মন্ডপে পুণ্যার্থীর ঢল

আজ দুর্গোৎসবের মহাষ্টমী  

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২০ এএম

শারদীয় দুর্গোৎসবের দুই দিনের মহাসপ্তমী উদযাপিত হয়েছে। গত শনিবার ও  গতকাল রবিবার শাস্ত্রীয় আচার ও রীতি অনুযায়ী পূজা সম্পন্ন হয়। আজ সোমবার  মহাষ্টমী। এদিন দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজাসহ দুর্গা দেবীর মহাষ্টমীবিহিত পূজা, ব্রতোপবাস ও পুষ্পাঞ্জলি হবে। দুর্গোৎসবে দেশজুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ। গতকাল মহাসপ্তমীতে এ উৎসব পূর্ণতা পায়। পূজামন্ডপগুলোতে ঢাকের বাদ্য, চন্ডী ও মন্ত্রপাঠ, কাঁসর, ঘণ্টা, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে মুখর ছিল। রাজধানীর প্রধান প্রধান মন্দির ও মন্ডপগুলোতে পুণ্যার্থীর ঢল দেখা গেছে।

মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গার নবপত্রিকা প্রবেশ, ঢাকন্ডঢোল, কাঁসর বাজিয়ে, চন্ডীপাঠের মাধ্যমে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। শাস্ত্রের বিধানমতে দেবীকে আসন, বস্ত্র, পুষ্পমাল্য এ ধরনের ষোল উপাদান (ষোড়শ উপাচার) দিয়ে পূজার্চনা করা হয়। পূজার্চনা শেষে দেবীর কৃপালাভের আশায় তার চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেন ভক্তরা। আজ মহাষ্টমীতে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের উপদেষ্টা পুরোহিত প্রণব চক্রবর্তী বলেন, অষ্টমী পূজায় ভক্তরা উপবাস করে পূজার্চনা ও পুষ্পাঞ্জলি শেষে উপবাস ভঙ্গ করবেন। তিনি বলেন, অষ্টমী ও নবমী পূজার সন্ধিক্ষণ অর্থাৎ অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিটকে সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ের মধ্যে সন্ধিপূজা হবে। 

এদিকে আজ সকাল ৯টায় রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবী জ্ঞানে পূজা করবেন ভক্তরা। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত অনুযায়ী, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য। শাস্ত্রমতে, এক বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজি¦কা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চৌদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়।

নির্বাচিত কুমারীকে মহাষ্টমীর দিন প্রত্যুষে দেবী রূপে সাজানো হয়। এরপর কুমারীকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শ উপাচারে (ষোল উপাদান) দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। দেশে ও দেশের বাইরে যত শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ রয়েছে তাতে কুমারী পূজা হয়। বাংলাদেশে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, দিনাজপুরসহ বেশ কিছু জেলায় রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ রয়েছে।

লালন্ডনীল আলোয় উৎসবমুখর পুরান ঢাকা : এদিকে শারদীয় দুর্গোৎসবকে উপলক্ষ করে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। গত তিন দিন ধরে লালন্ডনীল আলোর ঝলকানি, ঢাকন্ডকরতালের শব্দ এবং সাউন্ড বক্সে বাজছে গান। অলিগলির বিভিন্ন সড়কে তৈরি করা হয়েছে পূজামন্ডপ। মন্ডপের সামনে ভিড় জমিয়েছেন ভক্তরা। কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে, কেউ পরিবারের সদস্যদের হাত ধরে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখছেন দেবী দুর্গার প্রতিমা। রাস্তার পাশে বসেছে চুড়ি, ফিতা ও শিশুদের খেলনার দোকান। সব মিলিয়ে পূজাকে ঘিরে পুরান ঢাকার অলিগলিতে তৈরি হয়েছে এক আনন্দঘন উৎসবের আবহ।

গতকাল রবিবার সরেজমিন শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারের বিভিন্ন মন্দির ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি সড়কের ওপর পূজামন্ডপ তৈরি হওয়ায় এবং যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় দর্শনার্থীরা হেঁটেই এক মন্ডপ থেকে অন্য মন্ডপে যাতায়াত করছেন। কেউ কেউ প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার কিছুক্ষণ থেমে উপভোগ করছেন পূজার আয়োজন। গতকাল ছিল দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী। এদিন সন্ধ্যার আগেই দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে মন্ডপসংলগ্ন সড়কগুলো।

স্ত্রীন্ডসন্তান নিয়ে তাঁতীবাজারে পূজা দেখতে এসেছেন সজীব দেবনাথ। অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব মিলিয়ে ভালো লাগছে। মায়ের কাছে প্রার্থনা, অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, দেশের মঙ্গল হোক এবং দেশ সুন্দরভাবে চলুক। এবার ১৫ন্ড১৬টি মন্ডপ ঘুরে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে শাঁখারীবাজারের দুর্গাবাড়িতে প্রায় দেড়শ বছর ধরে পারিবারিকভাবে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। তিনন্ডচার প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য বজায় রয়েছে জানিয়ে আয়োজক অঞ্জন কুমার বলেন, পূর্বপুরুষদের হাত ধরে শুরু হওয়া পূজার এই ধারাবাহিকতা আগামী প্রজন্মও ধরে রাখবে। পূজার সার্বিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে তাঁতীবাজারে জগন্নাথদেবের মন্দিরের সামনে শিশুদের খেলনা নিয়ে বসেছেন বিক্রেতা শাহজাহান। গত দুই দিন ধরে তিনি সেখানে ব্যবসা করছেন। শাহজাহান জানান, শুক্রবার বিক্রি কিছুটা ভালো হলেও পরের দিন তা কিছুটা কমেছে। তবে অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত