চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সংক্ষেপে সিভাসু) দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সিভাসুর বিশেষত্ব কোনো একটি সুবিধায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর মধ্যে এসব সুযোগকে একই শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিক অংশ হিসেবে একত্রিত করাই এর মূল শক্তি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
বিশেষায়িত ও পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা
এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ভেটেরিনারি মেডিসিন, ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ফিশারিজ এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো পারস্পরিকভাবে সংশ্লিষ্ট এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষার সুযোগ। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রাণিসম্পদ, মাৎস্যবিজ্ঞান, খাদ্যবিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রের সমন্বয় একটি বহুমাত্রিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছে।
প্রবলেম-বেইসড লার্নিং (পিবিএল) ভিত্তিক শিক্ষা
শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পিবিএল পদ্ধতির মাধ্যমে বাস্তব বা বাস্তবসম্মত সমস্যা শনাক্তকরণ, বিশ্লেষণ, প্রয়োজনীয় তথ্য ও জ্ঞান অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য সমাধান নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং, প্রবলেম সলভিং, টিমওয়ার্ক ও সেলফ-ডাইরেক্টেড লার্নিংয়ের দক্ষতা গড়ে ওঠে। অর্থাৎ, এখানে শুধু কী শেখানো হয় তা নয়, কীভাবে শেখানো হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন শিক্ষায় এক বছরের ইন্টার্নশিপ
বাংলাদেশের ভেটেরিনারি শিক্ষায় প্রথমবারের মতো মেডিকেল শিক্ষার আদলে এক বছরের ইন্টার্নশিপ প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয় সিভাসু। হাসপাতাল, খামার, হ্যাচারি, ফিড মিল, ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানকে পেশাগত দক্ষতায় রূপান্তরের সুযোগ পায়। পাশাপাশি অন্যান্য অনুষদের শিক্ষার্থীরাও তাদের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ইন্টার্নশিপ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিংয়ের সুযোগ পায়।
আন্তর্জাতিক ইন্টার্নশিপ ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা
সিভাসুর সব শিক্ষার্থীর জন্য দেশের বাইরে ইন্টার্নশিপ ও এক্সটার্নশিপের সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মপরিবেশ ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে সিভাসুর শিক্ষা কেবল জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।
হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের শিক্ষা
শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাগারভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি ভেটেরিনারি হাসপাতাল, রিসার্চ সেন্টার, খামার, মেরিন রিসার্চ সেন্টার এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সুবিধায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের প্রথম অ্যানাটমি মিউজিয়াম ও ফিশারিজ মিউজিয়াম
সিভাসুর বিশেষায়িত শিক্ষার অনন্য দিক হলো এর শিক্ষা-সহায়ক জাদুঘরগুলো। বাংলাদেশের প্রথম অ্যানাটমি মিউজিয়ামে বিভিন্ন প্রাণীর অস্থি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও শারীরস্থানিক নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের কম্পারেটিভ অ্যানাটমি ও ভেটেরিনারি অ্যানাটমি হাতে-কলমে শেখার সুযোগকে সমৃদ্ধ করে। একইভাবে ফিশারিজ মিউজিয়াম মাৎস্যবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য এবং মাৎস্যসম্পর্কিত বিভিন্ন নমুনা পর্যবেক্ষণ ও শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে এসব মিউজিয়াম কেবল প্রদর্শনীর স্থান নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার অংশ।
গবেষণা ও খামারভিত্তিক ক্যাম্পাস
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অবস্থিত রিসার্চ অ্যান্ড ফার্ম-বেইসড ক্যাম্পাসে ডেইরি, পোল্ট্রি, গোট, ফিশ কালচার, ফুড প্রসেসিং, ফুড সেফটি অ্যান্ড নিউট্রিশন এবং বায়োটেকনোলজিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব উৎপাদনব্যবস্থা ও গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।
বিশেষায়িত ও সমন্বিত গবেষণা অবকাঠামো
ঢাকার পূর্বাচলে অবস্থিত ভেটেরিনারি হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, উন্নত ল্যাবরেটরি, কক্সবাজারে অবস্থিত মেরিন অ্যান্ড কোস্টাল রিসার্চ ফ্যাসিলিটি এবং রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে ভ্রাম্যমাণ গবেষণা তরী (Research Vessel)-এর সমন্বয়ে সিভাসুতে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য একটি বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ফলে স্থলভিত্তিক প্রাণিসম্পদ থেকে শুরু করে সামুদ্রিক সম্পদ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এক স্বাস্থ্য বা ওয়ান হেলথের সমন্বিত প্রয়োগ
ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি বর্তমান বৈশ্বিক স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তবিষয়ক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
দেশব্যাপী মাঠকেন্দ্রিক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম
চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকা, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও অন্যান্য অঞ্চলে হাসপাতাল, গবেষণাকেন্দ্র এবং বিভিন্ন মাঠকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শুধু ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক ও বাস্তব পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন গবেষণা
প্রাণিসম্পদ, মাৎস্যবিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি, খাদ্য ও জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় প্রয়োজন ও বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মাৎস্যবিজ্ঞান, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যে অবদান রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা
দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষার্থী বিনিময়, ইন্টার্নশিপ, স্কলারশিপ এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও পেশাগত পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আরও বিস্তৃত করেছে।
সব মিলিয়ে, সিভাসুর স্বাতন্ত্র্য কোনো একক সুবিধা বা অবকাঠামোতে নয়। বিশেষায়িত শিক্ষা, পিবিএল, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি ইন্টার্নশিপ, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগ—এই ধারাবাহিক শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ই সিভাসুকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পরিমণ্ডলে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।
লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান
সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)।