বগুড়াসহ ৭ জেলায় নেই ডুবুরি, বাড়ছে প্রাণহানি

জরুরি মুহূর্তে রাজশাহী থেকে উদ্ধারকারী দল আসতে পার হতে লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়, যার মাশুল দিতে হচ্ছে তাজা প্রাণের বিনিময়ে।

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

বগুড়াসহ রাজশাহী বিভাগের সাতটি জেলায় নিজস্ব কোনো ডুবুরি ইউনিট না থাকায় জলে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় উদ্ধারকাজ চরম বিলম্বিত হচ্ছে। কোনো স্থানে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল রাজশাহীর ডুবুরি দলের ওপর নির্ভর করতে হওয়ায় বহু প্রাণ অকালেই ঝরে যাচ্ছে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি করুণ ঘটনাই এই চরম বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে। গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বগুড়ার ধুনট উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে বাঙালী নদীর বালুয়া খালে ডুবে যায় ১০ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষার্থী জান্নাতি আক্তার। স্বজনরা প্রথমে খোঁজ চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিলে রাজশাহীর উদ্ধারকারী দল এসে পৌঁছায় বিকেল সাড়ে ৩টায়। প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জান্নাতির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একটি শিশু ডুবে যাওয়ার প্রায় ৭ ঘণ্টা পর তার মরদেহ পাওয়া গেল।

এর আগে, গত ১০ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে বগুড়া মহানগরের ফুলবাড়ি বারুনীঘাটে ফুটবল খেলা শেষে বন্ধুদের সাথে করতোয়া নদীতে গোসল করতে নেমে ডুবে যান কলেজ শিক্ষার্থী মুহিব হাসান শ্রাবণ। ডুবুরি দল বিকেলে পৌঁছালেও সন্ধ্যায় আলো কমে যাওয়ায় অভিযান বন্ধ করতে হয়। পরদিন ১১ আগস্ট সকালে আবার অভিযান শুরু করে প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর শ্রাবণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া গত ২১ জুলাই দুপুরে কাহালু উপজেলার ভালতা গুচ্ছগ্রামে পুকুরে ডুবে ফাহিম (৮), সুরাইয়া খাতুন (৫) ও জাকিরুল ইসলাম (৬) নামের তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়; পরবর্তীতে স্থানীয়রাই তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন।

স্থানীয়দের মতে, উদ্ধার অভিযান শুরু হতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা দেরি হওয়ার প্রধান কারণ বগুড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নিজস্ব কোনো ডুবুরি ইউনিট না থাকা। কেবল বগুড়া নয়; রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাটেও কোনো ডুবুরি ইউনিট নেই। বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে যে ইউনিটটি রয়েছে, সেখানে সদস্য সংখ্যা মাত্র ৬ জন। পুরো ৭ জেলার মানুষ দুর্ঘটনার পর এই একটিমাত্র দলের ওপরই নির্ভর করতে বাধ্য হন।

তথ্য নিয়ে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছরে বগুড়ায় জলে ডুবে যাওয়া কাউকে আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বগুড়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রাজু পাইকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‌শ্রাবণকে উদ্ধার করতে ১৯ ঘণ্টা সময় লেগেছে। বগুড়ায় ডুবুরি দল থাকলে হয়তো তাকে জীবিত উদ্ধার করা যেত। আমাদের জেলায় দ্রুত ডুবুরি ইউনিট স্থাপন করা দরকার।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন জানান, উদ্ধারকাজে অন্য জেলার ওপর ভরসা করে থাকা খুবই কষ্টদায়ক এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে ডুবুরি দল স্থাপন এখন সময়ের বড় দাবি। অন্যদিকে বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ মন্তব্য করেন, উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জেলায় ডুবুরি না থাকাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। স্থানীয় মানুষের জীবন রক্ষায় অবিলম্বে জেলায় ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের জোরালো দাবি জানান তিনি।

বগুড়া ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শহিদুল ইসলাম জানান, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের যমুনা নদীসহ খাল-বিল ও পুকুরে প্রায়ই ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে শিশুরা এর বড় শিকার। অনেক সময় সাঁতার জানা মানুষও খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারান। তাই জরুরি ভিত্তিতে বগুড়ায় একটি ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের জন্য ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত