বাকৃবির উদ্ভাবন

অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প ‘বাউ সেফ ভেট’

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫৩ এএম

দেশে প্রাণিজ আমিষের চাহিদার বড় একটি অংশ ব্রয়লার মুরগির মাংসের মাধ্যমে পূরণ হয়। তবে ব্রয়লার মুরগি পালনে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এর ফলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (এএমআর) ঝুঁকি বাড়ছে, যা মানুষ ও প্রাণী উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক নিমপাতার নির্যাস থেকে অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত একটি সল্যুশন তৈরি করেছেন। যার নাম ‘বাউ সেফ ভেট’। আট বছর ধরে চলা এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম। গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম।

গবেষকদের দাবি, নিমপাতার নির্যাস থেকে তৈরি এই সল্যুশনে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, গ্রোথ প্রোমোটিং ও ইমিউনোস্টিমুল্যান্টসহ পাঁচ ধরনের কার্যকরী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি মুরগির রোগ নিয়ন্ত্রণ, ওজন বৃদ্ধি এবং মাংসের গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক। এ ছাড়া এই সল্যুশনটি ব্যবহারে অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক, ভিটামিন ও মিনারেলের প্রয়োজন কমে আসায় মুরগি পালনের ব্যয় কমানো এবং খামারিদের লাভ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাকৃবির ফার্মাকোলজি বিভাগ থেকে নামমাত্র মূল্যে প্রতি লিটার সল্যুশনটি বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি সল্যুশনটির পেটেন্ট-সংক্রান্ত সুবিধাও পেয়েছেন গবেষকরা।

কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা সংকটে

ব্রয়লার মুরগি পালনে অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনাময় এই সল্যুশন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিক্রি করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে আর্থিক সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে এর উৎপাদন এখনো সীমিত। গবেষকদের মতে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও উৎপাদনসক্ষমতা বাড়ানো গেলে সল্যুশনটি বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের পোলট্রি খাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষক অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, মানুষের জন্য নিরাপদ মাংস সরবরাহের উদ্দেশ্যে এই ফাইটোবায়োটিক সল্যুশন তৈরি করা হয়েছে। এতে মানবস্বাস্থ্য ও মুরগির দেহের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান নেই বলে আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে।

তিনি আরও বলেন, এই সল্যুশন ব্যবহারে মুরগির মৃত্যুহার প্রায় এক শতাংশে নেমে আসে। এ ছাড়া ফিড কনভার্সন রেশিও (এফসিআর) ১ দশমিক ২ পাওয়া গেছে। সল্যুশনটি ব্যবহারে অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক, ভিটামিন ও মিনারেলের প্রয়োজন কমে আসে। ফলে মুরগি পালনের ব্যয় কমে এবং খামারিদের লাভ বাড়ে। তবে খামারিদের মধ্যে সল্যুশনটির চাহিদা থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে ব্যাপক হারে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

বাউ সেফ ভেট ব্যবহার করে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগির মাংস খেয়ে বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম আনিসুর রহমান বলেন, এই মুরগির মাংসের স্বাদ অনেকটা দেশি মুরগির মতো। সাধারণ ব্রয়লার মুরগির মাংসে অনেক সময় যে অস্বাভাবিক গন্ধ পাওয়া যায়, এই মাংসে তা নেই। নিরাপদ মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুনুর রশিদ ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসুম আহমাদ বলেন, বাউ সেফ ভেট ব্যবহার করা ব্রয়লার মুরগির মাংসের রঙ আকর্ষণীয়। মাংসও কিছুটা শক্ত, অনেকটা দেশি মুরগির মতো। নিরাপদ মাংস উৎপাদনের জন্য এই সল্যুশন ব্যবহার করা যেতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত