মাগুরা পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ শাকের হোসেনকে (৩৮) দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করেছে। গতকাল বুধবার ভোর ৫টার দিকে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টারে কর্মরত অবস্থায় দুর্বৃত্তরা মাথার পেছনে গুলি করে। অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্তের সময় তার মাথার ভেতর থেকে বুলেট উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনাটিকে টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেছেন মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান। এ ঘটনায় দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।
নিহত শাকের হোসেন মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী বিশ্বাসপাড়া এলাকার মৃত কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পৌর বাস টার্মিনালে রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বুধবার ভোরে মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি কাউন্টারের সামনে আসেন। তাদের একজন বাইরে মোটরসাইকেলে অপেক্ষা করছিলেন, অন্যজন রয়েল পরিবহনের বাস কাউন্টারের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় বাইরে মোটরসাইকেলের উচ্চ শব্দ শোনা যায়। একপর্যায়ে শাকের হোসেন নিজের চেয়ারে বসা অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করে মাগুরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মাগুরা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার মাইনুল হাসান বলেন, সকালে তাকে হাসপাতালে আনার পর প্রথমে স্ট্রোক হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে পুনরায় পর্যবেক্ষণ করে মাথার পেছনে সরু ছিদ্র দেখা যায়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরবর্তী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পরে দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে তার মাথা থেকে বুলেট উদ্ধার করা হয়।
মাগুরা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার কৃষ্ণ বিশ্বাস জানান, ময়নাতদন্তের সময় শাকেরের মাথার পেছনের আঘাত পরীক্ষা করে মাথার ভেতর থেকে গুলির আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পরে দেওয়া হবে।
ঘটনার বিষয়ে কাউন্টারের আরেক পরিচালক বিপুল কুমার দাস জানান, এক যাত্রীর বরাত দিয়ে তিনি জানতে পেরেছেন, কাউন্টারের কাছাকাছি একটি মোটরসাইকেল আসার পর গুলির মতো শব্দ শোনা যায়। পরে মোটরসাইকেলটি দ্রুত চলে যায় বলে ওই যাত্রীর স্ত্রী দাবি করেছেন। তবে মোটরসাইকেলটির সঙ্গে শাকেরের মৃত্যুর ঘটনার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শাকেরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা শহরের বিক্ষোভ মিছিল করে। বিক্ষোভকারীরা পৌর বাস টার্মিনালের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। ঘণ্টাব্যাপী অবরোধে রাস্তায় দূরপাল্লার প্রচুর গাড়ি আটকা পড়ে। এ সময় দূরের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। পরে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আব্দুর রহিম ও ছাত্রদল নেতা শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, তারা শুরু থেকেই ঘটনাটিকে হত্যাকা- বলে সন্দেহ করছেন। ময়নাতদন্তে গুলির আলামত পাওয়ার তথ্য সামনে আসায় দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান।
মাগুরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী আহমেদ বলেন, শাকের দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের সহযোদ্ধা ছিলেন। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ মাগুরার মানুষ শোকাহত। তিনি দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, দায়ীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান।
পরিবহন কাউন্টার মালিক সমিতির সেক্রেটারি মোহাম্মদ রানা মোল্লা বলেন, বাস টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন ঘটনা পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং টার্মিনালে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান তিনি। পরিবহন-সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিরাও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও টার্মিনালের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। আমাদের বিশেষজ্ঞ দল তদন্ত শুরু করেছে। হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। সুরতহাল প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ঘটনার বিভিন্ন দিক ও আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এ ঘটনায় এখনো অভিযোগ দাখিল করা হয়নি।
সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান বলেন, শাকেরের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে শাকের সামনের সারিতে ছিলেন। এটা একটাÑএটা একটা টার্গেট কিলিং, এই ঘটনাটা কিন্তু মাগুরার জন্য একটা ভিন্ন মেসেজ। আমরা জীবনে কখনোই মাগুরাতে এরকম টার্গেট কিলিং হয়নি।
শাকেরের পরিবারে দুটি ছোট সন্তান রয়েছে এবং তার মা অসুস্থ উল্লেখ করে সংসদ সদস্য পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি পৌর বাস টার্মিনালে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান তিনি। বুধবার বিকেলে স্থানীয় ব্যাপারীপাড়া জামে মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।