যে পুরুষের গুরুত্ব তার স্ত্রীর চেয়ে অনেক কম পুরুষশাসিত সমাজে অপদার্থ হিসেবে তার উপেক্ষিতই থাকার কথা। উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে এ ধরনের পুরুষ আমার পছন্দের। প্রভাবিত হয়ে পড়তে পারি এ আশঙ্কায় এ ধরনের পুরুষ আমিও এড়িয়ে চলি। কিন্তু ব্যতিক্রম তো থাকতেই হবে। বহু বছর তার দিকে করুণার চোখে তাকিয়ে থাকার পর এবং এমনকি ১৯৯৩ সালে বিলেতবাসকালে খানিকটা দূর থেকে একবার বাস্তবের মানুষটির দিকে করুণাবর্ষণ করার পর যখন জানলাম ‘ডন্টোপেডালজি’ শব্দের জনক তিনিই, অন্য কেউ নন, আমার করুণা হঠাৎ কৌতূহলে পরিণত হলো। তিনি যদি অনুগ্রহ করে ৯ জুন ২০২১ পর্যন্ত বেঁচে থাকেন তাহলে তিনিই হবেন গত ৫০০ বছরের প্রথম শতবর্ষী স্বামী যার স্ত্রী কেবল স্ত্রী নন, রানী।
৬১ বছর আগে ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ জেনারেল ডেন্টাল কাউন্সিলের সভায় তিনি নিজের কথাবার্তার ভুলভ্রান্তি নিয়ে বলেছিলেনডন্টোপেডালজি হচ্ছে এমন একটি বিজ্ঞান, যাতে নিজের মুখ খুলে পা ঢুকিয়ে দিতে হয়আমি বহু বছর ধরে এটা চর্চা করে আসছি। আমাদের সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রীদের মধ্যে অন্তত একডজনের ডন্টোপেডালজি চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়। নিজের কথার ফাঁদে আরও অনেক মন্ত্রীই পড়তে অভ্যস্ত, তবে তারা ডন্টোপেডালজিস্ট মর্যাদার নন। খানিকটা দূর থেকে তাকে দেখতে হয়েছে কারণ, তিনি ট্রাক নন, ট্রাক হলে পেছনে লেখা থাকত ১০০ হাত দূরে থাকুন। তার পরও ছোট ছোট গাড়ি এমনকি রিকশা ও ট্রাকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিন্তু প্রিন্স ফিলিপের পেছন দিকটায় দূরত্ব বজায় রাখার কোনো নির্দেশনা নেই, সম্ভবত সে কারণেই কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ে না। আশপাশে যে বড় ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকে এমনও নয়।
স্কুলজীবনে শোনা কৌতুকটি ফিলিপকে নিয়েই। তিনি বিলেতের কোনো এক হেমায়েতপুর পাগলাগারদ পরিদর্শন করতে গেলেন। কৌতূহলী পাগলদের একজন জিজ্ঞেস করল, হু আর ইউকেডা? তিনি বললেন, আমি রানী এলিজাবেথের হাজব্যান্ড। শুনে পাগলরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তাদের একজন বলল, তোমারও আসার সময় হয়ে গেছে। পাগলাগারদের বাইরে থাকার সময় আমিও নিজেকে এলিজাবেথের হাজব্যান্ড ভাবতাম।
ডন্টোপেডালজি চর্চা করতেন বলেই কথাটা পলিটিক্যালি কারেক্ট হলো কি না, এ নিয়ে ভাবতেন না। মুখে যখন একবার এসেই পড়েছে, বলে ফেললেন। এ নিয়ে রানী বিব্রত হয়েছেন, রাজপরিবারের সদস্যরা বিব্রত হয়েছেন, সরকার বিব্রত হয়েছে। ২০০৬ সালে ডিউক অব এডিনবরা পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বললেন, ‘তরুণরা আগে যেমন ছিল এখনো সে রকমই আছেএকই রকম মূর্খ।’ জন মুডি প্রিন্স ফিলিপকে আখ্যা দিয়েছেন ‘দ্য গ্র্যান্ডফাদার অব পলিটিক্যাল ইনকারেক্টনেস’।
১৯৮৬ সালে চীনে যাওয়ার পর ব্রিটিশ তরুণ-তরুণীরা যখন তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলো, তিনি বললেন ‘যদি এ দেশে বেশিদিন থাকো, তাহলে তোমরাও কুৎকুতে চোখা হয়ে যাবে।’ রাশিয়া যাওয়ার প্রশ্নে একবার বললেন, ‘আমি অবশ্যই রাশিয়া যেতে চাই যদিও হারামজাদারা আমার পরিবারের অর্ধেক লোককে হত্যা করেছে।’ ১৯৮৬ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের এক সভায় তিনি বললেন, ‘যদি চারটা পা থাকে আর তা যদি চেয়ার না হয়, যদি দুটো ডানা থাকে এবং তা উড়োজাহাজ না হয় আর যদি তা সাঁতার কাটে আর সাবমেরিন না হয় তাহলে ক্যান্টোনিজরা সবই খেয়ে ফেলবে।’ তার মানে চাইনিজরাই হচ্ছে প্রাণিজগতের শত্রু। ২০০৩ সালে ওলুসেগান ওবাসানজো নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট, তিনি নাইজেরিয়ার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় পোশাক পরিহিত অবস্থায় আছেন। প্রিন্স ফিলিপ তাকে দেখে বললেন, মনে হচ্ছে আপনি এখনই বিছানায় শুয়ে পড়ার জন্য তৈরি? একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলেন, তার ছেলে চার্লস, প্রিন্স অব ওয়েলস কবে সিংহাসনে আরোহণ করবেন? তিনি জবাব দিলেন, ‘রানী কবে মারা যাবেন আমাকে কি সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন?’
প্যারাগুয়ে সফরের সময় সে দেশের একনায়ক শাসক আলফ্রেদো স্ট্রোয়েসনারকে বললেন, ‘বেশ মজার পরিবর্তন, এমন জায়গায় এসেছি যে দেশ তার জনগণ শাসন করে না।’
ভারত সফরের সময় রাজকীয় সফর কাভার করার দায়িত্বে থাকা এক ফটোগ্রাফার গাছ থেকে পড়ে যান। প্রিন্স ফিলিপ বলেন, ‘আশা করি সে তার ঘাড়টা ভালোই ভেঙেছে।’
২০১২ সালের মার্চে প্রতিবন্ধী ডেভিড মিলার রেডব্রিজের ভ্যালেন্টাইন ম্যানসনে মোবিলিটি স্কুটার চালিয়ে আসেন। প্রিন্স ফিলিপ তাকে জিজ্ঞেস করেন, ওটা দিয়ে আজ সকালে মোট কজনকে চাপা দিয়েছো? ২০০২ সালে স্কটল্যান্ডের আইল অব লুইস-এ বুলেট প্রুফ ভেস্ট পরিহিত একজন নারী কর্মকর্তাকে তিনি বললেন, ‘তোমাকে আত্মঘাতী বোমারুর মতো দেখাচ্ছে।’ ১৯৯৮ সালে পাপুয়া নিউগিনিতে নরখাদক গোত্রের সন্ধানে থাকা একজন গবেষক ছাত্রকে তিনি বললেন, ‘তুমি তাহলে ওদের খেয়ে ফেলার হাত থেকে বেঁচে গেছ?’
১৯৯৪ সালে ক্যায়মেন আইল্যান্ডসের একজন ধনী ব্যবসায়ীকে তিনি বললেন, ‘আপনাদের অধিকাংশই তো জলদস্যুর বংশধর, তাই না?’ ১৯৯৩ সালে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে এক ব্রিটিশ নাগরিককে বললেন, তুমি এখানে বেশিদিন টিকতে পারবে না, তোমার ভুঁড়ি নেই।
১৯৮৪ সালে কেনিয়ায় স্থানীয় এক নারী যখন তাকে একটি উপহার দিতে এলেন তিনি তাকে বললেন, ‘আপনি তো একজন মহিলা? ঠিক বলিনি?’ ১৯৮৮ সালে সানিংহিল পার্কে যেখানে ডিউক ও ডাচেস অব ইয়র্কের থাকার আয়োজন করা হয়েছে দেখে তিনি বললেন, এটা তো বেশ্যাদের বেডরুমের মতো।
১৯৬৯ সালে কানাডা সফরে একটি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, ‘এটা যাই হোক, আমি উদ্বোধন ঘোষণা করলাম।’
২০১৩ সালে কিশোরী মালালা ইউসুফজাই তালিবান হত্যাচেষ্টা থেকে বাঁচার পর লন্ডনে বাকিংহাম প্যালেসে যখন রানী এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, বললেন, ‘মেয়েরা যাতে নির্ভয়ে স্কুলে যেতে পারে সে উদ্যোগ নিতে হবে।’ কিন্তু প্রিন্স ফিলিপ বললেন, ‘সন্তানদের স্কুলে পাঠায় কারণ বাবা-মা তাদের বাসায় দেখতে চায় না’ মালালা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
২০১২ সালে ব্রমলিতে যখন এলেন ২৫ বছর বয়সী সুন্দরী হানা জ্যাকসন সামনের দিকে জিপার লাগানো লালজামা পরে প্রিন্স ফিলিপের সামনে হাজির হলেন। তিনি বললেন, আমি যদি ওই পোশাকের জিপার খুলি তাহলেই আমাকে এখনই গ্রেপ্তার করা হবে।
২০০১ সালে স্যালফোর্ডে একটি স্কুল ভিজিটে এসে একটু মোটাসোটা অ্যান্ড্রু অ্যাডামসের সঙ্গে কথা বলছিলেন, ‘তুমি এত মোটা যে তুমি নভোচারী হতে পারবে না।’
এসেক্সের স্কুলছাত্র জর্জ বার্লো রানীকে একটি চিঠি লিখেছিল। প্রিন্স ফিলিপ স্কুল ভিজিটে এলেন, বার্লো যখন নিজের নাম বলে হাত বাড়িয়ে দিল প্রিন্স ফিলিপ বললেন, তুমিই সেই ছেলে যে রানীকে চিঠি লিখেছে! তার মানে তুমি লিখতে পারো। ১৯৯৭ সালে রানী এলিজাবেথের সঙ্গে বিয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে বিয়ের ওপর অনুষ্ঠিত একটি আলোচনায় তিনি বললেন, ‘আমার কাজ থেকে সবাই নিশ্চিত হতে পারেন রানীর পর্যাপ্ত ধৈর্য আছে।’ ২০০২ সালে কনকর্ডের শেষ ফ্লাইট যখন বাকিংহাম প্রাসাদের ওপর দিয়ে যায়, রানী ও প্রিন্স ফিলিপ আনুষ্ঠানিকভাবে তা দেখেন। ফিলিপ মন্তব্য করেন, আমি ব্রিটেনের একমাত্র ব্যক্তি উড়োজাহাজের পেছনটা দেখে যে খুশি হয়েছি।
শত বছর ছুঁই ছুঁই রানীর স্বামী রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন, ডাক্তার বলেছেন, এমন কিছু নয় ‘প্রিকশনারি মেজার’ হিসেবে হাসপাতাল শয্যা, কভিড-১৯-এর কোনো লক্ষণ নেই। তাহলে সেঞ্চুরি আশাই করা যায়, নার্ভাস নাইনটির একেবারে শেষ প্রান্তে তিনি। এলিজাবেথের সঙ্গে যত দিন তিনি সংসার করেছেন, মহারানী ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স আলবার্ট তত দিন বাঁচেনওনি। আয়ু পেয়েছেন ৪২ বছর। আর ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে সংসার ২১ বছর। আর রানী প্রথম এলিজাবেথ (১৫৩৩-১৬০৩) শেষ পর্যন্ত বর পাননি। নিজেই দাবি করেছেন ভার্জিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবেন। ফিলিপ ভাগ্যবান, রাজকন্যার জন্য তাকে কাঠখড় পোড়াতে হয়নি, ইঁচড়ে পাকা এলিজাবেথই মা ও বাবা দুজনের দিক থেকেই আত্মীয়। গ্রিসে জন্মগ্রহণ করা নৌ-সেনা ফিলিপকে ১৩ বছর বয়সেই প্রেমপত্র লিখে তার মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় এলিজাবেথের একশতম জন্মদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। ২১ নভেম্বর ১৯৪৭ তাদের বিয়ের ধারাবিবরণী ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি থেকে বিবিসি রেডিও প্রচার করে এবং ২০ কোটি মানুষ সে বিবরণী শোনে।
১৯৫২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জর্জ মৃত্যুবরণ করলে কেনিয়ার আরণ্যক হানিমুন ফেলে ফিলিপ ও এলিজাবেথকে ফিরে আসতে হয়। বাকিটা পৌরুষের কলঙ্কজনক ইতিহাস! চাকরি-বাকরি ছেড়ে পাগলাগারদের অধিবাসীদের সামনে নিজেকে রানীর হাজব্যান্ড ছাড়া বলার মতো আর সব পরিচয় তার বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখনকার রাজকীয় বিধান অনুযায়ী সন্তানদের ওপর নিজের নাম আরোপ করতে না পেরে মনের দুঃখে বলে ওঠেন : আমি শালার একটা ব্লাডি অ্যামিবা, নিজের নামটাও বাচ্চাদের ওপর চাপানোর অধিকার আমার নেই, সারা ব্রিটেনে এমন পুরুষ একজনই। স্পাইড মিলিগানের একটি সাক্ষাৎকার আমার বিলেত জীবনে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রিন্স ফিলিপের অবদান কী? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, চারটি অপদার্থ সন্তানের জন্মের জন্য দায়ী হওয়াএদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আহাম্মক হচ্ছে চার্লস। নতুবা যে নারীর সঙ্গে তার বাবার ফস্টিনস্টি করার কথা, তাকে সে বিয়ে করে?
এলিজাবেথের রাজত্বের ৬৯ বছর পেরিয়ে গেছে আর মাত্র ৩ বছর ৩ মাস শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে টিকে থাকতে পারলে ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই-এর রাজ্য চালানোর ৭২ বছর ১১০ দিনের বিশ^রেকর্ডটি ভাঙতে পারবেন। ফিলিপ যে রেকর্ড করেছেন তার ধারে-কাছেও কোনো রানীর হাজব্যান্ড নেই। এত দিন কোনো হাজব্যান্ড টিকে থাকে না। যেদিনই তার মৃত্যু হোক, সেই দিনটা যেন ৯ জুন ২০২১-এর পর হয়। তাহলে তিনিই হবেন গদিনশিন রানীর প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হাজব্যান্ড। একটু আগেভাগে লিখে রাখা এই অবিচুয়ারিতে আমাকে স্বীকার করতেই হবে ব্রিটেনে রসবোধসম্পন্ন মানুষ এমনিতেই কম, মুখে পা ঢুকে যেতে পারে এই ভয়ে তারা মুখই খুলে না, সেখানে প্রিন্স ফিলিপ মুখ খোলা রাখতেন। তিনিই ছিলেন ব্রিটেনের সবচেয়ে রসিক মানুষ। রসিক? রসিক না হলে কেউ রানীর স্বামীর পদ এত দিন আঁকড়ে থাকেন!
প্রিন্স ফিলিপ রেস্ট ইন পিস আফটার ইউর ডেথ।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক