তুলে ধরেন অজয় বাঙ্গা। তিনি জানান, প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৯ মাস থেকে কমিয়ে নয় মাসে আনা হয়েছে। আগের ১৫৩টি জটিল মূল্যায়নের পরিবর্তে এখন ২২টি প্রভাবভিত্তিক সূচকের মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের মূলধন কাঠামো পুনর্গঠনের ফলে আগামী এক দশকে আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের (আইবিআরডি) ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বেড়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির তিনটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে উন্নত অবকাঠামো, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট।
অজয় বাঙ্গা বলেন, বড় পরিসরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা অনেক দেশের নাগালের বাইরে থাকলেও সাধারণ প্রয়োগভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো, শিক্ষকের পাঠদান উন্নত করা কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। এ জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মিশন ৩০০’ উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন। পাশাপাশি, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের নিরাপদ পানির সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক ৪০ কোটি মানুষকে সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে ২০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে শুধু জীবিকা নির্বাহের কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত উৎপাদনকারী কৃষিতে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের প্রসঙ্গ তুলে অজয় বাঙ্গা বলেন, বিশ্বযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মহামন্দার সময়েও বিশ্বনেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো দেশের সমৃদ্ধি শুধু সেই দেশের মানুষের জন্য নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষের জীবনেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অতীতের সেই উপলব্ধি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাংক বর্তমানে সরকারি তহবিল, বেসরকারি পুঁজি, দাতব্য সংস্থা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে কাজ করছে। এর লক্ষ্য, প্রতিটি দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা।