ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকরা। গত দুই দিন তা সহিংস রূপ ধারণ করে। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক হলেও সেজন্য সহিংস অবরোধ-ধর্মঘট করে উৎপাদন ব্যাহত করাকে সঠিক মনে করছেন না খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী সংকটে ধুঁকছে ঠিক তখনই বিদ্যমান বেতন কাঠামোর দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির দাবি সময়োপযোগী নয় বলেও উল্লেখ করেছেন তারা। কারণ হিসেবে তারা বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পোশাক খাত ঝুঁকির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অপরদিকে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় পশ্চিমা দেশগুলোতে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে। অথচ বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রধান বাজারই হলো ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অবশ্যই চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই দুঃসময়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা মাসিক ন্যূনতম মজুরিতে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। তাদের বেতন অবশ্যই বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে গত শনিবার আশ্বাস দেওয়ার পর গতকাল রবিবারই ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে। মজুরি বোর্ডকে ছয় মাসের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টিও একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশমালা অনুমোদন পেয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অনুমোদিত সময়সীমা মানতে হবে।
নবগঠিত মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মজুরি বোর্ডের টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) অনুযায়ী শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি মানে কেবল তাদের বর্ধিত আর্থিক সুবিধা দেওয়া নয়। ১১টিওআর-এ শিল্পমালিকের সক্ষমতা ও বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা আমলে নেওয়ার বিষয়ও উল্লেখ আছে। পৃথিবীর সব দেশেই তাই হয়ে থাকে। আমাকে টিওআর ফলো করতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থনীতির চলমান সংকটাপন্ন পরিস্থিতি ও পোশাকশিল্প শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে সৃষ্ট সহিংস অবস্থা দুটোই সংকটকে কঠিনতর করে তুলেছে। সাড়ে ১২ হাজার টাকায় শ্রমিকদের জীবন চলে না। তাদের দাবি যৌক্তিক। বেতন বাড়ানো দরকার। কিন্তু এটা সঠিক সময় নয়, বিশেষ করে যখন গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। তাও আবার বেতন বৃদ্ধির দাবিটা দ্বিগুণেরও বেশি।
পোশাক খাতে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা যে চাপের মধ্যে আছেন, তা আমরাও উপলব্ধি করি। আবার একই সঙ্গে বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, প্রতিনিয়ত উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং কারখানার রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জগুলোও বাস্তব। তাই শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা আর কারখানা সচল রাখা, দুটিই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলে একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানে পৌঁছাবার চেষ্টা করতে হবে। শ্রমিক বাঁচলেই শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলেই শ্রমিক বাঁচবে।
২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর সর্বশেষ পোশাকশিল্প শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতনসহ সব ধাপে বেতন বাড়ানো হয়েছিল। তখন ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়, যা এর আগে ছিল ৮ হাজার টাকা। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্পের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের একটি বড় অংশের মাসিক ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা। তিন বছর আগে নির্ধারিত এই মজুরিতে বর্তমান বাজারে একজন শ্রমিকের নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন সামনে রেখেই নতুন করে উত্তাল হয়ে উঠেছে পোশাকশিল্প এলাকা বলে পরিচিত গাজীপুর, আশুলিয়া-সাভার ও রাজধানীর মিরপুর।
এই অস্থিরতার মধ্যেই মজুরি বৃদ্ধির সুপারিশ করতে গতকাল রবিবার ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই বোর্ডের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি কতটা যৌক্তিক! শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা কতটা, আর আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও রপ্তানি বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে বাংলাদেশের মজুরি কাঠামোর সামঞ্জস্য নিয়ে। শুধু শ্রমিকের বেতন বাড়ানো নয়; এটি শ্রমিকের জীবনমান, শিল্পের উৎপাদনশীলতা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও এ প্রশ্ন জড়িত।
এদিকে, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সরকারি কর্মচারীদের সম্প্রতি বর্ধিত জাতীয় বেতন কাঠামো। গত ৩১ আগস্ট সরকার নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করে। এতে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকরাও বেতন বৃদ্ধির দাবি করছে বলে মনে করেন শ্রমিক নেতারা।
মজুরির বৃদ্ধির দাবি ও আন্দোলন পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকদের দাবি যৌক্তিক। তবে জনভোগান্তি আমরা কামনা করি না। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সময়োপযোগী বেতন কাঠামো যাতে গঠন হয়, যা শ্রমিকদের স্বস্তি দেবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, যাতে তারা কোনো চক্রের ষড়যন্ত্রে যুক্ত না হয়। যৌক্তিক দাবিকে একটি পক্ষ রক্তাক্ত আন্দোলনে রূপ দিতে কাজ করছে, যা দেশ ও অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি কারখানা মালিক ও শ্রমিক নেতাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির আন্দোলন যাতে কোনো মহল অন্য খাতে প্রভাবিত করতে না পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ খাদ্যের পাশাপাশি বাসস্থান, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও শ্রমিক পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০২৬ সালের সংশোধনীতে নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। সংশোধিত আইনের ১৩৯(৬) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত নিম্নতম মজুরি সরকারের নির্দেশক্রমে প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
মজুরি বোর্ড চেয়ারম্যান শেখ আশফাকুর রহমান বলেন, মজুরি বোর্ডের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। এখানে সরকার, শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধি রয়েছেন। এ ছাড়া একজন স্বাধীন প্রতিনিধি থাকবেন। আশা করছি, আগামীকাল (আজ সোমবার) গেজেট প্রকাশ হবে। এরপরই আমরা বোর্ডের পক্ষ থেকে সভা আহ্বান করব। আশা করছি, শ্রমিকদের দাবি ও মালিকপক্ষের সম্মতির যৌক্তিকতার ভিত্তিতে চলতি মাসের মধ্যে একটি সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। এর জন্য আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে, সব পক্ষের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব বৈঠক করা এবং প্রস্তাব আহ্বানের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সুপারিশমালা তুলে ধরা।