সামনে হাইভোল্টেজ ‘এল ক্লাসিকো’র আমেজ, অন্যদিকে ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে নিজেদের সমর্থকদেরই দুয়োধ্বনির মুখে পড়ার বিষাদ, সব মিলিয়ে এক মিশ্র আবহে আরবি লাইপজিগের মুখোমুখি হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। তবে মাঠের ফুটবলে সে সব জটিল হিসেবনিকেশ উবে গেল মুহূর্তেই। প্রথমার্ধের চরম অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত কামব্যাকে লাইপজিগকে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারায় হোসে মরিনহোর শিষ্যরা।
উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা তিন জয়ে নিজেদের শতভাগ সাফল্য বজায় রাখার পাশাপাশি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার বিপক্ষে মহা-লড়াইয়ের আগে নিজেদের আত্মবিশ্বাসের পারদটা উঁচুতে তুলে রাখল লস ব্লাঙ্কোসরা।
ম্যাচের প্রথমার্ধে ম্যাচের দৃশ্যপট অবশ্য এতটা একপেশে ছিল না। শুরুতেই লাইপজিগ আক্রমণভাগে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল রিয়াল রক্ষণে। ক্রিস্টোফার এনকুনকু ও রোমুলোর দুটি বিপজ্জনক প্রচেষ্টা অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দিয়ে রিয়ালকে কাণ্ডারীর মতো বাঁচান বেলজিয়ান গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া।
প্রতিপক্ষের সেই চাপ সামলে বিরতির ঠিক দুই মিনিট আগে (৪৩ মিনিটে) কাঙ্ক্ষিত প্রথম গোল পায় রিয়াল। আরদা গুলেরের শট ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে গোলরক্ষক মার্টেন ভান্দেভোর্তের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেলে একদম গোললাইনের কাছ থেকে আলতো স্পর্শে জাল খুঁজে নেন ম্যানচেস্টার সিটি থেকে আসা বার্নার্দো সিলভা। রিয়ালের জার্সিতে এটিই তাঁর প্রথম গোল।
বিরতির পর মাঠের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়; শুরু হয় রিয়ালের বিধ্বংসী আক্রমণাত্মক রূপ। ৫২ মিনিটে জুড বেলিংহামের সুনির্দিষ্ট ক্রস থেকে বক্সে দাঁড়ানো কিলিয়ান এমবাপ্পে দারুণ হেডে বল বাড়ান গুলেরের দিকে। সুযোগসন্ধানী গুলের প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে আলতো ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-০ করেন।
সেখানে গুলের জালের দেখা পেলেও এমবাপ্পে করেন দারুণ এক কীর্তি। মাঠে গোল করা যার নিত্যদিনের অভ্যাস, সেই এমবাপ্পেই বানিয়ে দেওয়ার কারিশমাতেও নতুন উচ্চতা স্পর্শ করলেন। অপ্টার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ম্যাচের পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে ২৬টি অ্যাসিস্টের মালিক এখন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। ইউরোপসেরার এই প্রতিযোগিতায় ফরাসি খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতার তালিকায় ফ্রান্সের কিংবদন্তি ও বিশ্বকাপজয়ী তারকা জিনেদিন জিদানকে স্পর্শ করে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন এমবাপ্পে। ২৭ অ্যাসিস্ট নিয়ে এই তালিকায় শীর্ষে আছে করিম বেনজেমা, হয়তো এই আসরে তাকে ছাড়িয়ে যাবেন এমবাপ্পে।
এরপর ৭০ মিনিটে লা লিগায় চার ম্যাচের নিষেধাজ্ঞায় থাকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে তুলে নিয়ে মাঠে নামানো হয় এই গ্রীষ্মেই লাইপজিগ থেকে রেকর্ড ১৪০ মিলিয়ন ইউরোতে রিয়ালে আসা ইভোয়ান ফরোয়ার্ড ইয়ান দিওমান্দেকে।
দিওমান্দে মাঠে আসার পরই ম্যাচের মাত্রা বহু গুণে বেড়ে যায়। ৮৩ মিনিটে এই ইভোয়ান তরুণের পাসে বক্সের প্রান্ত থেকে বাঁকানো শটে মৌসুমের ১২তম গোলটি পূর্ণ করেন এমবাপ্পে। এক মিনিট পর ৮৪ মিনিটে তিদিয়াম গোমিস লাইপজিগের হয়ে এক গোল শোধ করলেও তা কেবলই ব্যবধান কমিয়েছে। কারণ ৮৬ মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের বাড়ানো পাসে বাতাসে ভেসে অসাধারণ এক দূরপাল্লার ভলিতে বার্নাব্যু মাতিয়ে দলের চতুর্থ গোলটি করেন দিওমান্দে; নিজের সাবেক ক্লাবের জয়ের সব আশা সেখানেই মাটি নিশ্চিত করেন ৪-১ ব্যবধানের সহজ জয়।
তবে বার্নাব্যুতে এই বিশাল জয়ের রাতেও কালো মেঘ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিনিসিয়ুসের পারফরম্যান্স ও সমর্থকদের ক্ষোভ। সাম্প্রতিক অফ-ফর্ম ও ক্লাসিকোর আগে উদ্বেগ থেকে নিজের মাঠেই সমর্থকদের একাংশের দুয়োধ্বনির (হুইসেল) মুখে পড়েন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। বিষয়টি নিয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মরিনহো নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি যখন প্রতিপক্ষের মাঠে দুয়োধ্বনির শিকার হবেন, সেটি আপনার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যখন নিজের ঘরের মাঠেই দুয়োধ্বনি শুনবেন, সেটি আপনাকে কষ্ট দেয়।’
ভিনিসিয়ুসের অবস্থান ও তাঁকে তুলে নিয়ে দিওমান্দেকে নামানো নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মরিনহো আরও যোগ করেন, ‘ক্লাসিকোর কথা ভেবে আমি দিওমান্দেকে নামাইনি, নামিয়েছিলাম এই ম্যাচটার কথা ভেবেই। কারণ আমি জানতাম শেষ ৩০ মিনিটে সতেজ দিওমান্দে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। তবে ভিনিও ট্যাকটিক্যালি ভালো খেলেছে। সে যদি মন খারাপ করে থাকে, তবে তার কারণ সে ক্লাব ও সমর্থকদের অনেক কিছু দিতে চায়। সমর্থকরা আজ মাঠে এসে এমবাপ্পে ও দিওমানদের প্রদর্শনী দেখে আনন্দ নিয়েই বাড়ি ফিরেছে।’
সতীর্থ ভিনিসিয়ুসের দুঃসময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যম মোভিস্তারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে বলেন, ‘ভিনিকে একদম শান্ত থাকতে হবে এবং সে কে—সেটা নিয়ে গর্ববোধ করতে হবে। একজন মহান ফুটবলারের নিজের সামর্থ্য নিয়ে গর্ব থাকা উচিত। তার দ্রুতই আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে, কারণ তার সেই সহজাত মান রয়েছে।’
এসব আলোচনার মধ্যেই ক্লাব ফুটবল এবার প্রহর গুনছে সেই ঐতিহাসিক এল ক্লাসিকোর। সেখানে মৌসুমে প্রথম ক্লাসিকোতে আগামী রবিবার বার্সেলোনার মাঠে নামবে লস ব্লাঙ্কোসরা।
মেসির উত্তরসূরীর জোড়ায় ম্যানইউকে লজ্জায় ফেললো কোমো