চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের কাজ করছে সরকার। চলতি বাজেটের প্রধান দুটি লক্ষ্য হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রক্ষেপিত জিডিপি অর্জন। কিন্তু বিশ্ব বাজারের তাল মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জন হবে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, চলতি অর্থবছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে।
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি। একটি নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে, কোনো দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট বাজারমূল্যকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বলা হয়।
বিদ্যমান বাস্তবতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকসহ সর্বশেষ অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা সেবা খাতের মধ্যে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাত নানা চ্যালেঞ্জ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ফলে সেবা খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, শিল্প খাতেও গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এদিকে সার সংকটে কৃষি খাতের পরিস্থিতিও অনুকূলে নেই।
কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকা-েও এর প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে সেবা, শিল্প ও কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ তিনটি খাতই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৬-২৫ অর্থবছরের চার প্রান্তিকের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তার পরের প্রান্তিকে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে। তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে হয়েছে ২ দশমিক ২২ শতাংশে। সর্বশেষ চতুর্থ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৬০ শতাংশে। চলতি অর্থ বছরে (২০২৬-২৭) সরকারের লক্ষ্য এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে গত অর্থবছরে তুলনায় ২ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত এপ্রিলে বাংলাদেশের জন্য চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে গত ১৩ অক্টোবর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করে সংস্থাটি। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। বিবিএসের তথ্য মতে, দেশে সর্বশেষ এত দুর্বল প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে। ওই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। এমনকি করোনা মহামারির সময়েও (২০১৯-২০ অর্থবছরে) দেশে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে, যা গত এপ্রিলের ৪ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে কম। অন্যদিকে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও (এডিবি) তাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এনেছে; জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের পূর্বাভাস দিলেও সেপ্টেম্বরে তা কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় কাঁচামাল আমদানির খরচও বেড়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থ্যাগুলো তাদের পূর্বাভাস কমিয়েছে বলে ধারণা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়ে সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর থাইল্যান্ডে আইএমএফের বার্ষিক সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অসুবিধা নাই। আমরা কারও প্রক্ষেপণকে, কারও কোনো পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চাই না। এটা ওদের হিসাবে ওরা দিয়েছে, খুবই ভালো কথা। আমরা কাজ করছি। দেখা যাক, সময় যখন আসবে তখন আমরা বাকি সূচকগুলো দেখতে পাব, মানদন্ডগুলো দেখতে পাব।
তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো নিয়ে কোনো বিতর্কে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি, ওরা ওদের মতো করছে এবং আমাদের মধ্যে যে সহযোগিতা দরকার, সে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এটা হচ্ছে মূল কথা। এর মাধ্যমে আমরা যে আমাদের ইশতেহারে, আমাদের বাজেটে যে প্রক্ষেপণগুলো করেছি; আমরা আশা করি, সেগুলো আমরা পূরণ করতে পারব।’
বিষয়টি নিয়ে সেন্ট্রার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ, একদিকে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হচ্ছে, তাছাড়া সংকুচিত মুদ্রানীতি আছে সরকারের। একই সঙ্গে জ¦ালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় কাঁচামাল আমদানির খরচও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগই আশানুরূপ নয়। এ ছাড়া ক্যাপিটাল মেশিনারিজের আমদানিও কমেছে। অন্যদিকে, খেলাপি ঋণের আধিক্যসহ ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতার কারণে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে আসছে।
তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সমস্যাও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি থাকায় সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতাও সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
নাজনিন আহমেদ বলেন, এসব কারণেই আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি ৩ দশমিক ২ থেকে ৪-এর মধ্যে পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। বিনিয়োগ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।