হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছ, বিলুপ্ত হচ্ছে বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬ এএম

বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রকাশিত প্রাথমিক স্তরের বাংলা পাঠ্যবইয়ে বাবুই পাখিকে নিয়ে কবি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতাটি প্রায় সকলেরই পড়ার সুযোগ হয়েছে। কবিতাটি হলো—‘বাবুই পাখিকে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে। বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তায়? কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়। পাকা হোক তবু ভাই পরেরও বাসা, নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।’


একসময় আবহমান বাংলার প্রতিটি গ্রামের তালগাছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। এখন কালেভদ্রে চোখে পড়ে বাবুই পাখির বাসা। আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে তালগাছ ও বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা। অধিকাংশ শিক্ষার্থী পাঠ্যপুস্তকের কবিতা পড়েই বাবুই পাখির শিল্পনিপুণতার কথা জানতে পারছে বা পেরেছে। বাস্তবে বাবুই পাখির বাসা দেখার সৌভাগ্য হয়নি বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর।


একসময় মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গ্রাম ও হাওরাঞ্চলে সারি সারি উঁচু তালগাছ দেখা যেত। সেই তালগাছগুলোর পাতায় পাতায় ঝুলে থাকত বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা। এখন আর এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। সময়ের পরিক্রমায় এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বাবুই পাখির সেই দৃষ্টিনন্দন বাসা আর গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী তালগাছ—দুটিই এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে।


মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের উত্তরভাগ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘একসময় আমাদের গ্রামে প্রচুর তালগাছ ছিল। গ্রাম্য মেঠোপথের পাশেই সারি সারি তালগাছের পাতায় পাতায় ছিল বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা। বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে আমাদের পুরো গ্রাম থাকত মুখরিত। শুধু আমাদের গ্রাম নয়, আবহমান বাংলার প্রতিটি গ্রামেই ছিল অসংখ্য তালগাছ। এখন আর জেলার গ্রামে-গঞ্জে তালগাছ খুব একটা দেখা যায় না। সেই সঙ্গে দেখা যায় না বাবুই পাখিও।’


শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের সরকার বাজারের বাসিন্দা জনি দাস বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে গত এক দশক আগেও যে পরিমাণ তালগাছ ছিল, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। শুধু আমাদের গ্রামেই ২০০১-২০০২ সালের দিকে রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন বাড়িতে কমপক্ষে দুই শতাধিক তালগাছ ছিল। এসব গাছে ছিল বাবুই পাখির বাসা। এখন পুরো গ্রাম ঘুরে একটি তালগাছের দেখা পাওয়া যাবে কি না, সন্দেহ। আর বাবুই পাখির বাসা তো অনেকটা জাদুঘরে যাওয়ার মতো বিষয়।’


শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রূপসপুর (ফুলবাড়ি) এলাকায় পাশাপাশি দুটি তালগাছে রয়েছে অসংখ্য বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা। প্রতিদিন বিকেলে এসব বাবুই পাখি দেখতে এলাকায় ভিড় করেন অনেকে। ওই এলাকার বাসিন্দা হাজী মো. ফজলুর রহমান বলেন, ‘নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য, অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ ইত্যাদি কারণে তালগাছ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। ফলে বাবুই পাখি তার আবাস হারিয়ে ফেলছে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।’


কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর এলাকার সোলেমান হোসেন বলেন, ‘আমার এলাকায় ছোটবেলায় অনেক তালগাছ ছিল, ছিল বাবুই পাখির বাসাও। এখন পুরো এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে মাত্র একটি তালগাছ রয়েছে। তবে আগে ওই গাছে বাবুই পাখির বাসা দেখা গেলেও কয়েক বছর ধরে সেই গাছে আর বাবুই পাখির বাসা দেখা যাচ্ছে না।’


শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াছিন আরাফাত রবিন বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় আমাদের এলাকায় অসংখ্য তালগাছ দেখেছি। এসব তালগাছে বাবুই পাখিরা বাসা বাঁধত। এখন আর তালগাছ চোখে পড়ে না, চোখে পড়ে না বাবুই পাখির বাসাও।’


পাখিপ্রেমী খোকন সিং বলেন, ‘আমি বিভিন্ন জাতের পাখি নিয়ে খোঁজখবর করি। ফটোগ্রাফি করি বলেই পাখি নিয়ে খোঁজ রাখতে হয়। আমি জেনেছি, একসময় পাহাড়, টিলা ও হাওরের জেলা মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় দাগি, বাংলা ও দেশি—এই তিন প্রজাতির বাবুই পাখির আবাস ছিল। এর মধ্যে বাংলা ও দাগি বাবুই এখন নেই বললেই চলে। এগুলো বিলুপ্তপ্রায়। কোনোরকমে টিকে আছে কিছু দেশি বাবুই পাখি। বাবুই পাখির বাসা তৈরির জন্য অত্যাবশ্যকীয় হলো তালগাছ। এ গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাবুই পাখির আবাসস্থল সংকটাপন্ন। বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ রোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’


বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, ‘নানা কারণে গ্রামাঞ্চলে তালগাছ অবাধে কাটা এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের ফলে বাবুই পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি রক্ষা করতে হবে তালগাছ, বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হবে বাবুই পাখিকে। নতুবা অনেক প্রাণীর মতো একসময় বাবুই পাখিও শুধু পাঠ্যপুস্তকেই স্থান পাবে, বাস্তবে দেখা যাবে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত