আজ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম ইলেকশন)। চার বছর মেয়াদি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বকালের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না; বরং কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সিনেটের সদস্য নির্বাচন করা হয়। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটি এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু এবারের নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের আসন দখলের লড়াই নয়, এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসন, নীতি ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর মার্কিন জনগণের প্রথম বড় জাতীয় মূল্যায়ন। নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে—সেদিকেই এখন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও শাসনকার্যের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। ইতিহাস বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারায়। কারণ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, দুই বছর পর তার বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, ভোটাররা তখন তার হিসাব নেন। এবারের নির্বাচনেও সেই বাস্তবতা সামনে এসেছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসননীতি, শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব ভোটারদের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সংকীর্ণ—২১৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের আসন ২১৪টি; দুটি আসন শূন্য এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। অন্যদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাট ও তাঁদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যদের আসন ৪৭টি। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১-এ পৌঁছাতে হবে। জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও সিনেটের লড়াই এখনো বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে ডেমোক্র্যাটরা জাতীয়ভাবে আট শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে। তবে জরিপের ফলাফল আর ভোটের ফলাফল এক নয়। শেষ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর ফলই নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ।
এই নির্বাচনের গুরুত্ব বোঝার জন্য ট্রাম্পের বর্তমান শাসনপদ্ধতির দিকে তাকানো প্রয়োজন। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি নির্বাহী আদেশ, শুল্ক আরোপ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করছেন। কংগ্রেসে নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এত দিন তাঁর নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে সেই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ, শুনানি আয়োজন, নথিপত্র তলব এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্তের ক্ষমতা পাবে। অভিবাসন অভিযান, প্রশাসনিক অনিয়ম, ইরান যুদ্ধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তদন্তের পথ খুলে যেতে পারে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতা সিনেটের হাতে। ফলে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দিতে বা বিলম্বিত করতে পারবে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক হিসাব বদলে যাবে। অর্থাৎ কংগ্রেসের একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্টের নীতি বাস্তবায়নের পথ অনেক কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ডেমোক্র্যাটরা এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না। তাঁর হাতে থাকবে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা এবং পররাষ্ট্রনীতি, অভিবাসন ও শুল্কনীতির মতো বিষয়ে বিস্তৃত নির্বাহী কর্তৃত্ব। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হবে না। কোনো বিল আইনে পরিণত করতে প্রেসিডেন্টের সম্মতি প্রয়োজন; ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন লাগে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে আইন প্রণয়ন, বাজেট ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সংঘাত বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে সরকারি ব্যয়, ঋণসীমা বৃদ্ধি এবং বাজেট অনুমোদন নিয়েও অচলাবস্থার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জটিল করেছে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক। ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পরও তিনি ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে তাঁর সমর্থকদের হামলা মার্কিন গণতন্ত্রের ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এবারও নির্বাচন নিয়ে তাঁর বক্তব্য এবং প্রশাসনের কিছু পদক্ষেপ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনের আগের দিন, ২ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ক্যালিফোর্নিয়ার ২০ হাজারের বেশি ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনা বন্ধ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন ঘিরে আইনি লড়াই ও ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নির্বাচন, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার সীমা নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আন্তর্জাতিক প্রভাব। ট্রাম্পের শুল্কনীতি বিশ্ববাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজার ও পণ্যমূল্যের ওপর চাপ বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও তাঁর সিদ্ধান্ত বিশ্বরাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে এসব নীতির ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক ব্যয় এবং বৈদেশিক সহায়তার প্রশ্নে প্রশাসনকে কংগ্রেসের কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। তবে নির্বাচনের ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে রাতারাতি মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পার্থক্য রয়েছে। তবু একটি মৌলিক শিক্ষা স্পষ্ট—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন নয়। আইনসভা, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ শুধু সরকার গঠন করে না, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যেও রাখে।
আমাদের দেশে গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই নির্বাচনকেই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় করা হয়। কিন্তু অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পাশাপাশি সংসদের কার্যকর ভূমিকা, বিরোধী দলের অধিকার, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া মানেই সব সিদ্ধান্তের ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অধিকার নয়। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে।
আজকের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল জয়ী হলে তিনি তাঁর নীতির পক্ষে নতুন রাজনৈতিক শক্তি পাবেন। আর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তাঁর বাকি দুই বছরের শাসন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তবে ফল যা-ই হোক, এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনবে—ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রভাব বড়, নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের শক্তি?
আমার বিবেচনায়, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। এটি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা যেমন, তেমনি মার্কিন গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষারও পরীক্ষা। গণতন্ত্রে কোনো শাসকই জনগণের ঊর্ধ্বে নন। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সেই কথাটিই আবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
___________
লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও তিস্তা আন্দোলনের সংগঠক
nazrul. [email protected]