পাহাড়ের কোলে দরজা ছাড়া জুম ঘর। ভোর রাতে চোখ মেলতেই দেখি, আলো-আঁধারে শুভ্র সাদা মেঘের লুটোপুটি। দ্রুত বিছানা ছেড়ে খোলা বারান্দায় দাঁড়াই। যত দূর চোখ যায় মেঘের মেলা। তাও আবার পায়ের নিচে মেঘ। কখনো আবার ধীরলয়ে মেঘ এসে শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। বলছি পাহাড় চূড়ায় থাকা মেঘের অরণ্যের কথা।
আলীকদমের বাঘ ঝিরি। পুরনো সেগুন বন। ঘুটঘুটে অন্ধকার পাহাড়। বাঁকা চাঁদের ক্ষীণ আলো ম্রিয়মাণ। ঠিক এমনই পরিবেশে বান্দরবানের এক ট্র্যাকিং রুটে দে-ছুট ভ্রমণ সংগঠনের কয়েকজনের সঙ্গে, আমার কয়েকজন স্কুল বন্ধু যুক্ত হয়েছে। সারা দিন ডিম পাহাড়, তমা তুঙ্গী-সহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ঘোরাঘুরি করলেও, ট্র্যাকিং মুহূর্তে মানসিকভাবে বেশ চাপে ছিলাম। কখন কার কী হয়? মূলত আমি দে-ছুট এর মন্ত্র মুখস্থ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ভ্রমণসঙ্গী করি না। তারপরও স্কুল বন্ধু বলে কথা তবুও রক্ষা, সবাই ঠিকঠাক মতো পাহাড়ের ওপর থাকা জুম ঘরটাতে পৌঁছতে পেরেছি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১১০০ ফুট। চূড়ায় উঠে দেখি কুপিবাতির মিটিমিটি আলো। পর্যাপ্ত পানির নেই ব্যবস্থা। ভাবলাম পাহাড়ে রাত কাটানোর একটা অন্যরকম অনুভূতি মিলবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার পরিবেশন হলে, দুপুরে ভাত না খাওয়া বন্ধুদের চোখেমুখে হাসির ঝিলিক খেলল। যাকে বলে ভাত পাগলা বাঙালি। সবাই বেশ আয়েশ করে চেটেপুটে থালা-বাটি সাবাড় করি। এরপর স্বল্প সময়ের সুযোগে, মোবাইল চার্জে দিয়ে আড্ডায় ব্যস্ত হই। পাহাড়ের কোলে ঝকঝকে বাঁকা চাদের আলোয়, লক্ষ-কোটি তারার মেলা। কোনো কোনো তারা হুট করেই দলছুট। অদ্ভুত মায়া লাগা সৌন্দর্যে চোখ আটকায়, নক্ষত্রের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্যে। রাত বাড়ে ধীরে ধীরে চাঁদটা পাহাড়ের বুকে মিলিয়ে যায়। তখন পুরো আকাশ জুড়েই ছিল নক্ষত্রদের রাজত্ব। রাত ১১টা বাজতেই মুরগি দিয়ে বারবিকিউ করি। খেয়েদেয়ে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা চলে।
সাত সকালে ঘুম ভাঙতেই চোখ ছানাবড়া। চারদিকে জমাট বাঁধা মেঘ আর মেঘ। কখনো কখনো শুভ্র মেঘমালা শরীরে আছড়ে পড়ে। আনন্দে পাহাড়ের কোনায় কোনায় ছুটে বেড়াই। ইতিমধ্যে পুব আকাশ ভেদ করে লাল টকটকে সূর্যের উঁকিঝুঁকি। পাহাড় থেকে দেখা সূর্যোদয়ের সৌন্দর্য হয়ে থাকে অপার্থিব। আলীকদমের সর্বোচ্চ চূড়া মারায়নতং পাহাড়ের গায়ে, সূর্যের আলোর নজরকাড়া ঝলক হৃদয় কেড়ে নেয়। আসলে কিছু কিছু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা লিখে বুঝানো দায়। মেঘ অরণ্যের পাহাড়টার যেখানেই দাঁড়াই, সেখান থেকেই ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। সচরাচর সব পাহাড় চূড়ায় এ-রকমটা মেলে না। সকালের নাশতা গরম গরম খিচুড়ি। প্রাচীন মুইন্না গাছতলায় বাঁশের মাচায় পেটের তাগিদে বসে পড়ি। ততক্ষণে রোদ উঠে গেছে। সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই পুরো দশ একর পাহাড় চূড়াটা ঘুরতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন নামে বেশ কয়েকটি জুমঘর রয়েছে। শুরুতেই অভিমানী বাঁকের দিকে আগাই। পৌঁছে গিয়ে অবাক ও বিস্মিত। শুয়ে-বসে মাতামুহুরী নদীর রূপ দেখি। নীল আকাশের নিচে বসে, পাহাড়ি বুনো ফুল ও ফলের গন্ধ নিই। আমার মনে হয় ভ্রমণকালে ভালোলাগা মুহূর্তগুলো পরবর্তী সময়ে বর্ণনা করা দুষ্কর। অভিমানীর উন্মুক্ত বেলকনিতে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, ঢুঁ মারি অপেক্ষার প্রহরসহ শঙ্খচুর গোল ঘরে। সবুজ কন্যা জুমঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে, নিজেরাই যেন সবুজের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। বাস্তবতায় ফিরে এলাম মুড়ি মাখানো খাওয়ার জন্য লেলিনের হাঁকডাকে। সত্যি সত্যিই মেঘ অরণ্যের প্রকৃতির মধ্যে, অসাধারণ ভালোলাগার সৌন্দর্য বয়ে চলছে। খরতাপে মুগ্ধতার রেশ না কাটতেই, দেহ-মনে প্রকৃতির একরাশ স্নিগ্ধতা নিয়ে ফিরতি পথ ধরি।
যাবেন কীভাবে
নিজস্ব গাড়ি বা বাসে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার আবাসিক এলাকার বাঘের ঝিরি যাবেন। এরপর সেগুন বনের ভেতর দিয়ে হাইকিং-ট্র্যাকিং করে মেঘের অরণ্য পাহাড়। যেখানে যাবেন সেখানেই কর্তৃপক্ষ কর্তৃক থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করবেন। বাঘের ঝিরি এলাকায় থাকা দোকানঘরগুলোতে গাইড মিলবে।
ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংগঠন