ডেঙ্গু চিকিৎসায় সন্তুষ্টি পরীক্ষায় ভোগান্তি

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২০ এএম

১৪ বছর বয়সী জামিলের গত তিন দিন ধরে জ্বর। তাকে নিয়ে গতকাল মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন তার মা এবং পরিবারের আরও চার সদস্য। হাসপাতালে আসার পর বিছানা পাননি। জায়গা পেয়েছেন ৯ তলার লিফটের পাশে পথের শেষ মাথায় ফ্লোরে। নিচে একটি বিছানায় অসুস্থ ছেলেটি শুয়ে আছে। স্যালাইন চলছে। আর ছেলের পাশে বসে আছেন পরিবারের লোকজন।

জামিলের মা নাহিদা বলেন, বেড খালি নেই। সেজন্য এখানে বিছানা পেতে দিয়েছে। আসার পর ডেঙ্গুসহ তিনটি পরীক্ষা করিয়েছি। রিপোর্ট পাইনি। তবে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করে ট্রিটমেন্ট শুরু করেছে। জামিলের জ্বর ১০২ ডিগ্রি ওঠে।  হাত-পায়ে ব্যথা, পাতলা পায়খানা ও বমি আছে। কী আর করা, বেড না থাকলেও ফ্লোরে হলেও ট্রিটমেন্ট তো নিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে অনেক খরচ।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৯, ১১ ও ১২ তলায় গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও বেডে, কোথাও মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। কেউ এসেছেন আগের দিন, কারও হাসপাতালে থাকার বয়স দুই দিন, আবার কেউ পাঁচ থেকে সাত দিন ধরে লড়ছেন ডেঙ্গুর সঙ্গে। নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত দুই ওয়ার্ড ছাড়িয়ে সিঁড়ির গোড়া, লিফটের পাশসহ ফ্লোরজুড়েই রোগীদের উপস্থিতি। রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের এমন চিত্রের মধ্যেও স্বস্তি আছে চিকিৎসাসেবায়, কিন্তু ভোগান্তি কমছে না পরীক্ষা করাতে গিয়ে।

হাসপাতালের ১২ তলার নারী ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ৭৪ জন রোগী; আর ১১ তলার পুরুষ ওয়ার্ডে ছিলেন ৭৫ জন। সব মিলিয়ে এই দুই ওয়ার্ডেই ১৪৯ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। নির্ধারিত বেডে জায়গা না হওয়ায় অনেককেই মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে সেখানে শুয়ে থাকা, আবার প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করাতে যাওয়া সব মিলিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের দিন কাটছে নানা ভোগান্তির মধ্যে। তবে চিকিৎসক-নার্সদের সেবা নিয়ে রোগীদের মধ্যে অসন্তোষ নেই। যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগের মূল জায়গা পরীক্ষা করানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সকাল ৮টায় পরীক্ষা করাতে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার আগে সিরিয়াল পেতে অপেক্ষা করতে হয়। পরীক্ষা শেষে রিপোর্ট সংগ্রহ করতেও দাঁড়াতে হয় আরেক দফা লাইনে। এতে প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় চলে যায়।

মেরাদিয়া থেকে ছয় দিন আগে ভাইকে নিয়ে এসেছেন রিটন। গতকাল সন্ধ্যায় দেখা গেল, পুরুষ ওয়ার্ডে মশারির ভেতরে বসে খাচ্ছেন তার ভাই। আর মশারির বাইরে বসে আছেন রিটন। ভাইয়ের প্রয়োজনীয় যা লাগছে তিনি এগিয়ে দিচ্ছেন। খাওয়া শেষে পানি ঢেলে ভাইকে হাত ধুতে সহযোগিতা করছেন। এ সময় কথা হলে রিটন বলেন, ‘এখানে চিকিৎসার মান ভালো। কিন্তু ভোগান্তি পরীক্ষা করাতে। প্রতিদিন সকালে গিয়ে  পরীক্ষা করানোর জন্য লাইনে অন্তত দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আবার রিপোর্ট আনতে গিয়ে আরও অন্তত এক ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। যারা ওখানে দায়িত্বে আছেন, রোগীর স্বজনদের প্রতি তারা কম আন্তরিক। অনেক সময় দেখি আমাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে তারা মোবাইল টিপছে তো টিপছেই। আমাদের প্রতি ওনারা কম আন্তরিক।’

পরীক্ষার ভোগান্তির পাশাপাশি বড় সমস্যা লিফট। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, লিফটে উঠতে প্রতিবারই কমপক্ষে ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাদের। এক তলা থেকে আরেক তলায় যাওয়া কিংবা রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ওঠানামা করাও সহজ নয়। বিশেষ করে যাদের রোগী হাঁটাচলা করতে পারেন না, তাদের জন্য এ অপেক্ষা আরও কষ্টকর।

সন্ধ্যা ৭টার পর লিফটে চাপ কিছুটা কমে আসে বলে জানান স্বজনরা। তবে দিনের বেলায় রোগী, তাদের সঙ্গে থাকা স্বজন এবং অন্য সেবাগ্রহীতাদের ভিড়ে লিফট ব্যবহার করতে গিয়ে সময় নষ্ট হচ্ছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত দুর্বল রোগীকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের জন্যও বাড়তি শারীরিক চাপ তৈরি করছে।

চিকিৎসার খরচ নিয়েও আছে পরিবারের হিসাব-নিকাশ। রোগীদের স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারও দিনে খরচ হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, আবার কারও ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। রোগীর অবস্থা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অন্যান্য খরচের ওপর এ ব্যয় নির্ভর করে।

সুজন নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘চিকিৎসা খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি না। হয়তো আমার জন্য বেশি না। কিন্তু অনেক অতিদরিদ্র মানুষ আছে তাদের জন্য এটা অনেক। কিছু ওষুধ, স্যালাইন হাসপাতাল থেকেই দেয়। আবার কিছু কেনা লাগে। আমাদের ছয় দিনে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে দিনে আমাদের খরচ হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা।’

ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হয় মূলত ১১ ও ১২ তলায়। গতকাল ১১ তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ১৬ জন এবং ১২ তলায় নারী ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ১৪ জন। এ ছাড়া ৯ তলায়ও কয়েকজন ডেঙ্গু সন্দেহের রোগী আবার ডেঙ্গুর সঙ্গে টায়ফয়েডেরও রোগী আছে। ৯ তলা মূলত মেডিসিন ওয়ার্ড। ৯ তলায় কথা হয় সেখানে চিকিৎসাধীন খিলগাঁও গভমেন্ট স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাসনুরের মায়ের সঙ্গে। তিনি তখন তার সন্তানকে তরল খাবার খাওয়াচ্ছিলেন।

তিনি জানান, গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত জ¦রের পাঁচ দিনে তার প্লাটিলেট নামে ২৯ হাজারে। ছয় দিনে প্লাটিলেট ওঠা শুরু করে। ওঠে ৪৩ হাজারে। মানসুরের মা রোকেয়া বলেন, জ¦র ১০২ উঠত। এর বেশি কখনো ওঠেনি। জ¦রের সঙ্গে পেটে ব্যথা, বমি ছিল। খেতে পারত না। খেলেই বমি করে দিত। ছেলেকে নিয়ে প্রথম একটি বেসরকারি হাসপাতালে যান তিনি। সেখানে প্লাটিলেট নামা শুরু করলে ওই হাসপাতাল থেকে জানান, যেকোনো সময় আইসিইউ লেগে বসতে পারে। রোগী নিয়ে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন তারা। তারপর ১৭ অক্টোবর তিনি ছেলেকে নিয়ে আসেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আসার পর প্লাটিলেট ওঠা শুরু করে। তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে খরচ অনেক। এখানে খরচ নেই বললেই চলে। খুব ভালো সেবা পাচ্ছি। শুধু একটু ভোগান্তি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে।

কুমিল্লা থেকে আসা তোফাজ্জল হোসেন তার ছেলেকে নিয়ে আছেন মেডিসিন ওয়ার্ডে। ছেলের ডেঙ্গু এবং টাইফয়েড। তিনি বলেন, দুইটি ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। পরীক্ষা করাতে, রিপোর্ট আনতে আর লিফটে যাতায়াতে দীর্ঘ লাইন থাকে। লিফট আছে চারটি। তার মধ্যে তিনটি রোগীদের জন্য। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এসব লিফটে খুব চাপ থাকে। ৭টার পরে গিয়ে চাপ কমে।

১২ তলায় মহিলা ওয়ার্ডের সেবিকা সুজাতা মল্লিক বলেন, ২০২৩ সালের তুলনায় এবার রোগী অনেক কম। এখন তো মৌসুম। এখন প্রতিদিন ধরেন ৮০ জনের মতো এ ওয়ার্ডে রোগী থাকছে। ২৩ সালে রোগী রোগী থাকত ৩০০ থেকে ৩৫০। সেই চাপও সামলিয়েছে। এবার সে তুলনায় চাপ মনে করছি না।

গতকাল চিটাগাং রোডের বাসিন্দা মো. মোস্তফা তার ছেলে সিয়ামকে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, জ¦রের পাঁচ দিন পর পাতলা পায়খানা শুরু হয়েছে। তিন দিন থেকে প্লাটিলেট নামতে শুরু করে। প্রথমে ১ লাখ ৭, চতুর্থ দিনে ৮৫, পঞ্চম দিনে ৫৫ হাজারে নামে। গতকাল হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। চিকিৎসায় খুব একটা খরচ হচ্ছে না। তবে তিনি ফলমূলের দাম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।

পুরুষ ওয়ার্ডের সেবিকা সুচি বলেন, রোগী একটু কমতে শুরু হয়েছে। দুই দিন আগে  ছিল ৮৬ জন। গত দুই দিন ৭৪-৭৫ জন করে থাকছে।

২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চলতি মাসের ১৮ দিনে ভর্তি ডেঙ্গুতে ভর্তি হয়েছে ৩২ হাজার ৭৮০ জন, মৃত্যু হয়েছে ১০২ জনের।

ডেঙ্গু-বিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চলতি বছরে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪০০ জন। মৃত্যু হয়েছে ৩৪৮ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৮৮ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ৮২৭ জন। চলতি বছরে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৬ জন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত