ঘূর্ণিঝড় অর্নবের প্রভাবে দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে বেশ কিছু জমির ধান হেলে পড়েছে। অনেক জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ায় ও পোকার আক্রমণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। ধান কাটার আগমুহূর্তে এমন দুর্যোগের ফলে ধানের উৎপাদন কমার পাশাপাশি খরচ না ওঠার আশঙ্কা তাঁদের। আবহাওয়া ভালো হওয়ায় তেমন সমস্যা হবে না জানিয়ে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের।
শস্যভান্ডারখ্যাত দেশের সবচেয়ে উত্তরের জেলা দিনাজপুর। জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হিলির বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শোভা পাচ্ছে আমন ধান। ইতোমধ্যে অধিকাংশ জমির ধানের শিষ বের হয়েছে। কিছু ধানে পাক ধরেছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় অর্নবের প্রভাবে হঠাৎ বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে বেশ কিছু জমির ধান হেলে পড়েছে। অনেক ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। আবার হেলে পড়া ধানে ধরেছে পোকার আক্রমণ। কেউ কেউ জমির পানি বের করে দিয়ে, আবার কেউ কেউ হেলে পড়া ধান বেঁধে রক্ষার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ পোকা থেকে বাঁচাতে কীটনাশক স্প্রে করছেন।
এবার সারের দাম বেশি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থাকায় খরচ বেশি হয়েছে। সেই সঙ্গে আকাশ থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ দিয়ে ধান আবাদ করতে হয়েছে। এর ওপর এমন দুর্যোগে ধানের উৎপাদন কমার পাশাপাশি খরচ না ওঠার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
হিলির বড়ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক ছানোয়ার হোসেন বলেন, হঠাৎ করে বাতাস আর পানিতে আমাদের কৃষকদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। পানি তেমন একটা ছিল না, কিন্তু বাতাসের কারণে ধান সব পড়ে গেছে। অনেক ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধানগুলো এখন তুলে কয়েকটি একসঙ্গে করে বেঁধে দিচ্ছি। এগুলো আর আগের মতো হবে না। তারপরও বেঁধে দিচ্ছি, এখন যা হয় মনকে সান্ত্বনা দেওয়া আরকি। এতে ফলন বিপর্যয় ঘটবে। ধানের ফলন অর্ধেকে নেমে আসবে। এখন ধান আবাদে প্রচুর খরচ হয়। সারের দাম বেশি, কীটনাশকের দাম বেশি। এর ওপর আগে যেখানে একবার-দুবার দিলেই হতো, এখন কয়েকবার দিতে হয়। ফলে খরচ বেড়ে গেছে। তার ওপর ঝড়-বৃষ্টিতে ধান হেলে পড়ায় উৎপাদন খরচ উঠবে না আমাদের।
হিলির ইসমাইলপুর গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় ধানের শিষ ঠিকমতো বাড়ছিল না। বাধ্য হয়ে ডিপ থেকে পানি কিনে ধানের জমিতে পানি দিয়েছি কয়েক দিন আগে। জমির প্রায় সব ধানের শিষ বের হয়ে গেছে। এ সময় হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টির ফলে আমার জমির ধান সব হেলে পড়েছে। এখন এগুলো তুলে বেঁধে দিচ্ছি, যদি কিছুটা রক্ষা হয়। তাহলে আমরা কৃষকেরা হয়তো কিছু পেতে পারি। কিছু ধান রক্ষা হবে, কিছু ধান পাওয়া যাবে—এই আশা করে সবাই ধান বেঁধে দিচ্ছে।
একই গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, হঠাৎ করে ঝড়-তুফানে জমির ধান হেলে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে। ফলে আমাদের কৃষকদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে আমরা ধানটা ষোলো আনায় পেতাম। কিন্তু এই ঝড়-বৃষ্টির কারণে ধান হেলে পড়ায় ও পানিতে ডুবে যাওয়ায় আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে পড়ে গেলাম।
হিলির বৈগ্রাম গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার রোপা আমন ধান আবাদ করে শুরু থেকেই আমাদের সমস্যা হচ্ছে। আমরা যেদিন থেকে ধান রোপণ করছি, সেদিন থেকেই আকাশে বৃষ্টি নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই খরাভাব চলছে। একটু হালকা বৃষ্টি হয়, আবার অনেক দিন বৃষ্টি থাকে না। এর মধ্যেই সব জমির ধানের শিষ বের হয়ে গেছে। এ সময় পানি না হলে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ডিপ চালু করে পানি দেওয়ার পর ধানের গাছ কিছুটা সবল হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি আসায় আমাদের ধানগুলোর অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন আমরা হেলে পড়া ধানগাছগুলো বেঁধে দিচ্ছি। কিছু ধান হয়তো পাওয়া যাবে। ফলে যে পরিমাণ লাভবান হওয়ার কথা ছিল, তা আর হতে পারব না।
ছাতনি গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, জমির প্রায় সব ধানের শিষ বের হয়ে গিয়েছিল। কলা পাকার মতো ধান পাকতেও শুরু করেছে। আর কিছুদিন পরেই ধান কাটতে পারতাম, ঘরে তুলতে পারতাম। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির ফলে ধানের গাছগুলো পড়ে গেছে। এতে কিছু ধান দানা পাবে, কিছু ধান চিটা হয়ে যাবে। এখন এই ধানগুলো তুলে বেঁধে দিচ্ছি, যাতে কিছুটা ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে, হেলে পড়া ধানে কারেন্ট পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। বাধ্য হয়ে জমিতে কারেন্ট পোকার ওষুধ ছিটাচ্ছি। ফলে ধানের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে গেছে।
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, এবার উপজেলায় ৮ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের চাষ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় অর্নবের প্রভাবে কিছু জমির ধান হেলে পড়েছে। আসলে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে ইউরিয়া সার ব্যবহার করেন। ফলে বিশেষ করে রাস্তার পাশের জমিগুলোর ধানের গাছ দুর্বল প্রকৃতির হয়। এসব জায়গার ধানের গাছগুলো হেলে পড়েছে। তবে যেহেতু অধিকাংশ ধান পরিপক্ব হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে, সেহেতু কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, হেলে পড়া ধানগুলো চার-পাঁচটি গুচ্ছ একসঙ্গে করে বেঁধে দিতে। সেই সঙ্গে জমিতে আটকে থাকা পানি বের করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া যেহেতু ভালো হয়ে গেছে, সেহেতু কৃষকেরা যেন নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করেন। অধিকাংশ জমির ধান পরিপক্বতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে ধানের ফলনে কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করছি।