রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্স কলেজের (সাবেক হোম ইকোনমিকস) অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেছেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর আগে অধ্যক্ষকে তার কার্যালয়ে ১৩ ঘন্টা আটকে রাখেন শিক্ষার্থীরা। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি লাঠিচার্জ করে অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে পুলিশ। এসময় দুই শিক্ষার্থী আহত হন। আহত দুই শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ ও অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো নীলক্ষেতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।
গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার পর কলেজের সামনের সড়কের দুই পাশ অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। বিকেল ৩টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ অব্যাহত ছিল। শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে, পুলিশি হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছাকে অপসারণ। সরকার অধ্যক্ষের পদত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি না করা পর্যন্ত কলেজের সব কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণাও দিয়েছেন তাঁরা।
তবে শুক্রবার সকালে কলেজে একটি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা কোনো বাধা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জামিল হোসেন বলেন, ‘২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করেছেন। তবে কোনো ঝামেলা ছাড়াই নিয়োগ পরীক্ষা শেষ হয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি জামিল হোসেন বলেন, ‘সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা সবাই নারী ছিলেন। শিক্ষার্থীদের আঁচড়ে আমাদের ১০ থেকে ১৫ জন নারী পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। অধ্যক্ষকে বের করে আনার সময় আমাদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের শুধু দুবার ধাক্কাধাক্কি হয়েছে।’
জামিল হোসেন জানান, অধ্যক্ষ বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে ১৩ ঘণ্টা একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন।
অধ্যক্ষকে উদ্ধার, লাঠিচার্জের অভিযোগ
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন কলেজটির শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে অধ্যক্ষকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। প্রায় ১৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ তাকে কার্যালয় থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এতে দুই শিক্ষার্থী আহত হন। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ ছাড়া পুলিশের ধড়পাকড়ের সময় ভিডিও ধারণ করতে গেলে এক শিক্ষার্থীর মুঠোফোন নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে চার দফা দাবি জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-শুক্রবার ক্যাম্পাসে কোনো সরকারি পরীক্ষা নেওয়া যাবে না, ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করা পুলিশ সদস্যদের শোকজ করতে হবে, অধ্যক্ষের পদত্যাগের লিখিত ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসের সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখতে হবে এবং হামলাকে বৈধতা দেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে হবে।
অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনের সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। মধ্যরাতের পরও সেখানে শতাধিক শিক্ষার্থীকে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। তারা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করেন। শুক্রবারও সেই দাবিতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
যেভাবে আন্দোলনের শুরু
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচটি বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে রাত ১০টার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময়সীমা বাড়িয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি ভোর ৫টা পর্যন্ত চলে।
নির্ধারিত সময়ের পরও অডিটোরিয়াম ব্যবহার করায় অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছা। পরে ওই দুই শিক্ষার্থী অধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা চেয়ে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। এ সময় এক রাতের অডিটোরিয়ামের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
কলেজের স্নাতকোত্তর প্রথম পর্বের শিক্ষার্থী তাবাসসুম সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই শিক্ষার্থীর সিট অযৌক্তিকভাবে বাতিল করার কারণেই এই আন্দোলন। আমরা ম্যামের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলে ম্যাডাম বলেন, আমাদের স্যরি অ্যাকসেপ্ট করেছেন এবং শাস্তিস্বরূপ এক রাতের অডিটোরিয়ামের বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা দিতে হবে। আমাদের স্টুডেন্টদের পক্ষে এই টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।’
অন্যদিকে অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছা সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীরা যে অভিযোগ করছেন, তা ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘আমি রাত ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা ভোর ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করেছে। এ কারণে আমি কিছুটা রেগে গিয়ে তাদের দুজনের হলের আসন বাতিল করি। পরে তারা আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আমি কিছুটা নমনীয় হয়ে তাদের বলেছি, ভবিষ্যতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তারা দীর্ঘসময় বিদ্যুতের অপচয় করেছে। আমি তাদের কাছ থেকে বিল আদায় করব। জরিমানার নোটিশ দিয়েছি, এটাই আমার অপরাধ।