ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না যুদ্ধ!

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম

ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও শুরুতে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ধ্বংসের কথা বললেও, ইরানিদের নিজ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ডাক দিতেও বেশি সময় নেননি তিনি। তবে সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও বদলে যায়। যুদ্ধ শুরুর ৮ মাস পরই ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তিই নড়ে গেছে। দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং জ্বালানি তেলের চড়া দামে অতিষ্ঠ ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পরাজিত’ ট্রাম্পের সামনে এখন সমঝোতার পথ খোঁজা অথবা ঝুঁকিপূর্ণ সংঘাত বাড়ানোর কঠিন বিকল্প উন্মুক্ত হলো। তেহরান ও তার সহযোগীদের কাছে এই নির্বাচন সংঘাতের ওপর এক ধরনের রায় হিসেবে বিবেচিত হলেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর কর্মকর্তারা ট্রাম্পের দলের এই ভরাডুবিতে হতবাক। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় এক মিত্রের কাছের এক সূত্র মন্তব্য করেন, ইরানই যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতা পরিবর্তনে সফল হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চরমভাবে ব্যাহত হয়। গালফ অঞ্চলের বিশ্লেষকদের মতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ সীমাবদ্ধ করতে পারবে, যা তাকে চুক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। চীনও এতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। তবে ইরান যদি বিজয়ের দাবি করে এবং ট্রাম্প পরাজিত হিসেবে আবির্ভূত হন, তা আরও বেপরোয়া পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। শুধু ট্রাম্প নন, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ট্রাম্পের মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপরও। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে মাত্র ৫৩টি আসন পেয়ে নেতানিয়াহু নিজেও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। দুই নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই এখন এই যুদ্ধের ফলাফলের ওপর ঝুলছে।

তবে ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকিও রয়েছে। আবুধাবির এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রধান এবতেসাম আল-কেতবি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের জন্য একটি চুক্তি করা জরুরি করে তুলেছে, তবে ইরানের জন্য এটি সহজ নয়। তেহরান যদি বোঝে যে ট্রাম্পের চুক্তি প্রয়োজন, তবে যুদ্ধ থামানোর বড় সুযোগ আসবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়েছে মনে করলে ট্রাম্প নতুন সামরিক হামলার পথও বেছে নিতে পারেন। তেহরানে ট্রাম্পের দলের পরাজয়ে আনন্দ প্রকাশ পেলেও, সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল খালেক আবদুল্লাহর মতে, প্রধান বিপদ এখন ইরানের পক্ষ থেকেই আসতে পারে। কারণ তেহরান ট্রাম্পকে দুর্বল ও নেতানিয়াহুকে শেষ ধরে নিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

সৌদিভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের প্রধান আবদুল আজিজ সাকের জানান, নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় ট্রাম্প তার মেয়াদের শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত চালিয়ে গিয়ে সাফল্য প্রমাণে মরিয়া হতে পারেন। তবে লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সারকিস নাওম মনে করেন, পরাজয়ের পর ট্রাম্প দর-কষাকষির ক্ষমতা হারিয়েছেন। হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে সংঘাত বৃদ্ধি এবং কমার সম্ভাবনা সমান। আগামী জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে আসন গ্রহণ করলে তারা ট্রাম্পের পরিবার ও মিত্রদের বিষয়ে তদন্ত শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্ররা ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে তদন্তের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ রায় জনগণের : গালিবাফ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় পরাজয়কে দেশটির নাগরিকদের ‘যুদ্ধের বিরুদ্ধে’ রায় বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা এই বার্তাকে সমর্থন করি’। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যদি নিজেদের জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে তারা বুঝতে পারবে, তাদের পরিণতি দুঃস্বপ্নের মতো ভয়াবহ হবে’। নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, কংগ্রেসে খারাপ ফলাফলের পেছনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ভূমিকা ছিল। তবে ইরানে যুদ্ধ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত