গাইবান্ধায় শহীদ মিনার অবমাননা ও ভাঙচুরের ভিডিও ভাইরাল, তদন্তে সত্যতা

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

গাইবান্ধায় জুতা পায়ে শহীদ মিনারে উঠে লাথি মারা, অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা ও মিনারের পিলার ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে এক কৃষি প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে কমিটি। অভিযুক্ত প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন।

অভিযুক্ত প্রশিক্ষকের নাম আহসান হাবীব। তিনি গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (এটিআই) প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

শুক্রবার রাতে তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) একেএম হেদায়েতুল ইসলাম। তিনি মুঠোফোনে বলেন, প্রশিক্ষক আহসান হাবীব জুতা পায়ে শহীদ মিনারে ওঠেন এবং সেখানে দাঁড়িয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন। ওই ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন। পরে তা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ঘটনাটি তদন্ত করা হলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ অক্টোবর সকালে ইনস্টিটিউটের ভেতরে অবস্থিত শহীদ মিনারে জুতা পায়ে ওঠেন আহসান হাবীব। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি বিভিন্ন ধরনের অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন। ১১ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন। পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর ১৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান প্রশিক্ষক আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে গাইবান্ধা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অক্টোবর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বিষয়টি পুলিশকে জানানোর কারণে আহসান হাবীব ক্ষুব্ধ হয়ে পরদিন ২৬ অক্টোবর সকালে হাতুড়ি দিয়ে শহীদ মিনারের মাঝখানের একটি পিলারের নিচের বেশ কিছু টাইলস ভেঙে ফেলেন।

গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার বিষয়ে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, অভিযুক্ত প্রশিক্ষক আহসান হাবীব ৩১তম বিসিএস (কৃষি) থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে চাকরিতে যোগ দেন। গত ১৮ অক্টোবর ফেসবুক লাইভে এসে তিনি শহীদ মিনারে উঠে অবমাননাকর বক্তব্য দেন এবং লাথি মারেন। এর ভিডিও প্রমাণ তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে রয়েছে। এ ঘটনায় দপ্তরের পরামর্শে ১৯ অক্টোবর গাইবান্ধা সদর থানায় জিডি করা হয়।

অধ্যক্ষ আরও বলেন, অভিযোগ দেওয়ায় আহসান হাবীব আরও উগ্র আচরণ করেন। পরে ইনস্টিটিউটের শহীদ মিনারের মাঝখানের একটি পিলারের নিচের বেশ কিছু টাইলস ভেঙে ফেলেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পরিচালক ও প্রশিক্ষণ উইংয়ের পরিচালককে জানানো হয়।

অন্যদিকে অভিযুক্ত প্রশিক্ষক আহসান হাবীব মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার নিয়ত ছিল শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে দেশাত্মবোধক একটি গান গাইব। ওই গান গাওয়ার জন্য ফেসবুক লাইভে এসে অতিরিক্ত আবেগের কারণে শহীদ মিনারে উঠি। সেখানে শহীদ মিনারের নামকরণ, শহীদের সংজ্ঞা, দুই ধরনের শহীদ—একটি রাষ্ট্রীয় শহীদ, অন্যটি ইসলামের শহীদ—এসব বিষয়ে নানা কথাবার্তা বলেছি। কথা বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে জুতা পায়ে শহীদ মিনারে উঠেছি। পরে তদন্ত কমিটির কাছে ভুল স্বীকার করেছি এবং ক্ষমা চেয়েছি।’

শহীদ মিনারের টাইলস ভাঙার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বিভাগের লোকজন আমাকে লাইভ ডিলিট করতে বলেননি। তাঁরা থানায় জিডি করেছেন। পরে যখন হঠাৎ করে পুলিশ ও তদন্তের মুখোমুখি হই, তখন নিজের বিভাগ ও সহকর্মীদের ওপর রাগ হয়। তাঁরা আমাকে একটা সুযোগ দিতে পারতেন। অভিযুক্ত হওয়ার পর রাতে ঘুমাতে পারিনি। মানসিক চাপে ছিলাম। পরদিন সকালে গিয়ে হাতুড়ি দিয়ে তিনটি বাড়ি দিয়েছি। সেখানে একজন লোক হাঁটছিলেন। আমি আবেগপ্রবণ হয়ে তিনবার আল্লাহু আকবার বলেছি এবং তিনটি বাড়ি দিয়েছি। যতটুকু অংশ ভেঙেছে, এখন ক্যামেরায় তোলা ছবিতে তার চেয়ে বেশি দেখছি।’

ছড়িয়ে পড়া ১১ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা রঙের ফুলহাতা শার্ট ও জলপাই রঙের প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি শহীদ মিনারের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন এবং নামছেন। তাঁর মাথায় টুপি ও মুখে দাড়ি রয়েছে। মিনারের ওপরে উঠে তিনি ‘গুড মর্নিং’, ‘নমস্কার’ বলার পর শহীদ মিনার ও শহীদের সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন কথা বলেন। একপর্যায়ে তাঁকে পা দিয়ে শহীদ মিনারে লাথি মারতেও দেখা যায়।

এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্ত প্রশিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত