২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিতর্কিত হারের পর রেফারিংয়ের নিরপেক্ষতা ও টুর্নামেন্টের সততা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার চরম শাস্তির মুখে পড়েছে মিসর। শেষ ষোলোর ম্যাচে হারের পর রেফারিকে নিয়ে কটূক্তি, ম্যাচ ‘পাতানো’র অভিযোগ এবং ফিফাকে কাঠগড়ায় তোলায় মিসরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান ও দলটির ডিরেক্টর ইব্রাহিম হাসানকে ৩ ম্যাচ এবং ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকোকে ৫ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ) নিশ্চিত করেছে, তারা ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে আপিল করার আইনি দিক খতিয়ে দেখছে।
আটলান্টার সেই ২-০ থেকে ৩-২: নাটকের শুরু যেখানে
আটলান্টায় গত ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচে ম্যাচের ৭৭ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে ইতিহাস গড়ার দ্বারে দাঁড়িয়ে ছিল ফারাওরা। কিন্তু ৭৯ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও ৮৩ মিনিটে লিওনেল মেসির লক্ষ্যভেদে সমতায় ফেরে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। এরপর অতিরিক্ত যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করলে ৩-২ ব্যবধানের এক অবিশ্বাস্য ও নাটকীয় জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা।
তবে এই হারের চেয়েও মিসর শিবিরকে বেশি আগুনে পুড়িয়েছে ম্যাচের শেষভাগে রেফারির দুটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। ম্যাচের প্রথমার্ধে বিল্ড-আপে ফাউলের অজুহাতে ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকোর একটি গোল বাতিল করা হয়। আর খেলা যখন ২-২ সমতায়, তখন বক্সে স্পষ্ট ফাউলের পর মিসরের পেনাল্টি আবেদন নাকচ করে দেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। ৭৭ মিনিট পর্যন্ত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের চেপে ধরেও এভাবে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে মিসরের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফরা।
‘মেসি ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের টিকিয়ে রাখার চক্রান্ত’ মন্তব্যে মিসর কোচ
ম্যাচ শেষ হতেই রাগে ফুঁসতে থাকা মিসরীয় কোচ ও খেলোয়াড়রা মেজাজ হারিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খোলেন। সংবাদ সম্মেলনে মিসরের ৬০ বছর বয়সী কোচ হাসান সরাসরি ফিফা ও রেফারিদের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছিলেন, ‘মাঠের ভেতরের কিছু সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরের কিছু বিষয় এই ম্যাচের ফল পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। হয়তো তারা চেয়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি যেন এই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত থাকে।’
তাদের সঙ্গে পরিষ্কার অন্যায় হয়েছে জানিয়ে মিসর কোচ আরও বলেছিলেন, ‘বাস্তব জীবন অন্যায্য হতে পারে, কিন্তু খেলাধুলায় কেন ন্যায্যতা থাকবে না? ম্যাচের ফল এবং যেভাবে সবকিছু ঘটানো হয়েছে, তাতে আমি মোটেও সন্তুষ্ট নই। 'দুর্ভাগ্য' বলতে পারতাম, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সঙ্গে পরিষ্কার অন্যায় করা হয়েছে।’
‘টুর্নামেন্ট পাতানো’র বিস্ফোরক অভিযোগ ও কলিনার পাল্টা তোপ
কোচ হাসানের ডাগআউটের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দলের ড্রেসিংরুমেও। ম্যাচ-পরবর্তী টিভি সাক্ষাৎকারে মিসরের ফরোয়ার্ড জিকো রেফারি লেতেক্সিয়েকে নিয়ে কটূক্তি করেন এবং পুরো টুর্নামেন্টকে ‘পাতানো’ ও ‘পূর্বনির্ধারিত’ বলে দাবি করেন। তার মতে, মিসরের ১৬ কোটি মানুষের আবেগ ও শ্রমকে ইচ্ছাকৃতভাবে নস্যাৎ করা হয়েছে। এর সঙ্গে কোচ হোসাম হাসান রেফারির দিকে বর্ণবাদবিরোধী 'নো টু রেসিজম' হাত উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানান।
তবে মিসরীয়দের এসব গুরুতর অভিযোগ মোটেও হালকাভাবে নেয়নি ফিফা। ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা সরাসরি রেফারির সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিয়ে পাল্টা বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘এ ধরনের ভিত্তিহীন ও কুরুচিপূর্ণ অভিযোগ মাঠের অফিশিয়াল ও তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি ও ঝুঁকি তৈরি করে, যা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।’ শেষ পর্যন্ত আলোচনা-সমালোচনার সেই বিতর্কের মধ্যেই ম্যাচের প্রায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় এসে শাস্তির মুখোমুখি হলে মিসরের ফুটবলার-কোচরা।
বিশ্বকাপের নতুন সাইকেলে বড় ধাক্কা
ফিফার এই আকস্মিক ও কঠোর নিষেধাজ্ঞায় আগামী দিনের ম্যাচ ব্যবস্থাপনায় বিশাল এক ধাক্কা খেল মিসর দল। সম্প্রতি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কোচ হোসাম হাসানের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছিল দেশটির বোর্ড, কিন্তু এই শাস্তির কারণে নতুন আন্তর্জাতিক সাইকেলের শুরুতেই ডাগআউটে পাবেন না তাকে।
এদিকে আগামী নভেম্বরে ২০২৭ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (এএফসিওএন) বাছাইপর্বে মালাউইয়ের বিপক্ষে হোম-অ্যাওয়ে দুই ম্যাচেই দলের স্পর্শসীমানায় থাকতে পারবেন না কোচ হোসাম হাসান ও টিম ডিরেক্টর ইব্রাহিম হাসান। এমনকি ২০২৭ সালের মার্চে অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও তারা থাকবেন নিষিদ্ধ। অন্যদিকে পাঁচ ম্যাচের বড় শাস্তির কোপে পড়ে জাতীয় দলের প্রধান ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত পুরো আন্তর্জাতিক উইন্ডো ও আফ্রিকা কাপ অব নেশনস বাছাইপর্বের চারটি ম্যাচ থেকেই ছিটকে গেলেন।
হামজার হতাশার কারণ জানালেন ডুলি