ডেঙ্গুতে এবার হাজারে মৃত্যু ৩.১০ জন

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৮ এএম

দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার গত পাঁচ বছরের তুলনায় এবার কম। ২৬ বছরে কম মৃত্যু হারে দ্বিতীয়। ২০০০ সালে যখন ডেঙ্গু বেশ আলোচিত ছিল। ওই বছর বেশ কয়েকজন মারা যান। ওই বছর থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়। তারপর প্রায় দেড় যুগ ডেঙ্গু সেভাবে দেখা যায়নি। ২০১৯ সালে এসে বহু মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে মারা যান ২৬৩ জন। তারপর থেকে ডেঙ্গু আছেই। তবে কোনো বছর ভর্তির তুলনায় এত কম মৃত্যু হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে আগে থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মৌসুম শুরুর আগেই সবাইকে সতর্ক করেন। সেই সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের দায়িত্ব ভর্তি রোগী যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা, যাতে রোগী সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরতে পারেন। তারা সেটি চেষ্টা করছেন। সারা দেশে একই গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৩৭১ জন। অর্থাৎ প্রতি হাজারে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর বিপরীতে মৃত্যু হয়েছে ৩ দশমিক ১০ জনের। অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার ছিল ৩ দশমিক ৭০, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ৫০, ২০২৩ সালে ৫ দশমিক ৩১, ২০২৪ সালে ৫ দশমিক ৬৮ এবং ২০২৫ সালে ৪ দশমিক শূন্য ১ জন। সে হিসাবে গত পাঁচ বছরে এবার মৃত্যু কম।

২০১৯ সালে প্রতি ৬১৮ জন ভর্তি রোগীর বিপরীতে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২১ সালে প্রতি ২৭১ জনে, ২০২২ সালে ২২২ জনে এবং ২০২৩ সালে ১৮৮ জনে একজনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে প্রতি ১৭৬ জনে এবং ২০২৫ সালে ২৪৯ জনে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রতি ৩২৩ জন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর বিপরীতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারপ্রধান নিজে যখন কোনো বিষয়ে সচেতন থাকেন, তখন  আর অন্যদের বসে থাকার সুযোগ থাকে না। এবার বিষয়টি ভালো লেগেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগে থেকেই সতর্ক করেছেন। নির্দেশনা দিয়েছেন। নিজেই পরিছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এ এম মুহিত বলেন, এ বছর আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার কারণে মৃত্যুর হার অনেক কম। হাসপাতালে গিয়ে মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে। বিগত সময়ে কী অবস্থা ছিল তা আপনারা জানেন। এবার শুরু থেকেই আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, সারা দেশে গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আমরা আগে থেকেই চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আশা করছি, আগামী মাস থেকে আক্রান্তের সংখ্যাও কমে আসবে।

দেশে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হন এবং ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। সে হিসাবে প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ১৬ দশমিক ৭৫ জন। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন। ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ২৬৩ জনের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে ১৬৪ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছিল রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ১ দশমিক ৬২ জন।

২০২০ সালে করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও পরের বছর থেকে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। ২০২১ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন; মারা যান ১০৫ জন। ওই বছর প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার ছিল ৩ দশমিক ৭০ জন। ২০২২ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৩৮২। মৃত্যু হয় ২৮১ জনের। ওই বছর প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার বেড়ে হয় ৪ দশমিক ৫০ জন। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় এটি দেশের অন্যতম ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব। ওই বছর প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার ছিল ৫ দশমিক ৩১ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় কমলেও মৃত্যুর হার ছিল আরও বেশি। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যান ৫৭৫ জন। প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬৮ জনে, যা গত বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। ওই বছর প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক শূন্য ১ জনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছর প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার কম থাকলেও ডেঙ্গুর বিস্তার ও মৃত্যুর সংখ্যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম বলেন, অতীতে ডেঙ্গুর মৌসুমে স্যালাইনের সংকট দেখা দিলেও এবার পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুদ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া সরকারিভাবে ডেঙ্গুর পরীক্ষা বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিদিনই কার্যক্রম অব্যাহত আছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশব্যাপী এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। গতকালও সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মসহ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন তিনি। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব।

২৪ ঘণ্টায় ৩ জনের মৃত্যু : ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২২৯ জন। মৃতদের দুজন শিশু-কিশোর। একজন নারী। চট্টগ্রাম বিভাগে দুজন ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন মারা গেছেন। ২৪ ঘণ্টায় ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ২৯৬ জন। চলতি মাসের ২৩ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ১৮১ জন। মৃত্যু হয়েছে ১২৬ জনের।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত