তিন মাসে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য

আগামী তিন মাসের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সরকারের। এর মধ্যে শুধু ঢাকা থেকেই উৎপাদন হবে ২৯৬ মেগাওয়াট।

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

ব্ল্যাক কার্বন ও অন্যান্য স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষণ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আগামী তিন মাসের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। এর মধ্যে ঢাকা শহর থেকেই ২৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রবিবার (১ নভেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বিজ্ঞান-নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। ‘ক্লিন এয়ার ফান্ড’-এর সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম।

উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদি আমিন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আউয়াল, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরজান গুস্তাফসন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১০ হাজার মেগাওয়াট। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।

তিনি জানান, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিপুল পরিমাণ দূষণকারী জ্বালানি অবকাঠামো পেয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন কয়লা পোড়ানো হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ ব্ল্যাক কার্বন নির্গত হচ্ছে।

ইটভাটার দূষণ নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বায়ুদূষণের প্রায় ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী ইটভাটা। এসব ভাটায় প্রায়ই উচ্চ সালফারযুক্ত কয়লা ব্যবহার করা হয়। দূষণ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে কাঠ পোড়ানো ২০০টি ইটভাটা বন্ধ করে সেগুলোর পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক তৈরির কারখানা স্থাপন করছে সরকার। এতে ধোঁয়া নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ হবে এবং শুধু সামান্য শব্দদূষণ অবশিষ্ট থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদি আমিন বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। অতীতের বিভিন্ন নীতির কারণে দেশের জ্বালানি খাত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌরশক্তির পাশাপাশি বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণে নতুন উদ্যোগগুলোতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মাহদি আমিন আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শুরু করা খাল খনন কর্মসূচি এবং বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে সিএনজিচালিত যানবাহন চালুর মতো উদ্যোগ পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকার অংশ। তার দাবি, বিএনপি সরকারের সময়ে প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পাটজাত ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করা হয়েছিল।

তিনি জানান, পূর্ববর্তী শাসনামলে বিএনপি সরকার সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং বৃক্ষ মেলার আয়োজন করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই উদ্যোগগুলো নতুন করে চালু ও আরও বিস্তৃত করতে চায় সরকার।

পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহদি আমিন বলেন, উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস না করে এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জীবন, প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে পারে, সে লক্ষ্যেই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজকে কেন্দ্র করে মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সম্ভব হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ব্ল্যাক কার্বন হলো বায়ুমণ্ডলে ভাসমান অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা। ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি কিংবা জৈববস্তুর অসম্পূর্ণ দহনের ফলে এটি তৈরি হয়। জ্বালানি পোড়ানোর সময় পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকলে ব্ল্যাক কার্বনের উৎপত্তি ঘটে। এই কণা সূর্যের বিকিরণ শোষণ করে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে তোলে।

তিনি জানান, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে নেওয়া একটি উদ্যোগের ফলে বায়ুমণ্ডলে ব্ল্যাক কার্বনের পরিমাণ কমেছিল। সে সময় এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৪০ মাইক্রোগ্রাম। বর্তমানে নিয়মিত পরিমাপে এই মাত্রা ৬ থেকে ১২ মাইক্রোগ্রামের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তবে উন্নত ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে মাত্র ১ থেকে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম। সে হিসাবে বাংলাদেশে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা এখনও ২৫ থেকে ৫০ গুণ বেশি। এ দূষণ আরও কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ব্ল্যাক কার্বন নির্গমনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি ও অন্যান্য উৎস উভয়ই দায়ী। ঢাকায় শুধু জীবাশ্ম জ্বালানি নয়, খড়, কাঠসহ বিভিন্ন ধরনের জৈব উপাদান পোড়ানোর কারণেও এই দূষণ ছড়ায়। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত দূষণও বাংলাদেশের বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ।

দূষণ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন, পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবস্থা এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি শিল্প ও নির্মাণ খাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন মানদণ্ড কার্যকর এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গণপরিবহনের প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেন। এ ছাড়া বায়ুমান ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেন তিনি।

বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সুইডেনের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন সহযোগিতা কৌশলে সবুজ রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং দুটি বিষয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, শক্তিশালী অংশীদারত্বের মাধ্যমে উন্নত ধারণা ও কার্যকর ফলাফল পাওয়া সম্ভব। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও সুইডেনের এই সহযোগিতা আরও গভীর হবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত