ফুটবলের জনক ইংল্যান্ডের হাত ধরেই ব্যালন ডি’অর ইতিহাসের প্রথম আলো দেখেছিল ১৯৫৬ সালে। অথচ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বিশ্ব ফুটবলের এই জমকালো আসরে ইংলিশ ফুটবলারদের জয়গান ক্রমেই আক্ষেপে পরিণত হয়েছিল, যেখানে মাইকেল ওয়েনই ছিলেন শেষ আলোর বিন্দু। সেই দীর্ঘ ২৫ বছরের খরা কাটিয়ে ব্রিটিশ ফুটবলের মুকুটে নতুন হীরা বসালেন হ্যারি কেইন। ইতিহাসের সেই পুরনো ঐতিহ্যকে বর্তমানের কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে মিলিয়ে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত রচনা করলেন হ্যারি কেইন।
লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারের আলোঝলমলে রাতে যখন দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে হ্যারি কেইনের নাম ঘোষণা করা হলো, তখন পুরো মিলনায়তন ফেটে পড়েছিল উল্লাসে। কিলিয়ান এমবাপ্পে আর উদীয়মান সেনসেশন লামিন ইয়ামালকে পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর নিজের করে নিয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ডের তারকা স্ট্রাইকার কেইন।
১৯৫৬ সাল থেকে ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ম্যাগাজিনের আয়োজনে প্রবর্তিত ব্যালন ডি’অর বরাবরই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৫৬ সালে চালুর পর প্রথমবার এই সম্মানজনক ট্রফি জিতেছিলেন ইংল্যান্ডেরই স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস। এরপর ১৯৬৬ সালে স্যার ববি চার্লটন এবং ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে কেভিন কিগান এই সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন। তবে ২০০১ সালে লিভারপুলের সাবেক তারকা ওয়েনের এই কীর্তি জয়ের পর দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ইংলিশ ফুটবলে চলছিল এক আক্ষেপের খরা। অবশেষে কেইন কেবল পঞ্চম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্রিটিশ ফুটবলের সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করলেন।
গত মৌসুমটি ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সিতে এককথায় অবিশ্বাস্য কেটেছে কেইনের। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেসলিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগে একের পর এক রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গেছেন বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে। জার্মান ক্লাবটির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তার নামের পাশে যোগ হয়েছে রেকর্ডসংখ্যক গোল। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে পুরো মৌসুমে ৬৫ ম্যাচে মোট ৭৩ গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা নম্বর নাইন। বুন্দেসলিগায় ৩৬ গোলসহ ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে গোল করার নিরিখে গত মৌসুমে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নিজের ঘরের মাঠে এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে ট্রফি হাতে পেয়ে আবেগে প্লাবিত হন ইংলিশ অধিনায়ক। যেন স্বপ্নেও ভাবেননি এমন কিছু, ‘খুব বেশি মানুষ হয়তো এটা ভাবেনি, এমনকি হয়তো আমিও একসময় ভাবেনি যে আমি এতদূর আসতে পারব। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমাকে অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি কখনই সেই ধরনের খেলোয়াড় ছিলাম না, যাকে সবাই তখন সুপারস্টার মনে করত; যেমনটা এখনকার কিছু ছেলেদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। আমাকে নিজের সময় নিতে হয়েছে, কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। বহুবার নিজের মনের সঙ্গে লড়াই করে আমাকে এই জায়গায় পৌঁছাতে হয়েছে, নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস ও দৃঢ়সংকল্প রাখতে হয়েছে।’
ব্যালন ডি’অরের এই শীর্ষ লড়াইয়ে কেইনের ঠিক পেছনেই থেকে গেছেন রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা এমবাপ্পে। তবে এই লড়াইয়ের মধ্যেও নিজের চিরকালীন দ্যুতি ঠিকই ছড়িয়ে গেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। ইন্টার মায়ামির হয়ে মাঠ মাতানো এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা এবারের আসরেও সেরা পাঁচে থেকে নিজের অবিচল উপস্থিতির প্রমাণ দিয়েছেন। আর এই পঞ্চম স্থান অর্জনই ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডকে এনে দিয়েছে আউটফিল্ডের খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ পাঁচে জায়গা পাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলারের অনন্য এক বিশ্বরেকর্ড।
অন্যদিকে, ব্যালন ডি’অরের মূল মঞ্চে তরুণদের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক হয়ে দ্যুতি ছড়িয়েছেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ইয়ামাল। কেইন ও এমবাপ্পের পেছনে থেকে ব্যালন ডি’অর তালিকার তৃতীয় স্থান অর্জন করার পাশাপাশি ফুটবলের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হিসেবে টানা তৃতীয়বারের মতো মর্যাদাপূর্ণ ‘কোপা ট্রফি’ জিতে নিয়েছেন এই ১৯ বছর বয়সি বিস্ময়বালক। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে তিনিই প্রথম খেলোয়াড় যিনি হ্যাটট্রিক কোপা ট্রফি জেতার অনন্য রেকর্ড গড়লেন।