বর্তমান সময়ে তরুণদের জীবনে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব অনেক বেশি। অনলাইনে প্রতিনিয়ত তারা নানা ধরনের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও প্রবণতার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। পোশাক, ভাষা, আচার-আচরণ ও জীবনযাপনে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবও বাড়ছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশ্বসংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং সেখান থেকে ভালো কিছু শেখা দোষের নয়। বরং সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে অন্যের জীবনধারা অনুসরণ করতে গিয়ে নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তাই আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি মুসলিম তরুণরা কীভাবে নিজেদের ইসলামি পরিচয়, বিশ্বাস ও শালীনতা বজায় রাখতে পারে, তা নিয়ে ভাবা জরুরি।
কৈশোর ও তারুণ্য নিজের পরিচয় নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে বন্ধুমহলের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাক্সক্ষা অনেকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, কোনো তরুণ বন্ধুমহলে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিজের পোশাক, কথাবার্তা কিংবা আচরণ বদলে ফেলছে। কেউ আবার ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলাকে পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ মনে করে তা আড়াল করছে। সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের জীবনযাপন দেখে অনেকে নিজের বাস্তবতা নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। লাইক, মন্তব্য ও অনুসারীর সংখ্যা যেন আত্মমূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে ওঠে।
এখানে সমস্যা আধুনিক পোশাক কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারে নয়। সমস্যা হলো বিবেচনাহীন অনুকরণে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’ (সুরা হুজুরাত ১৩) অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা বাহ্যিক চাকচিক্য, সামাজিক পরিচিতি কিংবা জনপ্রিয়তায় নয়, বরং তার নৈতিকতা, আল্লাহভীতি ও সৎকর্মে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনান আবু দাউদ ৪০৩১)
হাদিসটির আলোচ্য বিষয় বুঝতে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা জরুরি। একে ব্যবহার করে অন্য সংস্কৃতির প্রতিটি বিষয়কে অন্ধভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ঠিক নয়। বরং মুসলিমের বিশ্বাস, স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনুকরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
ইসলামে শালীনতা ব্যক্তির সামগ্রিক আচরণ ও চরিত্রের অংশ। পোশাকের পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গি, কথাবার্তা, অনলাইন আচরণ এবং অন্যের প্রতি সম্মানও এর অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে প্রথমে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে ও পবিত্রতা রক্ষা করতে বলা হয়েছে। এরপর মুমিন নারীদেরও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা নুর ৩০-৩১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জা ইমানের অঙ্গ।’ (সহিহ মুসলিম) লজ্জা মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে, নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে শেখায় এবং আচরণে সংযমী করে। তাই অনলাইনে অশালীন মন্তব্য, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের দায়িত্বহীন প্রকাশ কিংবা অন্যকে অপমান করে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টাকেও নৈতিকতার আলোকে বিবেচনা করা জরুরি।
আত্মপরিচয়ের সংকটের আরেকটি দিক হলো ধর্মীয় জ্ঞানের ঘাটতি। সামাজিক মাধ্যমে কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও নানা ফতোয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। কখনো আয়াতের প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া হয়, কখনো দুর্বল বা জাল হাদিসকে সহিহ বলে প্রচার করা হয়, আবার কখনো ব্যক্তিগত মতামতকে ইসলামের চূড়ান্ত বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে যাচাই না করে এসব বিশ্বাস করলে তরুণদের মধ্যে বিভ্রান্তি, অযথা কঠোরতা কিংবা ধর্ম সম্পর্কে অনীহা তৈরি হতে পারে।
পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো সংবাদ পেলে তা যাচাই করতে, যাতে অজ্ঞতাবশত কারও ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হতে না হয়। (সুরা হুজুরাত ৬)
আয়াতটি সংবাদ যাচাইয়ের বিষয়ে হলেও এর শিক্ষা ডিজিটাল যুগেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় কোনো বক্তব্য গ্রহণ বা প্রচারের আগে নির্ভরযোগ্য তাফসির, স্বীকৃত হাদিসগ্রন্থ এবং যোগ্য আলেমের ব্যাখ্যা দেখা উচিত। শুধু আবেগপূর্ণ বক্তব্য কিংবা ভাইরাল ভিডিওকে জ্ঞানের বিকল্প ভাবা যায় না।
উত্তরণের উপায় হিসেবে প্রথমত, তরুণদের ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলি অর্থসহ জানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শুধু তালিকা মুখস্থ নয়, বরং প্রতিটি নির্দেশের উদ্দেশ্য ও নৈতিক তাৎপর্য বোঝা জরুরি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা জুমার ৯) জ্ঞান অর্জনের এই গুরুত্ব তরুণদের ধর্মীয় বিষয়ে সচেতন হতে এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ইসলাম জানার অনুপ্রেরণা দেয়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া ধর্মীয় বক্তব্য যাচাই না করে বিশ্বাস বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’ (সুরা ইসরা ৩৬)
তাই কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা, ধর্মীয় বিধান কিংবা কোনো ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণের আগে নির্ভরযোগ্য তাফসির, স্বীকৃত হাদিসগ্রন্থ ও যোগ্য আলেমের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তরুণরা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের প্রশ্ন ও সংশয় নিয়ে কথা বলতে পারে। বন্ধুমহলের চাপের মুখেও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (সুনানে আবু দাউদ ৪৮৩৩)
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়