লবণাক্ততা সহ্য করে দেবে বেশি ফলন

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৪ এএম

লবণাক্ততাপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে ধান উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত নতুন জাত ব্রি ধান ১১৯। রোপা আমন মৌসুমে চাষের জন্য সম্প্রতি জাতটি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় বীজ বোর্ড।

গবেষকদের দাবি, লবণাক্ততা সহ্য করার পাশাপাশি প্রচলিত কয়েকটি জাতের তুলনায় বেশি ফলন দিতে সক্ষম ব্রি ধান ১১৯। উপযুক্ত পরিচর্যায় এ জাতের ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৭ টন।

গত ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৬তম সভায় ব্রি ধান ১১৯ রোপা আমন মৌসুমে চাষের চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে বলে গতকাল সোমবার বিকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ব্রি প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগের এডিটর মো. আল-আমিন।

জাতটির বিশেষত্ব হলো লবণাক্ত উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি দেশের অলবণাক্ত এলাকাতেও চাষ করা যাবে। এর জীবনকাল প্রায় ১১৫ দিন। ফলে আমন ধান কাটার পর একই জমিতে সূর্যমুখী ও সরিষার মতো রবি ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ব্রি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের একদল গবেষক উদ্ভাবন করেছেন ব্রি ধান ১১৯। গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান। দলের অন্য সদস্যরা হলেন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাসিনা খাতুন, সিনিয়র প্ল্যান্ট ব্রিডার নূসরাত জাহান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরমিন আক্তার সেতু ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিআরসিআইএল) রিবেত ফারজানা দিশা। স্থানভিত্তিক জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে পরিচালিত লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট (এলএসটিডি) প্রকল্পের অর্থায়নে এ গবেষণা হয়েছে।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ব্রি ধান ১১৯-এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৭ টন। পরিবেশ ও লবণাক্ততার মাত্রাভেদে ফলন ৪ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত হতে পারে। প্রচলিত ব্রি ধান ৭৩-এর তুলনায় নতুন জাতটির ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি।

জাতটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধানের গাছের বিভিন্ন বৃদ্ধিপর্যায়ে লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে। চারা অবস্থায় টানা তিন সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি মিটারে ১২ ডেসিসিমেন্স বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা (ফঝ/স) মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। অন্যদিকে অঙ্গজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায়ের বিভিন্ন সংবেদনশীল ধাপেও ৮ থেকে ১০ ডেসিসিমেন্স/মিটার মাত্রার লবণাক্ততায় ফলন দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। ধানগাছের গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার। কাণ্ড শক্ত হওয়ায় সহজে হেলে পড়ে না। প্রতি শীষে গড়ে ২১৫টি পুষ্ট ধান পাওয়া যায়, যা ব্রি ধান ৭৩-এর তুলনায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি। শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে পড়ে না। জাতটির চাল মাঝারি চিকন ও সাদা। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয়। অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

গবেষকরা বলছেন, স্বল্প জীবনকালের কারণে ব্রি ধান ১১৯ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রচলিত শস্যবিন্যাসে পরিবর্তন আনতে পারে। আমন ধান কাটার পর মধ্যম উঁচু থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবণসহিষ্ণু সরিষা চাষের সুযোগ থাকবে। এতে একই জমিতে বছরে অতিরিক্ত একটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া বোরো মৌসুমেও জাতটির উপযোগিতা যাচাই করা হয়েছে। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ২০টি স্থানে লবণাক্ত ও অলবণাক্ত পরিবেশে এর ফলন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বোরো মৌসুমে চাষের জন্য জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশ পাওয়া গেছে। জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন পেলে জাতটি আমন ও বোরো দুই মৌসুমেই চাষ করা যাবে।

ব্রি ধান ১১৯ চাষের জন্য রোপা আমন মৌসুমে ১ থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বীজ বপনের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী চারা প্রতি গোছায় দুই থেকে তিনটি করে রোপণ করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমি এ জাতের জন্য উপযোগী।

ব্রির মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্রি ধান ১১৯ উদ্ভাবন দেশের কৃষি গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। জাতটি লবণাক্ত উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের ধান উৎপাদনে সহায়তা করার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।

গবেষক দলের প্রধান মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান বলেন, দীর্ঘ গবেষণার প্রতিটি ধাপে তাদের দল নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছে। কৃষকের মাঠে এ জাতের সুফল দেখতে পাওয়াই তাদের বড় প্রাপ্তি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত