‘শ্রমিক মালিক এক হয়ে, গড়ব এ দেশ নতুন করে’ এটি শিল্প খাতের পুরনো সেøাগান। পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গঠিত নতুন মজুরি বোর্ডের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা-সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে ওই প্রতিপাদ্যের যথার্থতা ফের আমাদের কাছে নতুন করে অনুভূত হয়। ৫ নভেম্বর ‘পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাড়ছে ডিসেম্বরেই’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের গর্ভে নিহিত বার্তা শুধু যে স্বস্তির আবহ তৈরি করেছে তাই নয়, সংকট নিরসনে সরকারের ত্বরিত সিদ্ধান্তের সাধুবাদ জানাই। আমাদের অভিজ্ঞতায় তিক্ত, সমস্যা-সংকট নিরসনের সময় মতো পদক্ষেপ না নিয়ে উপরন্তু তা জটিল করে তোলা কিংবা ঝুলিয়ে রাখা হয়। বর্তমান সরকার সেই বৃত্ত ভেদ করে সংকট নিরসনের পদক্ষেপ নিয়ে শিল্প ও সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থরক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে। বিষয়টি একদিকে যেমন ইতিবাচক, অন্যদিকে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির নিরসনের পথ সুগম করে।
দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ নভেম্বর নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড প্রথম সভা শেষে ডিসেম্বর থেকেই শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। এ ব্যাপারে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। এ প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। আমরা তিন পক্ষকেই অভিনন্দিত করে বলতে চাই, মালিক-শ্রমিক একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয় বরং উৎপাদন ও শিল্পের পরিপূরক। তবে সরকার-মালিক ও শ্রমিক এই ত্রিপক্ষীয় যৌথ ঘোষণার পরও ঢাকাসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে সহিংস শ্রমিক আন্দোলনের যে বার্তা মিলেছে এর উৎসে নজর গভীর করা জরুরি। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতায় এও আছে, যেকোনো সংকটে তৃতীয় কোনো শক্তি আড়ালে-আবডালে থেকে মন্দের পথ প্রশস্ত করতে ইন্ধন জোগায়। আমরা মনে করি, তারা কারোরই মিত্র নয়। তারা শুধু সুযোগে নিজেদের আখের গোছাতে মত্ত থাকে ধ্বংসের পথ বাতলিয়ে। ৪ নভেম্বর ‘অস্থিরতায় ১৩৭ অর্থদাতা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এরই বার্তা মিলেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিক অসন্তোষসহ শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা তৈরির পেছনে ১৩৭ জন সম্ভাব্য অর্থদাতার নাম রয়েছে। এর বড় অংশই দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তাদের সঙ্গে দেশের ভেতরে থাকা কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করছে।
পোশাকশিল্প খাত শুধু আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় মাধ্যমই নয়, কর্মসংস্থানের পরিসর বিস্তৃত করার পাশাপাশি বিশ্বে দেশের পরিচিতিও নতুনভাবে ছড়িয়েছে। আমরা জানি, দেশের অর্থনীতির রপ্তানি আয়ের অন্যতম জোগানদার পোশাকশিল্প, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট আয় ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার বা ৪.৭২ লাখ কোটি টাকা। সচেতন মহলের বিগত কয়েক বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপড়েন ও বহির্বিশে^ দ্বন্দ্ব-সংঘাতসহ বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্র ও আন্তঃজোটে টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় ক্রমবর্ধমান থাকলেও গত বছর আয়ে যে অভিঘাত লেগেছে তা কাটিয়ে উঠতে সব পক্ষের জোরদার প্রয়াস জরুরি। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। দেশে নারীর ক্ষমতায়নের পেছনে অন্যতম অবদান এ শিল্পের। বিশেষত গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে এই খাত নারীর ক্ষমতায়নে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের যেমন মালিক পক্ষের দিকে সর্বতো সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখতে হবে, তেমনি মালিকদেরও শ্রমিকবান্ধব থাকতে হবে। এ কথাও মনে রাখা দরকার, শ্রমিকের কল্যাণ কোনো বাড়তি ব্যয় নয় বরং এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। শিল্প ও বিনিয়োগের সুরক্ষা এবং উত্তরোত্তর বিকাশেও শ্রমিকদের আন্তরিকতার বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, স্বল্পমেয়াদে অন্য কোনো খাত তৈরি পোশাকশিল্পের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে যথেষ্ট সময় লাগবে। তবে এর ভিত্তি আরও মজবুত করতে অংশীদারত্ব ও সময় এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অধিকতর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলায় মনোযোগ গভীর করা জরুরি। দরকার স্থিতিশীল এবং আরও নিরাপদ কর্মপরিবেশ। ভবিষ্যতে টিকে থাকার লড়াই শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং ক্রেতারা স্বচ্ছতা ও টেকসই উৎপাদনকে অগ্রগণ্য হিসেবে রাখবেন। তাই সেই মোতাবেক প্রস্তুতি নেওয়ার বিকল্প নেই।