ইকবালের জীবনে কোরআনের প্রভাব

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০০ এএম

অবিভক্ত ভারতের খ্যাতিমান কবি মুহাম্মদ ইকবাল। তার কবিতা ও চিন্তায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে মুসলিম উম্মাহর জাগরণ, আত্মমর্যাদা ও স্বকীয় পরিচয়ের প্রত্যয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তুলতে পারে সঠিক জ্ঞান ও আদর্শ। তাই তার সাহিত্যচর্চায় ধর্মীয় চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন গভীরভাবে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে পবিত্র কোরআন তার চিন্তাজগৎ ও সৃষ্টিশীলতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।

ইকবাল ছিলেন একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও ব্যারিস্টার। ফার্সি ও উর্দু ভাষায় রচিত তার কবিতাগুলো আধুনিক যুগের সাহিত্যভা-ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

ইসলামি রাজনৈতিক দর্শন এবং মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণে তার চিন্তাভাবনা তাকে মুসলিম বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তাগত ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তাকে দেশটির আধ্যাত্মিক জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তিনি ‘আল্লামা ইকবাল’ নামেও পরিচিত। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ হিসেবে সমাদৃত। তার জীবনের অন্যতম ঘটনা ছিল স্পেনের কর্ডোবা মসজিদ বন্ধ হওয়ার ৭০০ বছর পর সেখানে আজান দেওয়া ও নামাজ পড়া।

আল্লামা ইকবালের কাব্যজীবনের সূচনা হয়েছিল প্রচলিত গজলধারার মধ্য দিয়ে। কৈশোরে তিনি প্রেম, প্রকৃতি ও সমকালীন নানা বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কবিতার বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডি পেরিয়ে তার কাব্যে স্থান পায় মুসলিম সমাজের জাগরণ, আত্মপরিচয়, নৈতিকতা ও মানবমুক্তির প্রশ্ন। এই পরিবর্তনের পেছনে পবিত্র কোরআনের প্রভাব ছিল গভীর। শৈশব থেকেই কোরআনের সঙ্গে তার পরিচয় গড়ে ওঠে। জীবনীকারদের বর্ণনা অনুযায়ী, চার বছর বয়সে তাকে মসজিদে কোরআন পড়া শেখার জন্য পাঠানো হয়। পরে তিনি মাওলানা সৈয়দ মীর হাসানের কাছে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাহিত্য শিক্ষা লাভ করেন। ফলে কোরআনের শিক্ষা তার চিন্তা ও মনন গঠনে শৈশবেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইকবালের বাবা ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন মানুষ। কোরআন তেলাওয়াতের বিষয়ে তিনি ছেলেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোরআন গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে, অর্থ বুঝতে হবে। আয়াতগুলোকে কেবল উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের জীবনের জন্য আল্লাহর নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

বাবার এই উপদেশ ইকবালের মনে গভীর রেখাপাত করে। পরবর্তী সময়ে কোরআনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এর অর্থ ও শিক্ষা নিয়েও তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। জীবনীকারদের বর্ণনায় তার নিয়মিত কোরআন পাঠ এবং পাঠের সময় আবেগাপ্লুত হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।

ইকবালের কবিতায় কোরআনের প্রভাব নানা দিক থেকে প্রকাশ পেয়েছে। তাওহিদ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আত্মশক্তি, দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা ও উম্মাহর ঐক্যের মতো বিষয় তার কাব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কোরআনের ভাবনা ও বাণীকে তিনি সরাসরি উদ্ধৃত করার পাশাপাশি রূপক, প্রতীক ও কাব্যিক ভাষার মাধ্যমেও প্রকাশ করেছেন। তার ‘খুদি’ বা আত্মসত্তার দর্শনেও মানুষের মর্যাদা, দায়িত্ব ও সৃষ্টিশীল শক্তির প্রতি গুরুত্ব লক্ষ করা যায়। তিনি কোরআনকে নিছক পাঠের গ্রন্থ হিসেবে দেখেননি। বরং ব্যক্তি ও সমাজকে গড়ে তোলার জীবন্ত পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

ইকবাল নিজেও তার কবিতাকে কোরআনের বাণীর ব্যাখ্যা বা মর্মোন্মোচন হিসেবে দেখেছেন বলে তার জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তার একটি ফারসি কবিতায়ও এই ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কোরআনের মর্ম হৃদয়ে ধারণ করতে না পারলে বড় বড় তাফসিরকারের ব্যাখ্যা দিয়েও এর গভীরতা পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

‘বালে জিবরিল’, ‘জরবে কলিম’ ও ‘জবুরে আজম’সহ তার কাব্যগ্রন্থে কোরআনিক চিন্তা, ইসলামের ইতিহাস এবং নবী-রাসুলদের আদর্শের নানা দিক পাওয়া যায়। এসব রচনায় তিনি মুসলমানদের অতীত গৌরব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আত্মসমালোচনা, জ্ঞানচর্চা ও কর্মমুখী জীবনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার কাছে কোরআনের শিক্ষা নিষ্ক্রিয় আবেগের বিষয় ছিল না, বরং তা মানুষকে চিন্তা করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং নিজের জীবন বদলাতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই ইকবালের কবিতা পাঠককে শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের স্বাদ দেয় না, আত্মজিজ্ঞাসা ও জাগরণের পথেও আহ্বান জানায়।

ইকবাল বিভিন্ন বৈঠকে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কোরআনের শিক্ষা ও আদর্শ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন। শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করতেন।

আল্লামা ইকবালের কোরআন চর্চা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। সবচেয়ে বড় গবেষণা কাজটি করেছিলেন ড. গোলাম মোস্তফা খান। ইকবাল একাডেমি পাকিস্তান কর্তৃক ১৯৭৭ সালে ‘ইকবাল ও কোরআন’ শিরোনামে তার এ কাজ প্রকাশিত হয়।

কবি ইকবাল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কর্ডোবা মসজিদে নামাজ আদায় করেন, যা স্পেনে মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন। অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে খলিফা আবদুর রহমান এটির নির্মাণ শুরু করেন। ৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুর রহমানের ছেলে খলিফা হিশাম মসজিদটির প্রাথমিক কাজ সমাপ্ত করেন। নবম শতাব্দীতে খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে পরিপূর্ণভাবে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম শাসকরা স্পেনের ক্ষমতা হারালে মুসলমানদের ইবাদত বন্দেগির জন্য স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় কর্ডোবা মসজিদের দরজা। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের গির্জায় পরিণত হয় মুসলমানদের টানা ৭০০ বছরেরও অধিক সময়ের এই মসজিদটি। মুসলমানদের ইবাদত-বন্দেগির জন্য তাতে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

আজও স্পেনের অন্যতম আকর্ষণ হলো ঐতিহাসিক কর্ডোবা মসজিদ। এ মসজিদই স্পেনকে পৃথিবীর অন্যতম দর্শনীয় দেশের মর্যাদায় সমাসীন করে রেখেছে। আজও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে কর্ডোবা পৃথিবীর আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে স্বীকৃত।

মসজিদ নির্মাণের পর থেকে মুসলিমরা এখানে নামাজ আদায় করেছিলেন প্রায় পাঁচশ বছর। এর সুউচ্চ চারকোনা আকৃতির মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন খলিফা তৃতীয় আবদুর রাহমান। এক সময় সুন্দর সেই মিনার থেকে ভেসে আসত আজানের ধ্বনি। কিন্তু গির্জায় রূপান্তরিত হওয়ার পর মিনারটিতে অসংখ্য ঘণ্টা লাগানো হয়েছে। বর্তমানে কর্ডোবা মসজিদে জুতা পরিহিত অবস্থায় প্রবেশাধিকার রয়েছে।

স্পেন থেকে মুসলমানরা বিতাড়িত হওয়ার পর দীর্ঘ ৭০০ বছর কর্ডোবা মসজিদে কোনো আজান ও নামাজ হয়নি। আল্লামা ইকবালের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল এই মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়ার। ১৯৩৩ সালে স্পেন সফরকালে আল্লামা ইকবাল এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। মসজিদে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শুধু আল্লামা ইকবালকে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে প্রবেশের পর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলা হয়। মসজিদে প্রবেশ করেই উচ্চৈঃস্বরে আজান দেন আল্লামা ইকবাল। দীর্ঘ ৭০০ বছর পর ওই মসজিদে এটিই ছিল প্রথম আজান। আজানের পর জায়নামাজ বিছিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন আল্লামা ইকবাল। নামাজের পর এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে মোনাজাত করেন।

আল্লামা ইকবালের জীবনের প্রতিটি পরতে ছিল কোরআনের প্রভাব। তার চিন্তা, দর্শন ও কবিতা কোরআনের আলোয় আলোকিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোরআনই মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ এবং মুসলমানদের আত্মজাগরণের মূল উৎস। তাই তার কাব্য শুধু সাহিত্য নয়, বরং এক ধরনের দাওয়াত, যেখানে তিনি মুসলিম উম্মাহকে আহ্বান জানিয়েছেন কোরআনের দিকে ফিরে যেতে। কর্ডোবা মসজিদে তার আজান ও নামাজ ছিল সেই আহ্বানের উজ্জ্বল প্রকাশ। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়া এক বন্ধ মসজিদে তার কণ্ঠে আজানের ধ্বনি যেন মুসলিম ইতিহাসের ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে দিয়েছিল।

লেখক : শিক্ষক ও প্রবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত