প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমরা যেমন সকলে মিলে সকল ধর্মের মানুষ মিলে এদেশকে স্বাধীন করেছিলাম। সকল ধর্মের মানুষ একসাথে আমরা এদেশে মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই তাহলে আমাদের সকল ধর্ম মতের মানুষকে একসাথে দেশের জন্য কাজ করে আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে।’
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রংপুরের ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এসে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর এটি তার প্রথম রংপুর সফর।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিগত আন্দোলন ও অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস স্মরণ করে বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমরা যখন যুদ্ধ করে এই দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম তখন কিন্তু আমরা কোন ধর্ম দেখিনি প্রত্যেকটি মানুষ বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন মতের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিল ঠিক একইভাবে দেশ স্বাধীনের পরে যখন বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র হুমকি সম্মুখীন হয়েছিল তখন এই দেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল এবং যে মানুষগুলো নেমে এসেছিল সেই মানুষগুলোর ভেতরেও সকল ধর্মের মানুষই ছিল সকল মত সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ছিল। ঠিক একইভাবে বেশিদিন আগের কথা নয় দুই আড়াই বছর আগের কথা বাংলাদেশে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এই দেশের ছাত্রজনতা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাঁধে যে স্বৈরাচার চেপে বসেছিল তাকে এই দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি সেই গণঅভ্যুত্থানের রাজপথের দৃশ্য দেখি, তাহলে দেখব সেই দৃশ্যের মধ্যে আমরা এই বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল ধর্মের মানুষের সম্মেলন সেখানে হয়েছিল। সকল মানুষের কে আমরা দেখেছিলাম দলমত বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি ধর্মের মানুষ প্রতিটি পেশার মানুষ সেই রাজপথে সেদিন নেমে এসেছিল তাদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। এই কথাগুলো আমার বলার মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হচ্ছে যে দেখুন এই দেশটি হাজার বছর ধরে সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। শান্তিতে আমরা সকলে মিলে বসবাস করছি। আমরা চাই বিগত হাজার বছর ধরে যেমন আমরা প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষ এই দেশে শান্তিতে একসাথে বসবাস করেছি। আগামী বছর হাজার বছরেও যাতে আমরা একসাথে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’
বেলা ১২টা ৪ মিনিটে সৈয়দপুর বিমান বন্দর থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানানো হয়। ছোট শিশুরা নৃত্য পরিবেশন করে প্রধান অতিথিকে অভ্যর্থনা জানায়। মন্দিরে এসে প্রধানমন্ত্রী পুজারীদের সাথে কথা বলেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে সভাপতি ভবতোষ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট উপহার দেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের হাতে ১০ লক্ষ টাকার চেক প্রদান করেন। এছাড়া মন্দিরের পেছনের হোস্টেলের মতো অবকাঠামো তৈরিতে আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি দেখতে সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
জনকল্যাণ ও দেশের সার্বিক উন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঠিক একইভাবে বর্তমান সরকারকে এই দেশের মানুষ নির্বাচিত করেছে। হতে পারে কোন অঞ্চলে আমাদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে, কোন অঞ্চলে আমাদের সদস্য নির্বাচিত হয় নাই। কিন্তু বর্তমান সরকার এমন একটি সরকার হতে চায় এই সরকারকে যে ভোট দিয়েছে তারও সরকার হতে চায় এই সরকার। যে ভোট দেয়নি তারও এই সরকার সরকার হতে চায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থাৎ আমরা সকল এলাকা বা সকল মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। সকল এলাকার উন্নয়ন আমরা সমানভাবে রাষ্ট্রের যে অর্থনৈতিক অবস্থা আছে তার উপরে বিবেচনা করে আমরা সকল এলাকার সম বন্টন করে সকল এলাকার সমানভাবে উন্নয়ন করতে চাই।’
রংপুর অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘এর ভিতরে হয়তো আপনারা অনেকেই জানেন। সে কারণেও রংপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য এরই ভিতরে গত দুই সপ্তাহ আগে একমিক মিটিংয়ে ১৮‘শ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় লোকাল গভর্মেন্টের মাধ্যমে জেলা পরিষদকে দিয়ে আমরা এই জেলার বিভিন্ন উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন ইউনিয়নগুলোতে, বিভিন্ন গ্রামগুলোতে মানুষের প্রয়োজনীয় যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার দরকার, ব্রিজ-কালবার দরকার, স্কুল কলেজ দরকার সেগুলো ইনশআল্লাহ আমরা পর্যায়ে ভাবে গড়ে তুলবো যাতে মানুষ সকল প্রকার রাষ্ট্রের সকল সুযোগ সুবিধা পেতে পারে।’
তবে এসব উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সকলকে ভেদাভেদ ভুলে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এই কাজগুলো যদি করতে হয় তাহলে আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে, এই কাজগুলো যদি করতে হয় তাহলে আমাদের ভিতরে ভেদাভেদকে ভুলে থাকতে হবে, এই কাজগুলো যদি করতে আমাদেরকে একসাথে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’
দেশের চলমান স্থিতিশীলতা ও একটি মহলের বিভ্রান্তি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সাথে একটি কথা বলতে হয়। কিছুদিন যাবৎ আমরা দেখেছি আমরা যেই ঐক্যটি তৈরি করতে চাচ্ছি, বর্তমান সরকার যে ঐক্যটিকে তৈরি করতে চাচ্ছি, বর্তমান সরকার সকলকে নিয়ে যেখানে চলতে চাইছে আমরা দেখছি একটি মহল বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে পরিষ্কারভাবে আমি সকলের উদ্দেশ্যে একটি কথা বলতে চাই.. বিশেষ করে যারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন। আমরা দেখেছি অতীতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেউ একজন বিতর্কিত করতে চেয়েছিল, কোন একটি দল বিতর্কিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই ফলাফলটা খুব শুভ হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ সেই ফলাফলটিকে বা সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেন।’
২৪ এর গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছি ২৪ এর যে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান সেই গণঅভ্যুত্থান থেকেও কোন কোন মহল বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। আমি সকলকে সাথে নিয়ে গণতন্ত্রকামী সকল জনগণকে একসাথে নিয়ে গণতন্ত্রকামী জনগণের পক্ষ থেকে বলতে চাই যে দয়া করে আপনারা কেউ ২৪ এর ছাত্র জনতার যে গণঅভ্যুত্থান সেটিকে দয়া করে আপনারা বিতর্কিত করবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসুন আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদ গঠন করেছে সেই সংসদে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদেরকে পাঠিয়েছে। আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে, যদি কিছু তুলে ধরার থাকে আসুন আমরা সংসদে সেই কাজটি করি, সেই বিতর্কিতটুকুই সেই সিদ্ধান্তটি জনগণের পক্ষে জনগণ রাষ্ট্রের পক্ষে যেটি ভালো হবে সেই সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করি। আমরা অতীতের মত এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি করতে না করি যাতে করে জনগণের যে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আছে জনগণের যে সন্তানদের যে শিক্ষা আছে, স্বাস্থ্য সুবিধা আছে, জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি বাকরি আছে, এগুলো যাতে কোনভাবে ব্যাঘাত না ঘটে এ দেশে। বর্তমানে জনগণ দেশে একটি স্থিতিশীলতা চায় জনগণ চায় শান্তিতে থাকতে জনগণ যায় নিরাপদে থাকতে এবং বর্তমান সরকার তার জন্যই কাজ করছে।’
রাজনীতির পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশটি আমাদের সকলের। এই দেশকে গড়ে তুলতে হলে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে, দেশটিকে গড়ে তুলতে হলে আমাদেরকে সকল বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সবচেয়ে বড় কথা অতীতে আমরা যে রাজনীতি দেখেছি তার পরিবর্তন আমরা করতে চাই। কিন্তু এই পরিবর্তন সরকার চেষ্টা করছে করার জন্য। কিন্তু এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে জনগণ। এই জনগণকে আমরা বর্তমান সরকার অতীতের মতন বর্তমানে পাশে পেতে চায়।’
হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভ নবমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই নবমীর দিনে আমার প্রত্যাশা থাকবে সকল মানুষের কাছে এই দেশের সকল মানুষের কাছে সকল ধর্মের মানুষের কাছে আসুন আমরা আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশ গড়ার জন্য একসাথে কাজ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তান শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করি, আমরা আমাদের দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের সুবিধা নিশ্চিত করি, আমরা আমাদের দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করি। সর্বোপরি আমরা দেশে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যেভাবে প্রয়োজন আমরা সেভাবেই কাজ করি সকলে মিলে। আসুন প্রতিটা ধর্মের মানুষ আমরা যাতে আগামী হাজার বছর সুন্দরভাবে শান্তি একসাথে থাকতে পারি সেই প্রত্যাশা রাখছি।’
এর আগে সৈয়দপুর থেকে রংপুর আসার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় দুটি পথসভায় বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্তু কুমার কুন্ড, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, নিপুণ রায় চৌধুরী, ছাত্র দলের পার্থ দেব্, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, রংপুর ধর্মসভার স্বপন কুমার ভুট্টচার্য প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ রংপুরের সংসদ সদস্য ও জেলা নেতারা। মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
রংপুরের রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী: অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা
‘সব ধর্মের মানুষ নিয়েই দেশ গড়ব’: প্রধানমন্ত্রী
সৈয়দপুর থেকে সড়কপথে রংপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী
পূজামন্ডপ পরিদর্শনে একদিনে তিন বিভাগে সফর, রংপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী