সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরে পাওয়া তিন প্রজাতির মাছের শরীরে মিলেছে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে ক্ষতিকর সিসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম। মাছের মাধ্যমে এসব ক্ষতিকর পদার্থ মানুষের শরীরে প্রবেশের মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া, সুন্দরবনের নদীর পানি ও পলিমাটিতে মিলেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। যা বনের জলজপ্রাণীর জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সুন্দরবনের নদীর পানি, পলিমাটি ও জলজপ্রাণীতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের করা গবেষণায় এ সব তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণাটির খসড়া প্রতিবেদন সম্প্রতি খুলনায় প্রকাশ করা হয়।
গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের নদীগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও বিস্তার নিরূপণে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষকরা। এ জন্য খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীর পানি ও পলি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় প্রতি ঘনমিটার পানিতে খোলপেটুয়া নদীতে ৫৭০টি, ভোলা নদীতে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৩৬০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। পলিমাটিতেও মিলেছে এসব কণা। প্রতি কেজি পলিতে খোলপেটুয়া নদীতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেন গবেষকরা। খোলপেটুয়া নদীর শিলা কাঁকড়ার শরীরেও পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। গবেষণায় কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়। এসব কণার মধ্যে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো প্লাস্টিকের উপাদানও ছিল।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সুন্দরবনের পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আগের বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি। তবে স্থান ও নমুনাভেদে এর ঘনত্বের পার্থক্য রয়েছে।
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক জলজপ্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব প্লাস্টিক বড় প্রাণীর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে তারাও বিভিন্ন জটিলতার শিকার হতে পারে। তিনি বলেন, সিসা, তামা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব ধাতুর সংস্পর্শে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার প্রধান এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথমে জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজপ্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে বড় প্রাণীদের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, নদীর পলিতে জমে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অণুজীব ও তলদেশে বসবাসকারী প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রের ক্ষতি করছে। এতে সুন্দরবনের জলজ পরিবেশের ভারসাম্য বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনামুল হক বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমে সুন্দরবনে ৫৬ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশুর নদের মাছের শরীরে ভারী ধাতুর উপস্থিতিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। গবেষণার জন্য নদটির ছয়টি স্থান থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। স্থানগুলো হলো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
গবেষণায় মাছের শরীরে প্রতি কেজিতে গড়ে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা মিলেছে। মাছের শরীরে সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি কেজিতে ০.২ থেকে ০.৪ মিলিগ্রাম। নিকেলের সহনশীল মাত্রা যেখানে ০.৫ থেকে ১ মিলিগ্রাম সেখানে মিলেছে ৩ দশমিক ০৬ মিলিগ্রাম। ক্যাডমিয়াম যেখানে সহনশীল মাত্রা ০.০৫ থেকে ০.১ মিলিগ্রাম সেখানে পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম। মাছের অন্ত্রে এসব ধাতুর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল। এরপর ছিল ফুলকা।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, মাছের শরীরে সিসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি সহনশীল মানদ-ের তুলনায় বেশি। গবেষণার প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পারভীন লিপি বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা, মোংলা বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটিকে দূষিত করছে। একপর্যায়ে এসব দূষক মাছের শরীরে প্রবেশ করছে।
তিনি বলেন, পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় নদীতীরের কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
এর আগে পশুর নদের মাছের শরীরে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এ গবেষণার ফল গত বছরের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত হয়।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, উজান থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আসা বন্ধ করতে যৌথ নদী কমিশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং এর চারপাশের ১০ কিলোমিটার পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণে প্লাস্টিকের মোড়ক কমানো, মোংলা বন্দর ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার নিশ্চিত করা এবং নদীপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেলবর্জ্য ফেলা বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, পর্যটক ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে সুন্দরবনে প্লাস্টিক প্রবেশ বন্ধের বিষয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই বনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের চারপাশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
গবেষণার ফলাফল বলছে, সুন্দরবনের নদী, পলিমাটি ও জলজপ্রাণীতে প্লাস্টিক এবং ভারী ধাতুর দূষণ পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য শোধন, নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর আইনপ্রয়োগ ছাড়া এ সমস্যা মোকাবিলা কঠিন।