সহচরের শোকের খাতায় বঙ্গবন্ধু

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩, ০৩:৩৩ এএম

অনেকেই আমাকে বঙ্গবন্ধুর সহচর বলে কথা বলতে আসেন। প্রকৃতপক্ষে আমি উনার সাহচর্যে এসেছি, ওনার সঙ্গে রাজনীতি করেছি। এখন আমার বয়স ৮৫ বছর। ওই সময়ের বেশিরভাগ মানুষই এখন আর নেই। এ কথা মিথ্যে নয় যে এই মহান নেতার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি...।  আর সব স্মৃতি গিয়ে ঠেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোক কমে এলেও ভার কমেনি আজও। অনেক কথাই মনে পড়ে।

১৯৭৫ সালের আগস্টে আমি ঢাকায় ছিলাম। বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী সমিতির গোপালগঞ্জ শাখার আমি প্রেসিডেন্ট ছিলাম। আমাদের ১৮ তারিখে রাশিয়া যাওয়ার কথা ছিল। ঢাকায় গিয়ে পাসপোর্ট রেডি করলাম। কথা ছিল, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিজে আমাদের তিনজনের হাতে ভিসা তুলে দেবেন। ভোরবেলা ঘুম ভাঙল আমার বড় শ্যালকের ডাক শুনে, ভাই শিগগিরই ওঠেন, সারা দেশে মার্শাল ল’ জারি হয়েছে। আমি লাফ দিয়ে উঠলাম। রেডিওতে আমার শ্বশুর শুনলেন মেজর ডালিম বলছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। সব শেষ হয়ে গেল। জীবনটাই স্থবির হয়ে গেল যেন। কারফিউ জারি হলো, কেউ আর বাসা থেকে বের হয় না।

আমি ১৮ দিন পর গোপালগঞ্জ ফিরেছিলাম। সব সুনসান, কোথাও কিচ্ছু নেই। মানুষ আসছে যাচ্ছে, সব চুপচাপ। কেউ মুখের দিকে তাকাচ্ছে না...। অথচ মনে পড়ে, ৭১ সালে যুদ্ধের পর আমি যখন গোপালগঞ্জে ফিরি, তখন পাড়ার মুরব্বিরাও আমাকে এসে সালাম দিয়ে গেছে, কথা বলেছে। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর পর আর মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীনের পর গোপালগঞ্জে ফিরে আসার এই স্মৃতি দুটি আমার প্রায়ই মনে পড়ে। দেশটা যেন সেদিন থেকে বদলে গেল!

ছোটবেলা থেকেই আমি বঙ্গবন্ধুর সাহচর্যে এসেছি, আমাকে উনি খুবই স্নেহের চোখে দেখতেন। তাকে প্রথম দেখি ১৯৪৮ সালে, আমি তখন খুলনা জেলা স্কুলে পড়ি। আর বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজ থেকে পাস করে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ল’তে ভর্তি হয়েছেন। সোহরাওয়ার্দী তখন কলকাতায় থাকতেন। বঙ্গবন্ধু উনার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে যেতেন। তো আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। তখন তো বেশি রাত জাগতাম না, অল্প একটু পড়াশোনা করে, তারপর শুয়ে পড়েছি। খুলনাতে আগ্রাবাদে, তখন তার নাম ছিল শ্রীশ নগর, আমাদের ওই বাসাটায় দোতলায় দুটি ঘর। একটা ঘরে আমার চাচা, আর একটা ঘরে আমি থাকতাম। তো রাতে আমি শুয়ে পড়ি, আর খুব ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি আমার খাটে সাদা চাদর দিয়ে আগামাথা মুড়ি দেওয়া একটা লম্বা লোক শুয়ে আছে। আর আমি পাশের ছোট খাটে শোওয়া। আমি বুঝতে পারছিলাম না ছোট খাটে আমি এলাম কখন, কীভাবে। এর মধ্যেই আমার চাচা এসে তখন উনাকে ডাকছেন, ভাইজান ওঠেন, ভাইজান ওঠেন। উনি উঠে বললেন কী হয়েছে হাবিব! চাচা তখন বললেন স্টিমারের তো টাইম হয়ে যাবে। তখন খুলনা থেকে মাদারীপুর যাওয়ার স্টিমার ছাড়ত সকালবেলা। সেই স্টিমারে উনি যাবেন। আগের দিন রাত সাড়ে ১০টায় খুলনায় নেমেছেন। খুলনায় এসে উনি সাধারণত আমাদের বাড়িতেই উঠতেন। আমার সেই চাচা হলো বঙ্গবন্ধুর শিষ্য, উনার এখানেই উঠতেন। খুব ভালোবাসতেন। তো সকালে উঠে উনাকে পরটা গোশত ভুনা নাশতা দেওয়া হলো। উনি সেটা দেখে আমাদের কাজের মহিলাকে ডেকে বললেন, ‘এসব না দিয়ে যদি লাল চালের ভাত দিয়ে পান্তাভাত আর কই মাছ ভাজা দিতা, তাইলে খাইয়া আরাম পাতাম।’ খাবার টেবিলে বসে তিনি আমার চাচাকে বললেন, ছাত্রলীগ গঠনের কথা। তখন তো অত বুঝি না, কিন্তু এটুকু আমার মনে আছে, উনি বললেন, ছাত্রলীগ গঠন করতে হবে। সেই প্রথম দেখা।

এরপর ১৯৪৯ সালে আমার বাবা গোপালগঞ্জের ব্যাংক পাড়ায় চলে আসেন। আমি সেভেনে এস এন স্কুলে ভর্তি হলাম। এখানে আসার পর আরও ভালোভাবে বঙ্গবন্ধুকে দেখা। তখন তো উনি প্রায়ই রাজনীতির জন্য জেলে যেতেন। আর প্রতিবারই জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় দল বেঁধে তাকে রিসিভ করা হতো। এটা ছিল নিয়মিত ঘটনা। একবার উনি জেল থেকে বের হবেন, আমরা সবাই মালাটালা বানিয়ে উনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। উনাকে জেলগেট থেকে মালা দিয়ে বরণ করে আনলাম। উনার একটা হোল্ডার ছিল সঙ্গে, স্যুটকেস ছিল, সেগুলো বাড়িতে দিয়ে এলাম। গোপালগঞ্জের বাসায়,  উনি সেখানে বড় ঘরে উঠতেন। তো উনি জেল থেকে বের হয়ে মসজিদের সামনে বক্তৃতা করছেন, ২০ মিনিটও হয়নি, আবার পুলিশ এসে আরেক মামলায় তাকে ধরে নিয়ে গেল। আমরা সবাই মনঃক্ষুণ্ন হয়ে ফিরে গেলাম। 

image

এমন অনেক স্মৃতি আমাকে তাড়া করে ফেরে। সবাই মুজিব ভাই বললেও আমি তাকে চাচা বলে ডাকতাম। একদিন স্কুল থেকে ফিরছি, বসার ঘরের সামনে উনি একটা ফোল্ডিং চেয়ারে বসা। উনি আমাকে হাত ইশারা করে ডাকলেন। গিয়ে দেখি উনার কাছে একটা ফটো অ্যালবাম। নিজের একটা ছবি বের করে বললেন, এটা পছন্দ হয়? দেখি গোঁফ উঁচানো উনার একটা সুন্দর ছবি। আমাকে নিজের নাম সই করে ছবিটা দিয়ে দিলেন তিনি। ছবিটা আমার কাছে ছিল বহুকাল। উনার কন্যা শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে পার্টি প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন তার পিএস একবার আমার কাছে ছবিটা দেখে বলেন, এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন? আমি বললাম, এটা আমাকে বঙ্গবন্ধু নিজে দিয়েছিলেন। ওই ছবি দিয়েই, উনি চীনে যাওয়ার পাসপোর্ট করেছিলেন। তো উনি বললেন আমাকে এটা দেন, আমি কপি করে আবার আপনাকে দিয়ে দেব। ওই ছবিটা আমাকে আর ফেরত দেয়নি কোনোদিন। সেই ছবির কপি দেখি এখন অনেক জায়গায়। ছবিটা ছিল আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ! 

ওই সময় তো আন্দোলনের সময়। প্রত্যেকদিন স্কুল থেকে সব ছেলেদের নিয়ে বের হয়ে আমরা মিছিল করতাম। উনি তখন স্কুলের সামনে আমগাছের নিচে নিয়মিত বক্তৃতা করতেন। সে সময় থেকেই আমি ছাত্রলীগ করি। এরপর যখন স্কুল পাস করে বিএল কলেজে ভর্তি হই, তখন আবার পাই বঙ্গবন্ধুকে। একবার খুলনায় মিটিং করতে গিয়ে উনি সবুর মিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে একটা বক্তৃতা দেন। তার কয়েকদিন পর ছাত্রলীগের কনফারেন্স ওখানে। তো উনি এলেন সেই কনফারেন্স করতে। থানার সামনে ডেরা হোটেলে। মুসলিম লীগের গুণ্ডারা আর সেইসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের কিছু ছেলেপিলে সেই হোটেলে দরজা আটকিয়ে আমাদের সে কি মার। আমরা কোনোরকমে পেছন দিয়ে পালিয়ে যাই। এরপর যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ল’ পড়ি, তখন উনি জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ে, এখন যেটা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, সেখানে চাকরি করতেন। তখন উনার কাছে মাঝে মাঝেই যেতাম।   

আমাদের নেতা ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে আমার যে কত স্মৃতি! উনি প্রতিটা কাজ করতেন আগে থেকে পরিকল্পনা করে। আমরা হয়তো তখন সেটা বুঝিনি, এখন হিসাব মিলিয়ে দেখি উনি কোনো কাজই পরিকল্পনা ছাড়া করেননি। বেসিক ডেমোক্রেসির ইলেকশনের সময়, ফাতেমা জিন্নাহ যে ইলেকশন করেছিলেন, সেই সময়ের কথা মনে পড়ে। এখন যেখানে জেলা আওয়ামী লীগের অফিস, সেখানে শামিয়ানা টাঙিয়ে নিচে চাটাই বিছিয়ে সব চেয়ারম্যানদের, যারা ভোট  দেবে, উনি রাতভর বসে থাকলেন তাদের নিয়ে। আমরাও ছিলাম সারা রাত। পরের দিন ইলেকশন শুরু, উনি বসে আছেন ভোটকেন্দ্রের বাইরে। সাড়ে ৩টার দিকে দেখি উনি পাইপ টানতে টানতে সেখান থেকে চলে আসছেন। আমরা দেখে দৌড়ে গেলাম। রেডিওতে খবর শুনছি ইলেকশনের, মুসলিম লীগের চেয়ে ফাতেমা জিন্নাহ বেশি ভোট পাচ্ছে। উনি বললেন, “এসব কিছু না, ঠকে যাবা। যাদের সঙ্গে সারা রাত বসে থাকলাম, ভোট দিয়ে আমার চোখের দিকে তারা আর তাকাতে পারে না। মুজিবুর রহমান কোনো সময় ভুল করে না। ওরা একটাও ভোট দেবে না। আমরা অনেক ভোটে হেরে যাব। তোমরা দেখো এরপর ঠকার খবর আসবে” ঠিক তাই হলো। এতটাই দূরদর্শী ছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে স্মৃতি আমাকে সবসময় আপ্লুত করে, চোখে পানি আনে সেটা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পরের ঘটনা। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো টুঙ্গিপাড়ায়। যখন অসহযোগ আন্দোলন চলে। সারা দেশ থেকে তখন লোক শুধু আসছে তার সঙ্গে দেখা করতে। বরিশাল, ভোলা, ঢাকা আরও দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার লোক আসছে লঞ্চে, নৌকায় করে। টুঙ্গিপাড়ার মতো অজ পাড়াগাঁয়ে এত লোক ওই সময়... কল্পনাই করা যায় না। পায়ের ধুলা নিচ্ছে কেউ কেউ, কান্নাকাটি করছে, উনি সবার সঙ্গে কথা বলছেন। সেই সময় ওই বাড়িতে আমি গেছি, ওই মামলায় উনার তখন ফাঁসির হুকুম হয়ে যাবে বলে ভাবত সবাই। আমি তখন গ্রামেগঞ্জে চাঁদা তুলে উনার মামলার খরচ জোগাতে সাহায্য করেছি। শুধু আমরা না, সব জায়গা থেকে আসত। সেই আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলা থেকে উনি যে বেঁচে ফিরে আসতে পারবেন কখনো, আমাদের ধারণাই ছিল না। কিন্তু তিনি ফিরে এসেছেন, আর এতদিন পরে উনাকে এভাবে দেখে, এসব দেখে সহ্য করতে পারছিলাম না, আমার কান্না এসে পড়ে। উনি আমাকে দেখে বললেন কে? আমি বললাম, আমি হাবিব শিকদারের ভাইয়ের ব্যাটা, আপনি আমাকে ভুলে গেছেন? উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন ওরে বাবা, তুই এখন কী করিস? একজন বলল, ওই তো আমাদের অফিস সেক্রেটারি, আর প্রচার সম্পাদক আওয়ামী লীগের। উনি বললেন ভালো করেছিস। খাওয়াতে চাইলেন আমাকে। খান সাহেব উনার চাচা, উনার মেজ মেয়ের জামাই হলো আমার মামা। সেই খান সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন। উনার স্ত্রী টেবিলে খাবার সাজিয়েছেন। এত খাবার! আমি তো অল্প খাই! 

৭০ সালের ইলেকশন হলো।  ইলেকশনের সময় উনি একদিনে ২০টা ৩০টা মিটিং করেছেন। মানুষ আর মানুষ, অসংখ্য মানুষ আসছে। উনি এক জায়গায় বক্তৃতা করেন, আবার আরেক জায়গায় যান। সেদিন ২১টা মিটিং করার পর উনি রাত সাড়ে ১১টায় মুকসুদপুর হয়ে গোপালগঞ্জে এলেন, নজির মিয়া মোক্তার সাহেবের বাসায়। সব নেতারা রয়েছেন। আমি উনার বাম পাশে, আমি তখন সবসময় উনার বাম পাশে বসতাম। উনাকে বললাম, চাচা, আমি মানুষকে ঘরে ঘরে গিয়ে ৬ দফা বুঝিয়েছি, প্রতিদিন মিটিং করেছি। আমাদের একটা ভোটও মার যাবে না। উনি দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমার লোক আমি পেয়ে গেছি, কাশিয়ানী মুকসুদপুরের লোক আমি পেয়ে গেছি। এই দৃশ্য দেখে অনেকেরই মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য আমি নিজেই রাজনীতি থেকে সরে আসি।

মানুষকে মোহিত করার যে কী অসীম ক্ষমতা তার ছিল। গোপালগঞ্জের রাস্তায় তিনি হাঁটলেই পেছনে লোক জড় হয়ে যেত। আমরা দোকানে বসে আড্ডা দিতাম। দেখি সবাই হৈ হৈ করে বলছে মুজিব ভাই আসছে। উনি এসে আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন, কী রে কেমন আছিস। আমি বললাম ওই দেখেন লতিফ ভাই আসছে, উনি কিন্তু এখন নিজামে ইসলাম করেন।  

লতিফ ভাই, যার নামে এখন ইউনিয়ন হয়েছে। উনি তখন নিজামে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তো লতিফ ভাই বঙ্গবন্ধু আসবেন শুনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাস্তায়।

আমার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কী! নিজামে ইসলাম করে! চল দেখি!’  লতিফ ভাইকে উনি বললেন, ‘কি তুমি নাকি নিজামে ইসলাম করো!’ লতিফ ভাই বললেন, ‘কে বলেছে আপনাকে?’ উনি তখন লতিফ ভাইকে বললেন, আসো আমার সঙ্গে। এই বলে লতিফ ভাইকে বুকে টেনে নিলেন। সেই যে উনি এলেন আমৃত্যু আর লীগ ছেড়ে যেতে পারলেন না। আল্লাহ এমনই ক্ষমতা দিয়েছিলেন আমাদের নেতাকে।

তারপর দেশ স্বাধীন হলো। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে ফিরলাম। বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট হলেন। পরে হলেন প্রাইম মিনিস্টার। তখন একবার গোপালগঞ্জে এসেছিলেন। আমরা মিটিং করলাম কলেজ মাঠে। মিটিং শেষে ডায়াসের ওপর আমি বঙ্গবন্ধুর বাম পাশে বসে আছি। আমি সবসময় তার বাম পাশেই বসতাম। কারণ উনার ডান হাতে থাকত একটা পাইপ। আমি সারা জীবন একটা সিগারেটে টান দিয়ে দেখিনি। আমার এই জিনিসটা ভালো লাগত না, তাই আমি উনার বাম পাশে থাকতাম। আমি উনাকে সিগারেট খেতেও দেখেছি। সেই যে ভোরবেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খুলনার বাসায় প্রথম দেখা, তখনো তিনি সিগারেট খেতেন। যতদূর মনে পড়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির পর ওনাকে পাইপ খেতে দেখেছি। মিটিং শেষে আমরা ছবি টবি তুললাম উনার সঙ্গে। যাওয়ার সময় উনি একটা কথা বললেন, “এই গোপালগঞ্জে আমার জন্ম, এইখানে আমি বড় হয়েছি, লেখাপড়া শিখেছি, এই নদীতে আমি সাঁতার কেটেছি। আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, যখন রিটায়ার করব, তখন এই জায়গায় এসে থাকব। এই জায়গাটা আমার খুব হোমলি লাগে, আমি এখানেই থাকব।” এটা উনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন। আর এখন সত্যিই তিনি এই গোপালগঞ্জের মাটিতেই শুয়ে আছেন।

আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ে প্রায়ই। বিএনপির প্রয়াত নেতা খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদের পিতা খন্দকার শামস্ উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে। তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির এমএলএ ছিলেন। ঘটনাটি ৭০ এর ইলেকশনের পরে। বঙ্গবন্ধু এসেছেন, সঙ্গে শেখ কামালও আছেন। খন্দকার সাহেব আমার সিনিয়র, উনি বললেন আমাকে মুজিবুরের সঙ্গে দেখা করিয়ে দাও। আমি বুড়ো হয়ে গেছি, আমারে একটু দেখা করিয়ে দাও। আমি বললাম চলেন এখনই। উনাকে নিয়ে রিকশায় করে বঙ্গবন্ধুর বাসার সামনে নামলাম। এদিকে তখন বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তায় ইট বিছানো। ওরই মধ্যে উনাকে ধরে ধরে আনলাম। বঙ্গবন্ধু তখন খেতে বসেছেন। উনি আর কামাল। ঠিক সেইসময় আমি গেছি। আমাদের দেখেই উনি খাবারে আর হাত না দিয়ে উঠে এসে বললেন, ‘মামা আপনি এসেছেন কেন? আমাকে খবর দিলে আমিই আপনাকে দেখে আসতাম। আমি তো সময় পাই না।’ শামস উদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘তরে দেখতে ইচ্ছা করল।’ বঙ্গবন্ধু তখন কামালকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই আমার বড় ছেলে, আমাদের একটু দোয়া করেন।’ উনি মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন। এই ঘটনাটা আমার খুব মনে পড়ে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একবার উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আমরা ৯ জন। এখানকার যারা নেতা সব, সঙ্গে আমিও গেছি। পার্টি অফিসে উনার সঙ্গে আমরা সবাই বসেছি, আর কেউ সেখানে ছিল না। তোফায়েল সাহেবকে উনি বলে দিলেন যেন আর কেউ না আসে সেখানে। বললেন, তোমরা এসেছ কেন বলো? তখন সালাম মোক্তার বলল আমাদের টেকেরহাট দিয়ে একটা রাস্তা করতে হবে, নাহলে আমরা তো কেউ এখানে আসতে পারি না। ৭ ঘণ্টা লাগে শুধু টেকেরহাট পার হতে। উনি বললেন, রাস্তা কোন জায়গা দিয়ে করতে হবে সেটা আমার জানা আছে, আমি রাস্তা করছি, আমার মাথায় আছে সেটা। আমি জানুয়ারি মাসে গোপালগঞ্জ যাব সেই রাস্তা দিয়ে। আমি অর্ডার দিয়ে দিয়েছি অলরেডি। আমি তখন সরকারি উকিল, আমি ওই ম্যাপ দেখলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু বাকশাল করলেন, আমাকে করলেন থার্ড যুগ্ম সম্পাদক। বাকশাল সিস্টেমে জেলার সম্পাদক ছিলেন নজির সাহেব। যুগ্ম সম্পাদক যথাক্রমে কাজী আব্দুর রশিদ, বিরেণ বিশ্বাস এর পর আমি। তার পরে কামরুল ইসলাম রইস এবং শেখ আব্দুল্লাহ। আমি উনাকে বলিওনি কোনোদিন, উনি নিজেই আমাকে থার্ড যুগ্ম সম্পাদক করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর যখন ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি হলো, কে রাজাকার আর কারা খুনখারাবি করেছে এইগুলোর একটা জরিপ করার জন্য। গেজেট করে তার চেয়ারম্যান বানিয়েছিলেন আমাকে। আরেকটা কমিটির আমাকে চেয়ারম্যান করা হলো, সেটা হলো পুনর্বাসন কমিটি। একাত্তরে যারা বাড়িঘর ফেলে চলে গিয়েছিল, যাদের ঘরবাড়ি লুটপাট হয়েছিল তাদের সেগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য কমিটি। আমি জানি না কেন উনি আমাকে এত দায়িত্ব দিয়েছিলেন, কার কথায় করেছিলেন না নিজেই করেছিলেন জানি না। আমার বারবার মনে পড়ে, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আল্লাহ যদি দিন দেয় রে, গরিব মানুষের কোনো খাজনা দিতে হবে না। বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যক্তিত্ব না হলে এটা সম্ভব হতো না। আজ অনেকে তাকে ছোট করে দেখাতে চায়, যেটা তাদের দীনতা। ভাসানী, সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাদের সান্নিধ্যে বঙ্গবন্ধু যখন গিয়েছেন, তখন তিনি ছিলেন তাদের ছাত্র। রাজনীতি শিখেছেন তাদের থেকে। কিন্তু শেষ বিচারে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে অবিসংবাদিত হয়ে উঠেছেন। তিনি যেখানেই গেছেন, যে মানুষের সঙ্গেই কথা বলেছেন সব জায়গায়, সবার মধ্যে এই প্রভাব তৈরি করতে পেরেছেন। সব শেষে বঙ্গবন্ধুর স্থান গান্ধী, জিন্নাহ, নেহরুর কাতারে।

অনুলিখন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত