সেরা শিক্ষার্থীদের নিয়েও হোঁচট নামিদামি কলেজের 

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১৩ এএম

রাজধানীর নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের অনেকেরই স্বপ্ন থাকে এই কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির। তবে শুধু স্বপ্ন বা ইচ্ছা থাকলেই এখানে ভর্তির সুযোগ মেলে না; প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট জিপিএ। সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ২০২৪ সালে কলেজটিতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। ওই বছরের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল জিপিএ-৫।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজটির এক শিক্ষক জানান, ২০২৪ সালে একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বশেষ ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর ছিল ১ হাজার ২১৭। ওই শিক্ষার্থী ১ হাজার ৩০০ নম্বরের মধ্যে গড়ে ৯৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ পেলেও ভর্তির নিশ্চয়তা ছিল না।

আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে এমন উচ্চ ফল নিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের এইচএসসির ফলে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এবার এই কলেজ থেকে এইচএসসিতে ২ হাজার ৩৭৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২ হাজার ৩১৯ জন। পাসের হার ৯৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৬৩ শিক্ষার্থী। আর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেছেন ১ হাজার ৮৮৬ জন, অকৃতকার্য হয়েছেন ৪৭ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৭৩১ জন। অর্থাৎ বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসিতে জিপিএ-৫ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৭৩১ জন। বাকি ১ হাজার ১৫৫ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ জিপিএ ধরে রাখতে পারেননি। আরও উদ্বেগের বিষয়, এসএসসিতে ১ হাজার ৩০০ নম্বরের মধ্যে গড়ে ৯৩ শতাংশ নম্বর পেয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৭ জন এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন। ফলে ভালো ফল নিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ফল ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি সামনে এসেছে।

আদমজীতে মানবিক ও ব্যবসায় ভর্তির সর্বনিম্ন যোগ্যতা ছিল ৩.২৫। যদিও এ দুই বিভাগে ভর্তি হওয়া সিংহভাগ শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু এইচএসসির ফলে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৩৪০ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ বিভাগে ফেল করেছেন চারজন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১১১ জন। অন্যদিকে মানবিক থেকে ৯৩ জন পাস করেছেন। এ বিভাগে অকৃতকার্য হয়েছেন আটজন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২১ জন।

তবে কেবল আদমজীই নয়; একই চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজধানীর আরও কয়েকটি নামকরা কলেজেও। এর মধ্যে অন্যতম ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এ কলেজেও বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা এসএসসিতে জিপিএ-৫। তবে তাদের অভ্যন্তরীণ শিক্ষার্থীদের জন্য শর্ত শিথিলযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটিতে এবার বিজ্ঞান বিভাগে ১ হাজার ৭০২ শিক্ষার্থী পাস করেছেন, ফেল করেছেন ১২৯ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৩৩ জন। অর্থাৎ ভিকারুননিসায় জিপিএ-৫ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১২৯ শিক্ষার্থী মাত্র ২ বছরের মাথায় এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। আর জিপিএ-৫ ধরে রাখতে পারেননি ১ হাজার ৩৬৯ শিক্ষার্থী।

ঘোষিত ফল থেকে জানা গেছে, এবার ভিকারুননিসার ২ হাজার ৩৭৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ২ হাজার ২৩৮ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ১৩৯ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪১৬ শিক্ষার্থী। মানবিক বিভাগে পাস করেছেন ২৭৪ জন, অকৃতকার্য হয়েছেন ১৭ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৮ জন। আর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাস করেছেন ২৬২ জন, ফেল করেছেন ১২ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৫৫ জন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সীমাবদ্ধতাকে ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, করোনার পর শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাদের ফলে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের সরাসরি পাঠদান, পারস্পরিক আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের যে গুরুত্ব রয়েছে, বাসায় বসে পড়াশোনার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজেদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

রাজধানীর আরেক অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটর ডেম কলেজ। ফলের এই বিপর্যয় থেকে বাদ যায়নি নটর ডেমও।

এ কলেজের ৩ হাজার ২৭২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ হাজার ২১৮ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫৪ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ২২৯ শিক্ষার্থী। কলেজটির বিজ্ঞান বিভাগে একাদশে ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা জিপিএ-৫। এ বিভাগে ২ হাজার ১২২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ২ হাজার ৯৭ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ৮০৭ জন এবং ফেল করেছেন ২৫ জন। এই বিভাগে ২০২৪ সালে একাদশে যারা ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের এসএসসিতে গড় নম্বর ছিল ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি। অথচ বিজ্ঞান বিভাগ থেকেই ফেল করেছেন ২৫ জন এবং জিপিএ-৫ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন ২৯৫ জন।

নটর ডেমে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৭৪১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৭৩৪ জন, অকৃতকার্য হয়েছেন ৭ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৩৩ জন। অন্যদিকে মানবিকের ৪০২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৩৮০ জন, ফেল করেছেন ২২ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৯ শিক্ষার্থী।

এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকা কলেজের ১ হাজার ১৩৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১ হাজার ১২৯ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৮৮ জন। ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ৮৬১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৮৫৪ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৪১ জন। মানবিক থেকে ১৪৮ জন অংশ নিয়ে ১৪৬ জন পাস করেছেন, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১২ পরীক্ষার্থী। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ১৩৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১২৯ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ জন।

এসএসসিতে ভালো ফল করে নামকরা কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কেন এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারছে না এ নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে যেসব শিক্ষার্থীকে পাই, তাদের বড় অংশ এসএসসি ও এইচএসসি উভয়টাতেই জিপিএ-৫ প্রাপ্ত। কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের ভিত্তি খুবই দুর্বল। তারা ইংরেজিতে বাক্য লিখতে পারে না। বাংলায় একটা দরখাস্তও লিখতে পারে না। তিনি বলেন, এখন ছেলেমেয়েরা সামাজিক মাধ্যমে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কোভিডের সময় তারা প্রায় দুই বছর পড়তেই বসেনি। ফলে একটা শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে এই ফলে। তা ছাড়া তাদের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, এ জন্য তারা ততটা সিরিয়াস ছিল না। এবার যেহেতু প্রশ্ন কঠিন হয়েছে, মূল্যায়ন ও কড়াকড়ি ছিল, তাই ফল খারাপ হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম প্রাতিষ্ঠানিক দায়কেও কাঠ গড়ায় দার করান। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চমানের একাডেমিক যোগ্যতা প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু ভর্তি-পরবর্তী সময়ে তাদের অগ্রগতি কতটা হচ্ছে, সে বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি কতটা রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কলেজগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার আগে ভালো ফল করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়, কিন্তু সারা বছর ধরে শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা থাকে না। নিয়মিত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাসাপাশি শিক্ষকদের পর্যাপ্ততা ও পাঠদানের মানও গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত