সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্টকারী অপরাধগুলোর মধ্যে চাঁদাবাজি অন্যতম। কোনো শ্রম, মেধা কিংবা বৈধ অধিকার ছাড়াই অন্যের থেকে জোরপূর্বক অর্থ-সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার এই প্রবণতা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও ধ্বংসাত্মক কাজ। ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ শক্তির জোরে সাধারণ ব্যবসায়ী, পথচারী ও উদ্যোক্তাদের জিম্মি করে অবৈধ উপায়ে অর্থ আদায়ের যে মহোৎসব চলছে, তা মূলত আল্লাহর বিধানের প্রতি চরম অবাধ্যতা এবং নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মানুষের সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা ২৯)
এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বলপ্রয়োগ করে বা ভীতি প্রদর্শন করে কারও কাছ থেকে এক তিল পরিমাণ সম্পদও হাতিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষের জীবন, রক্ত ও সম্পদকে একে অপরের জন্য হারাম ঘোষণা করেছেন।
সুতরাং যারা চাঁদাবাজির মাধ্যমে অন্যের কষ্টার্জিত অর্থে ভাগ বসায়, তারা মূলত আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে এবং পরকালের চিরস্থায়ী শাস্তিকে নিজেদের জন্য অবধারিত করে।
হাদিসের বাণীতেও জোরপূর্বক মানুষের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া বা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে এবং একে কুফরি আচরণের সমতুল্য বলা হয়েছে। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথের মাধ্যমে বা জোরপূর্বক কোনো মুসলিমের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত করেন এবং জান্নাত হারাম করে দেন। (সুনানে নাসায়ি)
ইসলাম মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারও সম্পদ আত্মসাৎ, জবরদখল কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করা গুরুতর অপরাধ। এসব অন্যায় মানুষের অধিকার ক্ষুণœ করার পাশাপাশি সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে।
একদল লোক যখন অন্যের হক নষ্ট করাকে নিজের পেশা বা অধিকার বানিয়ে নেয়, তখন সমাজ থেকে বরকত উঠে যায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়। চাঁদাবাজির এই নির্মম থাবায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় শিল্পপতিরা পর্যন্ত কোণঠাসা হয়ে যান, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি পারস্পরিক আস্থার সেতুবন্ধনকে গুঁড়িয়ে দেয়।
ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের পরিভাষায় চাঁদাবাজি সরাসরি ‘গসব’ বা বলপূর্বক দখল এবং হারাম অর্জনের অন্তর্ভুক্ত, যা সমাজকে ভেতর থেকে ফাঁকা করে দেয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো মুমিনের সম্পদ তার সম্মতি ছাড়া হালাল হয় না, অর্থাৎ সম্মতি ব্যতিরেকে অর্থ নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ।
চাঁদাবাজরা সাময়িকভাবে অবৈধ অর্থ উপার্জন করে নিজেদের সফল মনে করলেও এই অভিশপ্ত সম্পদ তাদের ইহকালের শান্তি কেড়ে নেয়। আর পরকালে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে চরম লাঞ্ছনা। একটি ইনসাফপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের পথে এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বড় অন্তরায়, যা দূর করা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ ও বিবেকবান নাগরিকের ইমানি দায়িত্ব।
চাঁদাবাজির কালো থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে আমাদের কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না, বরং কোরআন-হাদিসের আলোকে নৈতিক পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করতে হবে যে, অন্যের হক নষ্ট করার পরিণতি ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেই ধ্বংসাত্মক।
আসুন, আমরা সবাই মিলে সব ধরনের চাঁদাবাজি ও অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি এবং একটি ইনসাফভিত্তিক ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায় যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসি।
লেখক : শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা