 মব সহিংসতা

দায়িত্বশীল সব পক্ষের জবাবদিহি চাই

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

আমাদের স্মরণে আছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে টানা তিন মেয়াদের রাজনৈতিক সরকারের পতনের পর নতুন প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে মব সহিংসতা শুধু শান্তিপ্রিয় মানুষের মনেই ভীতি ও প্রশ্নের গভীর রেখাপাত করেনি, দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমেও ঝড় তুলেছিল। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বদানকারী দল বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল থেকেও এই বেআইনি তৎপরতার প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিকার দাবি করা হয়। সরকার গঠনের পরও বিএনপির কয়েকজন মন্ত্রী সমস্বরে এর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন। কিন্তু ২৭ অক্টোবর ‘বেড়েছে মব সহিংসতা’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের গর্ভে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে সংগতই প্রশ্ন দাঁড়ায়, সহিংস এসব ঘটনাকে কি নিছক ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ বলার অবকাশ আছে?

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক মব সহিংসতার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন-তখন মব সহিংসতা হলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর হার কমে এসেছিল। এ ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। তবে গত কয়েক দিনে ফের মব সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৫ দিনে মব সহিংসতায় ও গণপিটুনির আটটি ঘটনা ঘটেছে। তাতে ১০ জনের প্রাণহানিসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল জনরায় নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর সংগতই প্রত্যাশা ছিল মবের ছায়া অপসারিত তো বটেই, মব সৃষ্টিকারী এবং তাদের প্রতিপালকদের পথ সরকারের কঠোর অবস্থান ও আইনি প্রতিবিধানে রুদ্ধ হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন, মব সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অনুসরণ করছে। অপরাধের বিচার করার একচ্ছত্র কর্র্তৃত্ব রাষ্ট্রের। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।’ 

আমরা তার এই বক্তব্যের জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এর পাশাপাশি এ প্রশ্নও রাখতে চাই, কবে কাটবে এই আঁধার?  বিশ্বখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘সর্বোত্তম অবস্থায় মানুষ সব প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু আইন ও ন্যায়বিচার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সে হয় নিকৃষ্টতম’। আর সক্রেটিস বলেছেন, ‘আইন যদি ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন করে, তবে তা আর আইন থাকে না’। এই দুই মনীষীর উক্তি ফিরে ফিরে আমাদের দেশে রূঢ় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সরকার তো বটেই, অরাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপপ্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে তা চরম উৎকট রূপ নেয়। আইনের শাসন যেখানে দুর্বল, সেখানেই অবিচার সবল এরও নজির রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটিয়েই থেমে থাকবে না, সমাজে সমান্তরালে ছড়াবে রূপান্তরের আলোও। আমরা দেখছি যেকোনো অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুযোগসন্ধানী উন্মত্তকারীরা নিজেদের লালিত আক্রোশ-বিদ্বেষে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অভিযুক্তের ওপর!

নিকট অতীতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশের মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা প্রশ্নাতীতভাবে উদ্বেগজনক। সংস্থাটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সমসময়ে দেশে অন্তত ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত হয়েছেন এবং মব সহিংসতা বা গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন। নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রটিও আশঙ্কাজনক গত ৯ মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেড় দশক পর নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনও স্বাভাবিকভাবেই ছিল প্রত্যাশিত। পুলিশ ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো পৃথকভাবে আলোচনায় আসে। আমরা স্পষ্টই মনে করি, যখনই জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তখনই মানুষের মৌলিক মানবাধিকার মারাত্মকভাবে লুণ্ঠিত হয়। মব-এর কারণে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর ও প্রতিবিধান রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত