দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলোর তুলনায় মোবাইল আর্থিক সেবায় (এমএফএস) পিছিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকগুলো। শুধু তাই নয়, গেল কয়েক মাসে এ সেবায় হিসাবের সংখ্যা ও লেনদেন, দুটিই কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএসে লেনদেন আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকায় নেমেছে। একই সময়ে হিসাবের সংখ্যা কমেছে ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি। তবে কেনাকাটার বিল পরিশোধে মার্চেন্ট পেমেন্ট বেড়েছে, যা এ সেবার ব্যবহারে ভিন্ন প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর শাখা, উপশাখা ও এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত এমএফএস হিসাবের সংখ্যা ছিল ২৮ লাখ ৮০ হাজার ৩৭৪টি। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার ৮৮টিতে। এক মাসে হিসাব কমেছে ২ লাখ ২০ হাজার ২৮৬টি। তবে গত বছরের আগস্টের তুলনায় হিসাব বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার।
অন্যদিকে, জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএসের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক মাসে লেনদেন কমেছে ৩৩০ কোটি টাকা বা প্রায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ২৭১ কোটি টাকা বা প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
এমএফএসের মাধ্যমে নগদ জমা ও উত্তোলন কমে যাওয়ায় আগস্টে মোট লেনদেনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএসে নগদ জমা বা ক্যাশ ইন হয়েছিল ৩৪৪ কোটি টাকা। আগস্টে তা কমে ২১২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নগদ উত্তোলন বা ক্যাশ আউট ৫০৫ কোটি টাকা থেকে কমে ৪০০ কোটি টাকায় নেমেছে।
ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির হিসাবে অর্থ স্থানান্তর বা পিটুপি লেনদেনও কমেছে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেন ছিল ২৫ কোটি টাকা, আগস্টে তা কমে ২১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বেতন বিতরণের লেনদেনও ৩১৮ কোটি টাকা থেকে কমে ১৯৪ কোটি টাকায় নেমেছে।
তবে এ সময়ে মার্চেন্ট পেমেন্ট বেড়েছে। জুলাইয়ে কেনাকাটার বিল পরিশোধে লেনদেন হয়েছিল ৪১৭ কোটি টাকা, আগস্টে তা বেড়ে ৪৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এক মাসে এ খাতে লেনদেন বেড়েছে ২৮ কোটি টাকা। পাশাপাশি সরকারি অর্থ প্রদান বা জিটুপি লেনদেনও বেড়েছে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেন ছিল ১৩ কোটি টাকা, আগস্টে তা বেড়ে ১০১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এমএফএস হিসাব ও লেনদেনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ব্যবধান অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সব তফসিলি ব্যাংকের এমএফএস হিসাবের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ৯৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
লেনদেনের ক্ষেত্রেও ব্যবধান আরও স্পষ্ট। আগস্টে সব তফসিলি ব্যাংকের মোট এমএফএস লেনদেনের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ৯৯ দশমিক ৯২ শতাংশ।
এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএস সেবা এখনো সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খুব সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও গত বছরের আগস্টের তুলনায় এ খাতে হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে, তবু লেনদেনের পরিমাণে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এমএফএসের হিসাবের সংখ্যা বাড়লেই সেবাটির ব্যবহার বাড়ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের একাধিক হিসাব থাকতে পারে, আবার হিসাব খোলার পর নিয়মিত লেনদেন না হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তাই হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সক্রিয় গ্রাহক, লেনদেনের পরিমাণ ও সেবার ব্যবহার কতটা বাড়ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএস সেবা সম্প্রসারণে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সেবা তৈরি, লেনদেন সহজ করা, এজেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল লেনদেনে আস্থা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর পিছিয়ে থাকার কারণও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ব্যাংকারদের মতে, ডিজিটাল আর্থিক সেবায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সহজে লেনদেনের সুযোগ, গ্রাহকসেবার মান এবং ব্যবসায়ীদের কাছে সেবার গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের কাছে এমএফএস সেবা জনপ্রিয় করতে হলে লেনদেনের খরচ কমানো এবং সেবার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।