চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান জীবনরেখার অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯৩ শতাংশের বেশি এবং কনটেইনারে বহন করা হয় এমন পণ্যের প্রায় ৯৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে আনা-নেওয়া হয়। নানামুখী ব্যবস্থা নেওয়ায় বন্দরে পণ্য সামাল দেওয়ার দক্ষতা আগের চেয়ে কিছু বেড়েছে। তারপরও আমদানি পণ্যের আইনি ঘোষণার পর বন্দর থেকে খালাসে ১৩ দিনের বেশি সময় লাগছে। দেশ রূপান্তরে সোমবার প্রকাশিত ‘চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি থেকে খালাসে যত জটিলতা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগার বড় কারণ আমদানির আইনি ঘোষণা (বিল অব এন্ট্রি) দিতেই সময় লাগছে সাত দিনের বেশি। অভিযোগ রয়েছে, বন্দরের বাইরের খরচ বাঁচাতে অনেক আমদানিকারক বিলম্বে এ ঘোষণা দেন।
কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে জাহাজ থেকে পণ্য নামার পর সবকিছু ঠিক থাকলে ইয়ার্ড থেকে খালাস হতে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ দিন সময় লাগে। যদি কাস্টমস ও বন্দরের সব পাওনা পরিশোধ করা থাকে, তাহলে মাত্র দুই ঘণ্টায়ও পণ্য খালাস সম্ভব। বাস্তবে দুই ঘণ্টায় সম্ভব কি-না, সেটি প্রমাণসাপেক্ষ বিষয় হলেও সবকিছু ঠিক থাকলে আইনি ঘোষণার পর পণ্য নামানোর সময় ১৩ দিন থেকে বেশ কমানোর সুযোগ সম্ভবত আছে। আমরা মনে করি, এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায় কি-না, পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধান অনুযায়ী, পণ্য সর্বশেষ বন্দর থেকে ছাড়ার ২৪ ঘণ্টা আগে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে আইজিএম (আমদানিকৃত পণ্যের তালিকাসহ সাধারণ ঘোষণা) সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় এই সাবমিশন আসলে হয় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ আসার পর। আমদানিকারক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মতে ব্যাংকিং চ্যানেলে আমদানিকৃত পণ্যের কাগজপত্র পেতে দেরি হয় বলে ‘বিল অব এন্ট্রি’ দাখিলেও বিলম্ব হয়। জাহাজ ছাড়ার আগেই আইজিএম এবং ‘বিল অব এন্ট্রি’ দাখিল বর্তমানে বাস্তবে সম্ভব নয়, এমনটিও কেউ কেউ মনে করেন। তাদের মতে, তা করতে হলে ‘মেরিটাইম সিঙ্গেল উইন্ডো’ (এমএসডব্লিউ) চালু করতে হবে। তাতে আইজিএম করার সময়ই বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়ে যাবে।
এমএসডব্লিউ এমন একটি ব্যবস্থা, যা জাহাজ, ব্যক্তি ও পণ্যসামগ্রীর আগমন, অবস্থান এবং প্রস্থানের ক্ষেত্রে সরকারি কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে জমা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। বর্তমানে কয়েকটি দেশের সমুদ্রবন্দরে এই এমএসডব্লিউ চালু হয়েছে। সব ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইওএম) সদস্য-রাষ্ট্রের ২০২৪ সালের শুরু থেকে এমএসডব্লিউ চালু ও ব্যবহার করার কথা রয়েছে।
আমরা মনে করি, বন্দরে পণ্যের ওঠানামা ও ছাড় করার ক্ষেত্রে বিলম্বের দ্রুত যৌক্তিক সমাধান খোঁজা দরকার। বৈদেশিক বাণিজ্যে দেশ-বিদেশের অনেক পক্ষ জড়িত থাকে। তারপরও আমরা মনে করি, আইনি ঘোষণা দেওয়ার সময় কমানোর সুযোগ থাকলেও থাকতে পারে।
বহির্নোঙর ও চ্যানেলে নাব্য সংকট, বাণিজ্যিক চ্যানেলে অবৈধ জালের ব্যবহার, জাহাজজট, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরের উপযোগিতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। এতে শুধু যে ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন, ব্যবসার খরচ বাড়ে, তা নয়। পণ্যের পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্দরে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকলে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়। দ্রুত পণ্য খালাস করতে ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা যতটা সম্ভব দ্রুত কমিয়ে বন্দরের কাজের গতি বাড়ানো দরকার। জাহাজজট ও কনটেইনার জট দীর্ঘায়িত হয় বলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের যে বদনাম হয়েছে, তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে নানামুখী কাজ হচ্ছে। বিদেশি কোম্পানিকে বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনার জন্য দেওয়া হচ্ছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর আগামী ২০২৯ সালে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। আমরা মনে করি, চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম ডিজিটালকরণ ও পেপারলেস করা যায় কি-না, তাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে তার আগে বন্দর ব্যবহারকারীসহ সব অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম¥ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্র্রয়োজন।