বাউল সাধকের শোকের সুর

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩, ০৩:৩১ এএম

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের প্রতিটি দিক বাংলাদেশের লোকায়ত পরিম-লের সাধক কবিরা শ্রদ্ধার সঙ্গে কবিতা, গান, পুঁথি, নাট্যপালা প্রভৃতি আঙ্গিকে রচনা করেছেন। এমনকি এদেশের সাধক কবিরা ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে শহীদ হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সম্প্রতি সেই ইতিহাস রচিত হয়েছে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি গ্রন্থে।

উল্লেখ্য, এদেশের সাধক কবিরা শুধু জাতির পিতাকে নিয়ে নয়, তার পূর্বপুরুষদের গৌরবময় ইতিহাসও গ্রন্থন করেছেন। এই বিষয়টি জানা যায়, স্বয়ং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শুরুতেই বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, শেখ বংশের অতীত ইতিহাসের কথা তিনি দুই ভাবে জেনেছিলেন। প্রথমত বাড়ির মুরব্বিদের কাছ থেকে এবং দ্বিতীয়ত চারণ কবিদের গান থেকে। (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ২০১২, পৃ. ৩) এমনকি ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শেখ বংশের পূর্বপুরুষ শেখ কুদরতউল্লাহ কদু শেখের প্রতিবাদের কথাও বঙ্গবন্ধু জেনেছিলেন লোকগানের সূত্রে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘কুদরতউল্লাহ শেখের আধা পয়সা জরিমানা’র দু’একটি গানে ইংরেজ নীলকর কুঠিয়াল মি. রাইনের সাথে আইনি লড়াইয়ের কদু শেখের বিজয়গাথা বর্ণিত হয়েছিল।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫) বঙ্গবন্ধুর এই ভাষ্যের প্রমাণ স্বরূপ ইতিমধ্যে ‘কুদরতউল্লাহ শেখের আধা পয়সা জরিমানা’র গান ও পুঁথি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষের সমৃদ্ধ ও সংগ্রামী ইতিহাস নিয়ে বহু আগে থেকেই সাধক কবিরা যে গানের ঐতিহ্যিক চর্চা শুরু করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই চর্চার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। তাই তো তিনি যেখানেই গেছেন ব্যাকুল হয়ে শুনেছেন ভাব সাধকদের গান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচার বিভিন্ন অংশে বঙ্গবন্ধু নিজেই তার এই গানপ্রীতির কথা প্রকাশ করেছেন।

এছাড়া, এদেশের সাধক কবিদের গানের ভাষ্যেও বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাধক কবিদের আত্মিক সম্পর্ক এবং তাদের প্রতি অসাধারণ মমত্বের কথা। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সুনামগঞ্জের বিখ্যাত সাধক কবি শাহ আবদুল করিম তার আত্মস্মৃতি শিরোনামের একটি বর্ণনাধর্মী গানের বাণীতে লিখেছেন “পূর্ণচন্দ্রে উজ্জ্বল ধরা/চৌদিকে নক্ষত্রঘেরা/জনগণের নয়নতারা/শেখ মুজিবুর রহমান/জাগরে জাগরে মজুর-

কৃষাণ॥/গণসংগীত পরিবেশন করলাম যখন/একশত টাকা উপহার দিলেন তখন॥/শেখ মুজি বলেছিলেন সৎ-আনন্দমনে/‘আমরা আছি করিম ভাই আছেন যেখানে॥” (শুভেন্দু ইমাম, শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র, ২০০৯, পৃ. ৫৩১)। এই গানের বাণীর ভেতর দিয়ে একই সঙ্গে সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে সাধক কবিদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখা যায়।

সাধক কবিদের গানে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার মতো প্রধানতম রাজনৈতিক-অভিজ্ঞা ভিন্নভাবে গৃহীত হয়েছে। সাধক কবি মোসলেম উদ্দিন বয়াতি লিখেছেন “শেখ মুজিবের ছয় দফা দিব্যজ্ঞানে বুঝতে হয়/কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্যের ভাবাশ্রয়।” (সাইমন জাকারিয়া, সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি, ২০২০, পৃ. ১৮২) এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার রাজনৈতিক-অভিজ্ঞা আত্মিক-আধ্যাত্মিক ও দেহ-সাধনার ঐতিহ্যিক ভাবাদর্শের সঙ্গে তুলনীয় করেছেন। এর কারণও রয়েছে, সাধক কবিদের চোখে বঙ্গবন্ধু কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না, ছিলেন স্বয়ং স্রষ্টার আশীর্বাদপুষ্ট মহামানব বা পয়গম্বর। তাই তো সাধক কবির বর্ণনায় বঙ্গবন্ধুর

 নামের মূল অংশ অন্বেষণ করেছেন পবিত্র কোরআন থেকে। পাবনার সুফি সাধক কবি ফকির আবুল হাশেম লিখেছেন “মুজিব একটি আরবি শব্দ কোরানে প্রচার/সুরা হুদের পঞ্চম রুকু শেষ আয়াতের মাঝার/ইহার অর্থ উত্তরদাতা সংগ্রাম প্রতিবাদ/সত্যকে সে প্রশ্রয় দিয়ে মিথ্যার কাটে খাদ।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪) বঙ্গবন্ধুর নাম থেকে শুরু করে তার আগমনের বিষয়কে সাধক কবিরা তাদের নিজের দর্শন, সাধনা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে প্রকাশ করেছেন। যেমন, মানিকগঞ্জের সুফি সাধক কবি সাইদুর রহমান বয়াতি বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বস্রষ্টার ত্রিযুগের মহিমার ভেতর ভিন্নভাবে আবিষ্কার করে ত্রিরতœনামা পুঁথি লিখেছেন। পুঁথির মধ্যে তিনি লিখেছেন “পাক কোরানে আলিফ লাম মি তিনটি অক্ষর আছে/আজ অবধি তিনের মূল ভেদ গোপন রয়েছে।/আল্লাহ আলম আর মোহাম্মদ হকিকতির মূল/ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এ ব্রহ্মান্ডের ফুল॥/এক হইতে তিনের সৃজন তিনে একেশ্বর/তিনটি মিলে চলছে জগতের কারবার॥/...মানবকুলে যে তিন বস্তু থাকা প্রয়োজন/রবীন্দ্র, নজরুল, শেখ মুজিবর মিলেছে তিনজন॥... হায়! রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্ম অংশ মানব অবতার/মানুষের মঙ্গল কামনায় জীবন কাটে তার।/নজরুল ইসলাম কাজী বংশ বিদ্রোহী খেতাব/স্বাধীনতার অগ্নিশিখায় অনুতাপ।/মুজিবুর রহমান তাহার চিন্তা ছিল মুক্তি/দেশের নাম তাই বদল করেছে পেয়ে জনশক্তি।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৮-২৭৯) প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাধক কবিদের গানে বঙ্গবন্ধুর ভিন্নতর প্রতিকৃতি অঙ্কিত হয়েছে। যে প্রতিকৃতিতে তিনি তার জীবনব্যাপী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় শুধু জাতির পিতা নন, একজন অবতার বা পয়গম্বরে পরিণত হয়েছেন। এতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধক কবিদের সীমাহীন ভক্তি, প্রেম ও বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে।

সাধক কবিদের রচনায় বিচিত্র আঙ্গিকে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ গ্রন্থিত হয়েছে। যথা১. বর্ণনাধর্মী পুঁথি-গান বা পুঁথিকাব্যে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি প্রসঙ্গ, ২. জারিগানে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মাহাত্ম্য ও ১৫ই আগস্টে সপরিবারের শহীদ হবার ঘটনার বর্ণনা এবং ৩. লোকগানের অন্যান্য আঙ্গিকে বঙ্গবন্ধু বন্দনা।

পুঁথিকাব্যে মূলত ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামের ইতিহাস ও দূরদর্শিতার কথা বর্ণিত হতে দেখা যায়। এই ধারা ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর শহীদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধক কবিদের অনেকের পুঁথি সাহিত্য রচনা, প্রকাশ ও পরিবেশনের তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রচিত ও প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দুটি উল্লেখযোগ্য পুঁথিকাব্য হলো কিশোরগঞ্জের বাউল কবি মো. তাহেরউদ্দিন খানের বাংলাদেশ কবিতা ও সংগ্রামী কবি আবদুল খালেকের জয় বাংলার পুঁথি। প্রথম দিকের এসব পুঁথিকাব্যে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ এসেছিল বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সমন্বিতভাবে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় মূলত মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ও জাতীয় ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী ও অগ্রণী রাজনৈতিক ভূমিকার কথা বর্ণিত হয়েছে। 

দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ঠিক পর পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সাফল্যগাথা বর্ণনা করে পুঁথিকাব্য রচনা, প্রকাশনা ও পরিবেশনের ধারা সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে বঙ্গ-বিষাদ নামে উল্লেখযোগ্য একটি পুঁথি রচনা, প্রকাশনা ও পরিবেশনের মাধ্যমে বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন নরসিংদীর পুঁথিকার দারোগ আলী (১৩৩৪-১৪২৪ বঙ্গাব্দ)। তিনি তার বঙ্গ-বিষাদ পুঁথিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতিটি কালপর্ব ও ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও সাফল্যের কথা বর্ণনা করেন। এছাড়া, এই কালপর্বে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে যেসব পুঁথিকাব্য রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল তার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকায়ত গীতিকবি ও পুঁথিকার যামিনী কুমার দেবনাথ ওরফে যামিনী সাধুর জয় বাংলার হত্যাকা-, গাজীপুর জেলার পুঁথিকার ইদ্রিস আলী মিঞা’র স্বাধীন বাংলার কবিতা ও রাজাকারের ডায়েরি, ঢাকা জেলার সাহাবদ্দিনের এহিয়ার হত্যাকা-, নরসিংদীর পুঁথিকার গিয়াসুদ্দিনের সোনার বাংলা করিলে শ্মশান, টাঙ্গাইল জেলার পুঁথিকার আমীর আলীর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের কবিতা, নরসিংদীর পুঁথিকার আজিজুল হকের বাংলা স্বাধীনতার কবিতা, নরসিংদীর পুঁথিকার মফিজউদ্দিনের ২১ দফার কবিতা ও (চাষির দুঃখবর্ণনা), দর্জালের সিংহাসন অবশেষে পলায়ন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। (মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, বাংলাদেশের লোকসাহিত্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধ, ২০২০, পৃ. ১৭-১৭৫)

তৃতীয় পর্যায়ে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ঘাতক কর্তৃক সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর শহীদ হওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পুঁথিকাব্য রচনা, প্রকাশনা ও পরিবেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন পাবনার ফকির আবুল হাশেম। তিনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্টের প্রায় তিন বছর পর সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর বংশপরিচয় ও তার কর্মময় জীবনের কাহিনি শীর্ষক রচনা ও প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে এই পুঁথিটি তিনি পাবনা জেলার হাটে-বাজারে পাঠ করে বিক্রি করতেন। এছাড়া, ১৫ আগস্টের শোকাবহ ঘটনার পর বঙ্গবন্ধু ও তার রাজনৈতিক জীবনসংগ্রাম নিয়ে পুঁথি রচনা ও পরিবেশন করেন মানিকগঞ্জের সাইদুর রহমান বয়াতি, নেত্রকোনার আবদুল হেলিম বয়াতী, কিশোরগঞ্জের লাল মাহমুদ প্রমুখ। সাম্প্রতিককালে রচিত বঙ্গবন্ধু বিষয়ক পুঁথির মধ্যে কক্সবাজারের মাস্টার শাহ আলমের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাহিনী ও পুঁথিকাব্যে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বা পুঁথিকাব্যে বঙ্গবন্ধু, গোপালগঞ্জের মনোরঞ্জন বালার বঙ্গবন্ধু গীতিকাব্য, গোপালগঞ্জের শেখ মিজানুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ও শোক দিবস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

উল্লেখ্য, কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে সপরিবারের ইমাম হোসেনের নিহত হওয়ার ঘটনাকে অবলম্বন করে যেমন জঙ্গনামা, জারি জঙ্গনামা, শহিদে কারবালা, হোসেন শহিদ প্রভৃতি নামে ছন্দভাবে অসংখ্য পুঁথিকাব্য রচিত হয়েছিল। যা পরবর্তীকালে জারি-মর্সিয়া গানে রূপান্তরিত হয়েছিল। তেমনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্টে নিজগৃহে মর্মান্তিকভাবে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিহত হওয়ার ঘটনাকে অবলম্বন করেও অসংখ্য পুঁথিকাব্য রচনার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জারি-মর্সিয়া গানের ধারা প্রবর্তিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত পুঁথিকাব্যে প্রাসঙ্গিকভাবে কারবালার ট্রাজেডির সঙ্গে তার হত্যাকা-ের ঘটনাকে তুলনা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যকারীদের এজিদ ও সীমারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জের সাইদুর রহমান বয়াতির বঙ্গবন্ধু মুজিবনামা বা মুজিব শহিদ, রাজশাহীর মোহাম্মদ আব্দুল আলিম ফকিরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের জন্ম ও পরিবার বিষয়ে জারিগান, হবিগঞ্জের বাউল আব্দুর রহমানের বঙ্গবন্ধু বিষয়ক জারিগান, গোপালগঞ্জের শেখ মিজানুর রহমানের শোক দিবসের জারি, কক্সবাজারের মাস্টার শাহ আলমের মুজিব শোকের জারিগান প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের সাধক কবিদের অনেকে ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষদর্শী। অনেকে বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে তাকে নিয়ে রচিত গান পরিবেশন করেছিলেন। অনেকে আবার বঙ্গবন্ধুর ডাকে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কয়েকজন স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শব্দসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া, কিছুসংখ্যক সাধক কবি প্রত্যক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য না পেলেও বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শকে ধারণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান রচনায় তাদের সংগীত জীবনকে সার্থক করেছেন। বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরের তথা বাংলাদেশের সীমান্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের সাধক কবিদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান রচনা ও পরিবেশন করেছিলেন। সাধক কবিদের বিচিত্র ধরনের গানে অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপকভাবে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতির নানা দিক রূপায়িত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। যেসব সাধক কবিদের গানে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তারা হলেন নেত্রকোনার আবদুল মজিদ তালুকদার, সুনামগঞ্জের শাহ আবদুল করিম, কামাল পাশা, দুর্বিন শাহ, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, মছরু পাগলা, মানিকগঞ্জের নূর মেহেদী, আবদুর রহমান, শরিয়তপুরের ইউসুফ মিয়া, চট্টগ্রামের ফণী বড়–য়া, সুনামগঞ্জের চট্টগ্রামের আবদুল গফুর হালী, ঢাকার ভবা পাগলা, নড়াইলের মোসলেম উদ্দিন বয়াতি, বিজয় সরকার, বাগেরহাটের রসিকলাল সরকার, ঢাকা-ফরিদপুরের আবদুল হালিম বয়াতি, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের হযরত আলী বয়াতি, পাবনার ফকির আবুল হাশেম, শরিয়তপুরের ইউসুফ মিয়া, যশোরের তোরাব আলী শাহ, কুষ্টিয়ার মকছেদ আলী সাঁই, মানিকগঞ্জের মহিন শাহ, ফরিদপুরের আয়নাল বয়াতি, ঢাকার মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান, বরিশালের শাহ আলম দেওয়ান, হবিগঞ্জের বাউল আব্দুর রহমান, ঢাকার নীল রতন সরকার, কুমিল্লার বাউল তাহমিনা, চুয়াডাঙ্গার খোদাবক্স সাঁই, আব্দুল লতিফ শাহ, ফরিদপুর আরিফ বাউল, মানিকগঞ্জের বাউল অন্তর সরকার, সিরাজগঞ্জের গুঞ্জের আলী জীবন, কুষ্টিয়ার রেজাউল হক সলক, শরিফুল শেখ প্রমুখ। আগেই বলা হয়েছে যে, সাধক কবিদের গানে কোথাও কোথাও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সাধক কবিরা তাকে এমন একটি উচ্চতা ও মাহাত্ম্য প্রদান করেছেন যে, তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালির জীবনের ত্রাণকর্তা বা অবতার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত