ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সুখবর

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৮ এএম

ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন গ্রহণে ইনজেকশনের বিকল্প হিসেবে মুখে খাওয়ার উপযোগী ন্যানো ক্যাপসুল তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের একদল গবেষক। তাদের তৈরি এ ক্যাপসুলের লক্ষ্য কম খরচে, ব্যথামুক্ত এবং রক্তে শর্করার মাত্রা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত উপায়ে শরীরে ইনসুলিন সরবরাহ করা। গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিটি পরীক্ষাগারে সফল হয়েছে। পরের ধাপে মানুষের ওপর প্রয়োগের পরিকল্পনা তাদের।

চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি কিংবা ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার কারণে দেখা দেয়। ইনসুলিন অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ডায়াবেটিসের টাইপ-১ রোগীদের শরীর প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। অন্যদিকে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারার পাশাপাশি উৎপন্ন ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতেও ব্যর্থ হতে পারে। ফলে অনেক রোগীকে ইনজেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন নিতে হয়।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছেদীর্ঘদিন ইনজেকশন নেওয়া অনেক রোগীর জন্য অস্বস্তিকর ও কষ্টকর। এ কারণে কারও কারও মধ্যে চিকিৎসা অনুসরণে অনীহা তৈরি হয়। আবার ইনসুলিন প্রোটিন জাতীয় হরমোন হওয়ায় পাকস্থলীর অমøীয় পরিবেশ ও পরিপাকতন্ত্রের এনজাইমের প্রভাবে ভেঙে যেতে পারে। ফলে সাধারণ ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের মাধ্যমে কার্যকরভাবে শরীরে ইনসুলিন পৌঁছে দেওয়া কঠিন।

এই সমস্যা সমাধানে যবিপ্রবির ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. কিশোর মজুমদার ও তার শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন ‘স্মার্ট ন্যানো-ক্যারিয়ারভিত্তিক ওরাল ইনসুলিন’ প্রযুক্তির একটি ন্যানো ক্যাপসুল। তারা জানান এতে রয়েছে দ্বিস্তরীয় আবরণ, শর্করা-সংবেদনশীল উপাদান, জৈবসামঞ্জস্যপূর্ণ পলিমার ও পিএইচ-সংবেদনশীল কো-পলিমার। এসব উপাদানের মাধ্যমে পাকস্থলীর প্রতিকূল পরিবেশ থেকে ইনসুলিনকে সুরক্ষিত রেখে ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছানোর পর তা নিঃসরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গবেষকদের দাবি, ক্যাপসুলটি শরীরে শর্করার মাত্রা অনুযায়ী ইনসুলিন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়বে, আর কমে গেলে নিঃসরণ কমে যাবে বা বন্ধ থাকবে। এ কারণে তারা ক্যাপসুলটিকে ‘কৃত্রিম অগ্ন্যাশয়’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে অধ্যাপক ড. কিশোর মজুমদার বলেন, ‘পৃথিবীতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রায় ৬০ কোটির বেশি লোক এখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। যেকোনো ধরনের ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন সবচেয়ে কার্যকরী, ভালো এবং নিরাপদ মেডিসিন। তবে শরীরে ব্যথা পাওয়ার কারণে অনেক রোগী ইনসুলিন ইনজেকশনের মাধ্যমে নিতে অনীহা প্রকাশ করে।’

তিনি বলেন, ‘এ সব সমস্যার কথা ভেবে আমরা রোগীর জন্য ব্যথামুক্ত সমাধান বের করার চেষ্টা করেছি। যে ক্যাপসুলটি তৈরি করেছি, সেটিকে আমরা কৃত্রিম অগ্ন্যাশয় বলছি। কারণ, এটি শরীরের অগ্ন্যাশয়ের মতো শর্করার মাত্রা অনুযায়ী ইনসুলিন নিঃসরণের মাধ্যমে শরীরে শর্করা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।’

ক্যাপসুলটির উপাদান বিষমুক্ত ও বায়োডিগ্রেডেবল বলে জানান অধ্যাপক কিশোর মজুমদার। তিনি বলেন, এ প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে গবেষণা করছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি গবেষক দলও এ বিষয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে ইঁদুরের ওপর ক্যাপসুলটি প্রয়োগ করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

গবেষণাটিকে মানুষের ওপর প্রয়োগের পর্যায়ে নিতে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

অধ্যাপক কিশোর মজুমদার বলেন, ‘এখন যদি সরকার কিংবা কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পাই, তাহলে আমরা এটি মানুষের ওপর প্রয়োগ করব। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দুবছরের মধ্যে আমরা এটি বাজারে আনতে পারব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত