বাল্যবিয়ে রোধে সদিচ্ছাই জরুরি বিষয়

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ১০:৩১ পিএম

অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে কথাটা যে, ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজে বহু কুসংস্কার, বহু মানবিকতা বিরোধী আচার-প্রথা, এক কথায় বহু সামাজিক অভিশাপের মধ্যে একটি বাল্যবিয়ে, অপরিণত বয়সী শিশুকন্যার বিয়ে। ফলে কিছু অঘটনও ঘটেছে। যদিও শাস্ত্রকারদের দাবি, কন্যার ঋতুদর্শন অবধি স্বামী সহবাস তথা যৌনমিলন চলবে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তি হচ্ছে, কে শুনবে কার কথা। বিয়ের পর সামাজিক আচারানুযায়ী স্বামীর সর্বাত্মক অধিকার স্ত্রীর সঙ্গে যথা ইচ্ছা আচরণ। পুরুষশাসিত সমাজে এটাই সত্য। কাব্য প্রতীকের প্রবাদ বলে, বাঘের সামনে হরিণকে রেখে সদুপদেশ দিলেও কতক্ষণ সে তার লোভ সংবরণ করে তা মান্য করে চলবে বা চলতে পারবে? কাজেই যথা-ইচ্ছা আচরণ।

হিন্দুশাস্ত্রের চরম অমানবিক রক্ষণশীলতার আমলে স্ত্রী-পুরুষ বৈষম্যের বড় অনাচার সঠিক আচার হিসেবে পালন করা হয়েছে, ব্যতিক্রম নয় বাল্যবিয়ে তথা তাদের ভাষায় গৌরীদান। সাত-আট বা আট-নয় বছরে মেয়ের বিয়ে দেওয়া না হলে সে পরিবারের বিরুদ্ধে সমাজে ‘ছ্যা, ছ্যা’ উচ্চারিত হতো। অতিরক্ষণশীলতার ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পরিবারকে একঘরে করার হুমকি কম ছিল না।

সমাজ সংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক ধারায় প্রতিবেশী মুসলমান সমাজেও এই অভিশপ্ত ব্যাধির সংক্রমণ ঘটে। বিশ শতকের প্রথমার্ধেও তেমন প্রমাণ বিস্তর। ভারতে-বঙ্গে বিদেশি তথা ইংরেজ শাসনের বহু অপকর্ম ও দমননীতির মধ্যে কিছু সামাজিক সংস্কারের আইনপ্রণয়নের মতো সুকর্মও দেখা গেছে যেমন সতীদাহ প্রথা রহিতকরণ, বিধবাবিয়ে প্রবর্তন, বহুবিয়ে বিরোধিতা ইত্যাদি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আইনটি হলো, বাল্যবিয়ে রোধে সহবাস-সম্মতি আইন পাস। এতে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, বিয়ের বয়স তথা সহবাসের বয়স।

সমাজ তখন এতটাই প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল যে, এ আইনের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সমাজে ব্যাপক হরতাল পালিত হয়, গ্রামাঞ্চলে বালিকা বিয়ের ধুম পড়ে যায় এবং তাও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে।

বাল্যবিয়ের সামাজিক কুফলের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ের স্বরূপ বিবেচনা দরকার এ জন্য যে, সেগুলো এই আধুনিককালেও বিরাজমান। ব্যক্তিজীবনের অঘটন যেমন পারিবারিক ও সামাজিক অঘটন হিসেবে স্বীকৃত, একালে বিশ্বে বিপুল জনসংখ্যা বিস্ফোরণের সামাজিক কুফল বিবেচনায় জনসংখ্যা রোধে জন্মনিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য বিবেচিত।

বালিকা বয়সে বিয়ের ফলে মেয়েদের প্রজননকাল অনেকটা বেড়ে যায়। সচেতন দম্পতির বিজ্ঞানসম্মত সদবিবেচনার বাইরে পরিবারের সন্তান-সংখ্যা বেহিসেবি হারে বেড়ে যায়। কয়েক দশক আগেও দেখা গেছে, বহু পরিবারের সন্তান-সংখ্যা আট-দশ ছাড়িয়ে গেছে। আমার দেখা এক শিক্ষিত আটপৌরে চাকরিজীবী পরিবারে সদস্য-সংখ্যা সতেরো, তা সত্ত্বেও গৃহকর্ত্রী জন্মনিয়ন্ত্রণে রাজি নন।

দুই. এটা হলো সর্বাধিক ঘনবসতির দেশ বাংলাদেশের জন্য জাতীয় সংকট। আর এতে পারিবারিক অর্থনৈতিক সমস্যাও কম নয়। একজন মাত্র পরিবার প্রধানের আয়ে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারে নিয়ন্ত্রণহীন জন্মের সন্তানদের প্রতিপালন এবং সুশিক্ষা দান অসম্ভব বটে, কিন্তু বিশ্বে ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিস্ফোরক প্রবণতা জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচিত।

আর সে কারণে উন্নত বিশ্বে , বিশেষ করে ইউরোপে জন্মনিয়ন্ত্রণ হারে সচেতনতা বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। এদিক থেকে এশিয়ার অনেক দেশই যে অসচেতন তার প্রমাণ দেখা যায় চীন ও ভারতবর্ষে। বিপ্লব-উত্তর চীন এ বিষয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে তাদের দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। এ জাতীয় বৈশ্বইক সচেতনতার সাময়িক প্রকাশ ঘটেছিল পূর্ববঙ্গে ষাটের দশকে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিবার কল্পনার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে।

বিজ্ঞানসম্মত এ ব্যবস্থার প্রকাশ ঘটে মেয়েদের ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রক পিল ব্যবহার ও ‘লাইগেশন’ পদ্ধতির ছোট্ট অপারেশনে এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ছোট ‘ভ্যাসেকটমি’র মতো অপারেশনে। মহিলাদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথেষ্ট জনপ্রিয় হলেও, পুরুষদের ক্ষেত্রে ততটা হয়নি তাদের অহমবোধের কারণে।

স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ তথা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সূচকটির দিকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জনসংখ্যা বিজ্ঞানসম্মত হিসাবের বাইরে চলে গেছে। একটি পরিবারে দুটি সন্তানই যথেষ্ট স্লোগানটিকে সঠিক মাত্রায় প্রচার করা হয়নি।

সেই সঙ্গে জনসংখ্যা বিস্ফোরণবিরোধী আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা অর্থাৎ বাল্যবিয়ে রোধ নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র একেবারেই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, বিশেষ করে আইনের প্রয়োগে। গ্রামাঞ্চলে এবং ছোটখাটো শহর-জনপদে দেদার বাল্যবিয়ের ঘটনা তাদের সচেতন করেনি। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে মাঝেমধ্যে চমকপ্রদ ঘটনার প্রকাশ সত্ত্বেও সমাজে সচেতনতার প্রকাশ ঘটেনি। বরং গ্রাম্যসমাজ এদিক থেকে অনাধুনিকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতারই প্রকাশ ঘটিয়েছে।

মাঝেমধ্যে দৈনিক পত্রিকায় দু-একটি বিস্ফোরক সংবাদ আমার সবিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেমন নিচু ক্লাসের স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে বন্ধ বান্ধবীদের প্রতিবাদী সহায়তায়। আবার বিপরীতধর্মী ঘটনাও দেখা গেছে, যাতে প্রকাশ পেয়েছে পারিবারিক রক্ষণশীলতা, বাবা-মায়ের অবিবেচক আচরণ, বিশেষ করে পিতার ভূমিকা শিশুকন্যার বিয়ের ক্ষেত্রে। আইন এ ক্ষেত্রে তাকে বাধা দেয়নি। কাজি সাহেব তো ননই।

বাংলাভাষী সমাজের দুর্ভাগ্য যে, দেড়শ বছরেরও আগে যে বাঙালি মনীষী নারীশিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি বাল্যবিয়ে রোধে যে শ্রমনিষ্ঠ সামাজিক সংস্কার ও তৎপরতা চালিয়েছিলেন, সে কাজটি এখনো বাংলাদেশে ব্যাপক সমাজস্তরে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তার দ্বিশত জন্মশতকেও সেই সামাজিক সমস্যা নিয়ে আমাদের আলোচনা-সমালোচনা সচল রাখতে হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে এখনো চালু রয়েছে বাল্যবিয়ে এবং নারীশিক্ষাও খুব একটা আহামরি অবস্থায় নেই।

তিন. আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঠিকই, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের দিকে কর্মতৎপর, তাতেও সন্দেহ নেই, কিন্তু জনসংখ্যা বিস্ফোরণ এবং বাল্যবিয়ের মতো অনাধুনিকতার দিকে তাদের যথাযথ মাত্রায় নজর নেই। সমাজে ব্যাপক মাত্রায় বাল্যবিয়ে ও নারীর অশিক্ষা চালু রেখে কি আধুনিক কেতার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব? আন্তর্জাতিক মহল কি তা মানবে? বাংলাদেশে বড় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমস্যা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে আইন আছে কিন্তু আইনের যথার্থ প্রয়োগ নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে আইন অসম্পূর্ণ। আইনের ফাঁক দিয়ে আইনবিরোধী কর্ম তথা অন্যায় অপরাধ যেমন সম্ভব, তেমনি সম্ভব অপরাধের শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া। অনেক শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে বাংলাদেশের বেশ কিছু ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে।

আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইনপ্রণয়নে দৃষ্টিভঙ্গিতে যুক্তি ও আধুনিক চেতনার অভাব। সে ক্ষেত্রে নতুন করে আইনপ্রণয়ন সত্ত্বেও উদ্দেশ্য সিদ্ধি হচ্ছে না, লক্ষ্য অর্জন দূরে থেকে যাচ্ছে। যেমন বাল্যবিয়ে বিষয়ক সর্বশেষ আইন। এ বিষয়ে আমাদের মতামতের তুলনায় বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত বরং গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একজন বিশিষ্ট কর্মকর্তার মতে, ‘নতুন আইনে অভিভাবকদের পাশাপাশি পাত্র-পাত্রী, কাজি ও আয়োজনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে। শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ অনেকটা বেড়েছে, কিন্তু বাল্যবিয়ে বাতিল হচ্ছে না। ফলে অভিভাবকরা মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন।’ অর্থাৎ বাল্যবিয়ে সদিচ্ছার অভাব। কেন, কাদের ভয়ে?

কিছুটা অবাক হওয়ার মতো ঘটনা যে আমাদের আধুনিক কেতার জীবনযাত্রায় যেমন নারীশিক্ষা নিয়ে উদাসীনতা, তেমনি বাল্যবিয়ের বিজ্ঞানবিরোধী অনাধুনিকতা নিয়ে সচেতনতার বড় অভাব শিক্ষিত শ্রেণিতেও। আর গ্রামের শিক্ষাহীন বা স্বল্পশিক্ষিত সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতার আশা করা বাতুলতামাত্র। সেখানে অভিভাবক তথা বাবা-মা অপরিণত বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ভারমুক্ত হতে, শিক্ষাদানের দায় থেকে মুক্ত হতে চান। ওই অল্পবয়সী মেয়ের পক্ষে প্রতিবাদ করা বা বিয়ে ঠেকানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজই যা ঘটার ঘটছে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সূত্রের জরিপের পরিসংখ্যান বলছে, এখনো দেশে বাল্যবিয়ের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। ভাবা যায়, ২০২০ সালে পৌঁছেও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অটল শাসনামলে বাল্যবিয়ে তথা শিশুশিক্ষার এই দুরবস্থার কথা? কিন্তু ঘটনা তেমনিই বলছে। এ বিষয় নিয়ে বোদ্ধামহলে বিস্তারিত আলোচনা, প্রতিবাদ, আন্দোলন দরকার। দরকার সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের এই বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, যাতে তারা বাল্যবিয়ে রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রাণিত হয়। বাল্যবিয়েবিরোধী আন্দোলনের প্রবক্তা বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী স্মরণে আমরা কি এ ব্যাপারে উদ্যমী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারি না?

লেখক

ভাষা সংগ্রামী, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত