ভারতের নরেন্দ্র মোদি আন্দোলনকারী কৃষকদের চিহ্নিত করার জন্য একটি নামও উদ্ভাবন করেছেন। ‘আন্দোলনজীবী’। আন্দোলনকারীরা সে-নাম শুনে লজ্জিত তো হয়ইনি, উল্টো বলেছে, হ্যাঁ, তারা আন্দোলনজীবীই, কিন্তু আন্দোলন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কী বুঝবেন, তিনি তো কোনো দিন কোনো আন্দোলনে অংশই নেননি, বরং দেশভাঙায় কাজ করছেন। (দৈনিক ইত্তেফাক, ১১.০২.২১) আন্দোলনকারীরা নিশ্চয়ই সাতচল্লিশের দেশভাঙার কথাটা বলেননি, সে-সময়ে তো রাজনৈতিকভাবে নরেন্দ্র মোদির জন্মই ঘটেনি, বর্তমানে তিনি যে পুঁজিবাদী হিন্দুত্ববাদ চালু করে দেশবাসীকে নানাভাগে খন্ড খন্ড করতে তৎপর রয়েছেন সে কথাই হয়তো বলতে চেয়েছেন। অবশ্য এ কথাও তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে আন্দোলনজীবী হওয়া তো অনেক ভালো চাঁদাজীবী, কিংবা ক্রোনিজীবী (পৃষ্ঠপোষণজীবী) হওয়ার চেয়ে। কৃষক নেতারা আরও জানিয়েছেন যে তাদের আন্দোলন থামবে না, আগামীতে ৪০ লাখ ট্রাক্টরের মিছিল বের হবে।
শীতের কনকনে ঠান্ডা ও করোনার ভয়ংকর ভীতি, নানাবিধ রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, ভাড়াটে সংগঠন দিয়ে বিভেদ সৃষ্টির চতুর চেষ্টা, প্রলোভন, সবকিছুকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার কৃষক যে পথে আশ্রয় নিয়েছে তাদের সেই বিক্ষোভে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিন্তু খুব একটা সাড়া দেয়নি। এতেও অবশ্য বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ মধ্যজীবীরা আর যাই হোক বিপ্লবী নয়, তারা নিজেরটা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে, পারলে ঠেলে-ঠুলে ওপরে উঠবে, নিচে নামা নিয়ে তার সার্বক্ষণিক আতঙ্ক। নিচের মানুষ জেগে উঠুক এটা সে মোটেই চায় না, ভয় ওই মানুষেরা না আবার ভাগ বসাতে আসে। সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও যে বড় রকমের সাড়া দিয়েছে তা নয়। শ্রেণিস্বার্থের শাসনটাকে তারাও মানে বৈকি। কয়েকজন শিল্পী অবশ্য এগিয়ে এসেছেন, বোধকরি শিল্পী বলেই। তাই বলে শৈল্পিক সংবেদনশীলতা যে সব শিল্পীর মধ্যেই কাজ করে তাই বা বলি কী করে। ভুবনবিজয়ী শিল্পী লতা মুঙ্গেশকার, তার গান শুনেছে অথচ আপ্লুত হয়নি এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার, তিনি কিন্তু সাড়া দিয়েছেন উল্টো দিকে, সরকারের দিকে। অতিউজ্জ্বল ক্রিকেট তারকা শচিন টেন্ডুলকার; তিনিও নাকি ঝুঁকেছেন সরকারের দিকেই। সর্বদা-স্মরণীয় শিল্পীই হোন কি অপরাজেয় ক্রিকেট খেলোয়াড়ই হোন বস্তুগত স্বার্থের কাছে তারা যখন কাতর হন তখন তো বুঝতে বাকি থাকে না স্বার্থ জিনিসটা কতটা ক্ষমতাধর।
বিজেপি ভারতে রামরাজত্ব কায়েম করবে বলে মনস্থ করেছে। রামরাজ্যের কথা মহাত্মা গান্ধীও বলতেন; তবে তার কল্পনার রাজ্যটি যে সাম্প্রদায়িক হবে এমনটা কখনোই ধারণা করা যায়নি। তাছাড়া শেষ পর্যন্ত তিনি তো প্রাণই দিলেন মুসলমানদের স্বার্থের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে গিয়ে, এবং যাদের হাতে প্রাণ দিলেন তারা বর্তমান বিজেপি’র পূর্বপুরুষ বৈ নয়। বিজেপি’র রামরাজ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস, সেখানে মুসলমানরা থাকবে হয়তো, ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দেওয়া হবে না, কিন্তু তারা যে বিদেশি, স্থানীয় নয়, এটা মেনে নিয়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেই মুখ বুজে থাকতে হবে। গরুর মাংস তাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে।
পশ্চিমবঙ্গ এতদিন অনেকটা ধর্মনিরপেক্ষ বলেই পরিচিত ছিল, যদিও সেখানকার ৩০ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যা যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে খুব একটা সুবিধায় আছে এমন নয়। এরই মধ্যে বিজিপি’র মাথায় ঢুকেছে যে পশ্চিমবঙ্গ দখল করা চাই। এই মহৎ কর্মের জন্য স্বভাবতই তারা ধর্মকে ব্যবহার করবে। ফলে সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এমন আশঙ্কা তো রয়েছেই, আক্রান্ত হবে এমনকি বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতিও। যেমন ওই পশ্চিমবঙ্গেরই বিজেপি’র এক অধুনা-দীক্ষিত নেতা আক্রমণ করে বসেছেন একেবারে দুর্গা দেবীকেই। দখলদারি হতে গেলে যেমনটা হতে হয়, এর ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে। তিনি খেয়াল করেননি যে দুর্গাকে আক্রমণ করার অর্থটা দাঁড়ায় খোদ বন্দেমাতরমকেই আক্রমণ করা; ওই মন্ত্র ও রণধ্বনিতে যার বন্দনা গাওয়া হয়েছে তিনি মাতৃসম দুর্গা ভিন্ন অন্য কেউ নন; দুর্গা একই সঙ্গে অসুরবিনাশ করেন এবং ফসলের প্রাচুর্য আনেন। বিজেপি’র ওই উত্তেজিত নেতা নিজেদের জন্য আরও একটি বিপজ্জনক কাজ করে বসেছেন; তিনি বলেছেন যে দুর্গা খাঁটি নন, শ্রীরামই হচ্ছেন খাঁটি। কারণ দুর্গার কোনো বংশ-পরিচয় নেই, তার পিতা-মাতা কারা সেটা জানা যায় না; রামের পিতা-মাতা তো বটেই পূর্বপুরুষদের পরিচয়ও ইতিহাসে লেখা আছে। এই কথা বলে তিনি রামচন্দ্রের কথিত অবতারত্বকেই অস্বীকার করে বসেছেন; রামকে একজন মানুষ হিসেবে উপস্থিত করেছেন।
রামায়ণে’র রাম অবশ্য নিজেকে মানুষ বলে পরিচয় দিতেই পছন্দ করতেন, বিষ্ণুর অবতার হিসেবে নয়; বারবার বলেছেন যে তিনি রাজা দশরথের পুত্র। রাম যে দেবতা নন, মানুষই একজন, এটা তাকে নিয়ে লেখা মহাকাব্যটিতে অত্যন্ত সুন্দর ও সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত। তিনি আদর্শ পুরুষ, কিন্তু মানুষই। রাজত্ব করতে গিয়ে তিনি জনরঞ্জন নীতি নিয়েছিলেন, এবং পত্নী সীতাকে রাক্ষস রাবণের বন্দিপুরী থেকে উদ্ধার করে আনার পরে প্রজাদের গুঞ্জন শুনে পত্নীর সতীত্ব প্রমাণের জন্য অগ্নিপরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন। পরীক্ষায় পুরোপুরি কৃতকার্য হওয়ার পরও যেহেতু গুঞ্জন থামেনি, তাই সীতাকে তিনি নির্বাসনেই পাঠিয়ে দিলেন। দুই সন্তানের জননী হিসেবে পরে সীতাকে ফেরত নিয়ে এসেছিলেন; কিন্তু তারপরও যখন সীতার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠল সীতা তখন আর সহ্য করতে পারলেন না, রামকে ধিক্কার দিয়ে নিজের জননী ধরিত্রীকে দ্বিধাবিভক্ত হতে বললেন এবং পাতালে চলে গেলেন। ভূমি থেকে উঠে এসেছিলেন ভূমিতেই আশ্রয় নিলেন। ঠিক যেন ভারতের বিক্ষোভকারী বর্তমান কৃষকদের দশা। তারা ভূমির মানুষ, বারবার পরীক্ষা দেয়, লাঞ্ছিত হয়; কিন্তু ভূমির আশ্রয় ছাড়ে না। অপরদিকে যারা তাদের লাঞ্ছিত করছে তারা অতিশয় উত্তেজিত রূপেই শ্রীরামভক্ত। নতুন যুগের রামভক্তদের হাতে সীতার লাঞ্ছনা চলছে। রামের ভেতর যে পুরুষতান্ত্রিকতাটা ছিল সেটাই যেন বের হয়ে এসে ভর করেছে এই রামভক্তদের কাঁধে। বিজেপি এখন ভারতের সব মানুষকে রামভক্ত বানাবার চেষ্টায় মশগুল; রামের দাক্ষিণাত্যবাসী ভক্তরা হয়তো মানুষই ছিল, কিন্তু রামায়ণের কবির হাতে তারা মানুষ নয় হনুমান হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে বসে আছে। এসব তো গেল, কিন্তু একজন বিজেপি নেতা কী করে দাবি করেন যে রাম দেবতা নন, মানুষই ছিলেন? রাম ইতিহাসের মানুষ, অলৌকিক নন? এতো রীতিমতো ধর্মদ্রোহিতা!
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের ভেতর পরস্পরকে সম্বোধন করার ক্ষেত্রটিতে ‘জয় হিন্দে’র প্রচলন করেছিলেন। হিন্দুদের নমস্তে, মুসলমানদের আসসালামু আলাইকুম, শিখদের জয় শ্রীগুরু’র জায়গাতে অসাম্প্রদায়িক ‘জয় হিন্দ’ ছিল চমৎকার এক উদ্ভাবন, এবং সেটি কারও কাছেই অগ্রহণযোগ্য ঠেকেনি। বিজেপি এখন নেতাজীভক্ত বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার তাল তুলেছে, কিন্তু নেতাজীর উদ্ভাবিত ‘জয় হিন্দ’ সম্বোধনটি তাদের রামভক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য ঠেকছে না, তারা ‘জয় শ্রীরাম’ চালুর তালে আছে। শ্রীরামের জয়ধ্বনি দিতে দ্বিধা করলে বিজেপি’র অনুসারীরা লোকজনকে অপদস্তও করছে। সমগ্র ভারতকে তারা হিন্দুত্বের ও হিন্দি ভাষার ‘অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে’ আবদ্ধ রাখবার মহাযজ্ঞে ব্রতী হয়েছে।
ভারতবর্ষ যে কখনোই এক জাতি, এমনকি দুই জাতিরও দেশ ছিল না, ছিল বহুজাতির দেশ; এই বাস্তবতাটা ভারতের বড় বড় চিন্তানায়ক ও নেতারা কখনোই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না, এমনকি রবীন্দ্রনাথও মনে করতেন ভারতে জাতি একটাই, যদিও নৃগোষ্ঠী (রেস) অনেক ক’টি, যারা মহানন্দে অখন্ড ভারতীয় দেহে লীন হয়ে গেছে। বাস্তবতাটা অবশ্য ঠিকই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
এক-জাতিত্বের দাবির পিঠে দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রবল হয়ে ওঠায় তার মীমাংসার জন্য দেশভাগ ঘটেছে, যাতে ক্ষতি হয়েছে অবর্ণনীয়। এবং সাম্প্রদায়িকতার সমস্যার সমাধান তো হয়ইনি, উপরন্তু সীমান্ত সংঘর্ষ লেগেই আছে; কাশ্মীরের মানুষেরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার চাইতে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছে, এবং পাকিস্তানের নির্মম বন্ধন থেকে মুক্ত হতে গিয়ে বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে ও ২ লাখ নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। এমনকি স্বয়ং সুভাষ বসুও কিন্তু বাংলার নেতা থাকতে চাননি, সর্বভারতীয় নেতা হবেন ঠিক করেছিলেন; তিনিও ভারতবর্ষকে এক জাতির দেশ হিসেবেই দেখতেন; এবং হিন্দিকে জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণে তার যে অসম্মতি ছিল এমনও নয়। ১৯২৮ সালে কলকাতায় সারা-ভারত হিন্দি সম্মেলন বসে; সুভাষ বসু তাতে সভাপতিত্ব করেন এবং বলেন যে মাতৃভাষার চর্চার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই সহ্য করা হবে না, কিন্তু জাতীয় ভাষা একটাই, সেটা হিন্দি। রবীন্দ্রনাথও ভারতীয় ঐক্যের জন্য হিন্দির আবশ্যকতার বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন, তবে জাতীয় ভাষা হিসেবে নয়, যোগাযোগের ভাষা হিসেবেই। হিন্দিকে জাতীয় ভাষা ঘোষণার আওয়াজটাই কি অনুপ্রাণিত করেছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’কে সেই বিপজ্জনক ঘোষণাটি দিতে যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা? এমন ব্যাখ্যা নেহাত অচল নয়। জিন্নাহ যদিও রাষ্ট্রভাষার কথাই বলেছেন, তবে সেটিকে তিনি ওই জাতীয় ভাষা করার কথাই ভেবেছিলেন এবং ভাষার ওই ডোরে বার শ’ মাইলের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পাকিস্তানকে বেঁধে রাখবেন বলেই হয়তো আশা করছিলেন। তিনি অবশ্য কথাটা বলার পর আর বেশি দিন বেঁচে ছিলেন না, থাকলেও যে অনিচ্ছুক পূর্ববঙ্গকে ‘ভ্রাতৃবন্ধনে’ আটকে রাখতে পারতেন না সেটা নিশ্চিত। হিন্দি ভাষা দিয়ে যারা ভারতের বহুজাতিত্বের পরিচয়কে ধুয়েমুছে ফেলবেন ভাবছেন তারা যে কামিয়াাব হবেন এমনটা ভাববার যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই।
লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়