শিক্ষার্থী পাবে না অনেক প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের প্রভাব পড়বে দেশের উচ্চশিক্ষায়। একদিকে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে বিপুলসংখ্যক। ফলে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে দেশের উচ্চশিক্ষার বড় একটি অংশে শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের নির্ধারিত আসন পূরণ করতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সব মিলিয়ে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে ১৮ লাখ ৭ হাজার ৫৭৬টি। এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার মোট আসনের তুলনায় এবার উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ৬০ হাজার ৮৯১টি কম। সামগ্রিক চিত্রে আসন ও উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে বড় ব্যবধান স্পষ্ট।

উচ্চশিক্ষার আসনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে। এসব প্রতিষ্ঠানে স্নাতক (পাস), স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতক কারিগরি বা সমমান পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি কলেজ মিলিয়ে আসন রয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫টি। মোট উচ্চশিক্ষার আসনের অর্ধেকেরও বেশি এ ব্যবস্থার অধীনে। কিন্তু শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পাশাপাশি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এবং আসন বাড়ায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে ভর্তির আগ্রহ কমতে পারে। ফলে এসব কলেজ সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছর ধরে অর্ধেকের বেশি আসন খালি থাকছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন রয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫টি, অথচ এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ফলে কেবল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাস করা সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও আসন খালি থাকবে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪১০টি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুই বছর ধরেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা থাকছে। এ বছর এই চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে। এসব কলেজের অধিকাংশই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বেতন ও ফি দিয়ে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করে। শিক্ষার্থী ভর্তি কমে গেলে কলেজগুলোর আয়ও কমে যাবে। এতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ নিয়মিত ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী সংকটের কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেক কলেজই বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমানুল্লাহ ফেরদৌস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বছর এইচএসসিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর চেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা বেশি। ফলে আমাদের কয়েক লাখ আসন খালি থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসন খালি থাকলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো সংকটে পড়বে এবং নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হবে। এ সংকট মোকাবিলায় আমরা বিকল্প পথ খুঁজছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কারিগরি বিষয়ে নতুন কোর্স চালু করে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদেরও কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় আনা যায় কি না, সে বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।’

ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ থাকবে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে সুযোগ না পেলে আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী অনেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তির চেষ্টা করবেন। এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ভর্তি হতে পারেন।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হতে পারে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১১৬টি সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট আসন রয়েছে ১১ হাজার ৩৭৮টি। এর মধ্যে ৩৭টি সরকারি মেডিকেলে মোট ৫ হাজার ১০০ এবং ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেলে রয়েছে ৬ হাজার ২৭৮টি আসন। সরকারি ডেন্টাল কলেজে ৫৪৫টি এবং বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ১ হাজার ৩৫০টি আসন রয়েছে। এ ছাড়া আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে আসন ৩৫০টি। পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় মেডিকেল ও ডেন্টালে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং প্রতিষ্ঠানের আসন সংখ্যার মধ্যে প্রতিযোগিতার ধরন বদলাতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তুলনামূলক দুর্বল ও মানহীন বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজে এবার শিক্ষার্থী শূন্য থাকতে পারে।

এবারের ফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩২ হাজার ৯২ জন। গত বছর পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর মোট ৭২ হাজার ১৭৬ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। এ বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রতিযোগিতায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে ইউজিসির দেওয়া তথ্যমতে, দেশের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসন রয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৫টি। ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স কোর্সে আসন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৯টি এবং পাস কোর্সে ১ হাজার ১৬০টি। ঢাকার সরকারি সাত কলেজে আসন রয়েছে ২৩ হাজার ৬৩০টি। এ ছাড়া ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৬৪ হাজার ৫২৯টি এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭ হাজার ৫৯৩টি আসন রয়েছে।

প্রকৌশল, কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ৭২০টি, টেক্সটাইল কলেজে ৭২০টি, মেরিন কলেজে ৬৬০টি এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ৩ হাজার ৭৯০টি আসন রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন ৮০০টি। নার্সিং ও মিডওয়াইফারিতে রয়েছে ৫ হাজার ৬০০টি আসন। সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার এই বিপুল আসনের বিপরীতে এবারের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক বছরে উচ্চশিক্ষায় আসন ও প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। বিশেষ করে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও ভালো ফল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থী পাওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যেগুলো শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল। সেই সময়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীর চাহিদা ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনা না করেই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী সংকট কেবল একটি বছরের ভর্তি কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে ভালো মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের বাইরে থাকা মধ্যম ও নিম্নসারির কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি শিক্ষার্থী সংকটে পড়বে। একইভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতেও শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিতে পারে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত