রাজনীতিবিদদের কাছে প্রত্যাশা

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২১, ১১:৪৬ পিএম

পৃথিবীতে যেসব দেশের মানুষ দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, অর্জন করেছে স্বাধীনতা তাদের জাতীয় জীবনে অনেক স্বর্ণঝরা উদ্দীপনাময় তারিখ আর মাস থাকে। যা যুগ যুগ ধরে প্রাণিত করে প্রজন্মকে। একই প্রেক্ষাপটে বাঙালির জীবনেও এমন অনেক উজ্জ্বল মাস ও তারিখ রয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসের বিশেষণ হতে পারে ‘উত্তাল’ শব্দ চয়নে। মার্চ মাসের একটি রক্তিম সূর্যোদয়ের তারিখ ২৬ মার্চ। যার পর্দা উন্মোচিত হয়েছিল ২৫ মার্চের কালরাতে। পাকিস্তানি হায়েনাদের আক্রমণ বাঙালির স্বাধীনতাকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়। তারপর শুরু হয় স্বাধীন দেশ থেকে শত্রু তাড়ানোর লড়াই। সব ঘটনারই পরিপ্রেক্ষিত থাকে। থাকে কার্যকারণ সূত্র। ঘটনার গুরুত্ব অনুযায়ী পরিপ্রেক্ষিতের ধার ও দৈর্ঘ্য রচিত হয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার লড়াই ও স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে। সর্বোপরি বড় ঘটনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুভব করতে হলে পটভূমির গুরুত্ব সমানভাবে অনুধাবন করতে হয়। ইতিহাস রচয়িতারা এ ধরনের পটভূমিকে দুটো ভাগে বিভাজিত করেন। একটি দূরবর্তী পটভূমি অন্যটি আসন্ন পটভূমি। দূরবর্তী পটভূমি বড় ঘটনা বা অর্জনের অনুঘটক। কিন্তু তখনো লক্ষ্য সুনিশ্চিত থাকে না। নানা অস্বস্তি, অপূর্ণতা, অধিকার আদায়ের লড়াই ধীরে ধীরে মানুষকে সংঘবদ্ধ করে। জাতীয়তাবোধকে শাণিত করে। বিরুদ্ধ শক্তি সম্মানজনক নিষ্পত্তিতে না গিয়ে গণমানুষের ন্যায্য দাবিকে যখন উন্মত্ততা দিয়ে পিষে ফেলতে চায়, তখনই ঘটে বিস্ফোরণ। আর এই বিস্ফোরণ থেকে জন্ম নেয় আসন্ন কারণ। আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির হয়। ১৯৭১-এর মার্চ মাসের প্রথম দিনেই অধিকার আদায়ের সংগ্রামে রাজপথে থাকা বাঙালির আন্দোলনে বিস্ফোরণ ঘটেছিল।

এবার ২৬ মার্চ নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছে। আমরা পালন করেছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। একই সঙ্গে মুজিব জন্মশতবর্ষও পালিত হচ্ছে। এই করোনাকালেও ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় সফল উদযাপন হয়েছে। অবশ্য ‘করোনার কথা ভেবে’ বিরোধী দল বিএনপি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে কোনো কর্মসূচি রাখেনি। তবে প্রথমবারের মতো ৭ মার্চ পালন করেছে জিয়াউর রহমানকে আরেকবার ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বলার জন্য!

এটি ঠিক ২৬ মার্চকে অনুধাবন করতে হলে দীর্ঘ প্রেক্ষাপট মাথায় রাখতে হবে। পাকিস্তানের জন্মলগ্নে ভাষার প্রশ্নে শাসকগোষ্ঠী সংকট তৈরি করে একটি বিভাজন রেখার জন্ম দিয়েছিল। অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের একের পর এক নিপীড়ন ও শোষণমূলক সিদ্ধান্ত। যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই বাঙালি তার অধিকার আন্দোলন শুরু করেছিল। আন্দোলনের পথ ধরেই ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। রক্তমূল্যে দাবি আদায়ের পথে বারবার হেঁটেছে বাঙালি। পশ্চিমা শাসকরা বাঙালির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল শোষণ নিপীড়ন। প্রতিবাদে উত্তাল হয় রাজপথ। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিরোধ রেখা স্পষ্ট হয়। বাঙালির সহস্র কণ্ঠে উঠে আসে স্বায়ত্তশাসনের দাবি। এবার বাঙালির আন্দোলন থামিয়ে দেওয়ার জন্য সামনে নিয়ে আসা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। শেখ মুজিবসহ অনেককে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আটক করা হয়। কিন্তু আটকে রাখা যায়নি বেশি দিন। ‘জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব’ সেø­াগান কাঁপিয়ে তোলে। ভিত কেঁপে যায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের। জনজোয়ারের তোড়ে শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্ত শেখ মুজিবকে হৃদয়ের অর্ঘ্য দিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে ছাত্র-জনতা। আন্দোলন তীব্রতা পায়। রূপান্তরিত হয় গণঅভ্যুত্থানে। পরাভব মানতে বাধ্য হন আইয়ুব খান। নতুন প্রেসিডেন্ট সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান উত্তপ্ত বাঙালিকে প্রশমিত করতে ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করেন।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন বঙ্গবন্ধু। এরপর থেকেই শুরু হয় নানা ছলচাতুরী আর বাঙালির অধিকারকে পদদলিত করার জন্য ষড়যন্ত্র। এ পথ ধরেই ১৯৭১ এর মার্চ অগ্নিঝরা মার্চ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নাগরিক সমাজের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও বাঙালির হাতে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা দেবে না পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্র। শাসকদের আচরণ ও ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হয়ে পড়ে। রাজপথ উত্তাল হয়। মিছিলের নগরীতে পরিণত হয় ঢাকা। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পাকিস্তান থেকে। তারা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। ছাত্ররা তৈরি করে ফেলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সবুজ পটভূমিতে লাল সূর্য আর সূর্যের বুকে বাংলাদেশের হলুদ মানচিত্র। এখন বাকি বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তাই সবাই তাকিয়ে থাকে ৭ মার্চের ভাষণের দিকে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান ছাপিয়ে মানুষের ঢলে সয়লাব হয়ে যায় চারপাশ। বঙ্গবন্ধু জানেন স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার জন্য উন্মুখ দেশবাসী। তার আকাক্সক্ষাও অভিন্ন। কিন্তু সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই একজন দূরদর্শী নেতার মেধা নিয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন তিনি। এখানে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল। বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাষ্ট্রদ্রোহী বলে বঙ্গবন্ধুকে অভিযুক্ত করার সুযোগ রাখা হলো না। অথচ প্রচ্ছন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হলো। সাধারণ মানুষ মর্মার্থ ঠিকই বুঝে নিতে পারল। এ কারণে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি জান্তা যখন চরম বর্বরতা নিয়ে বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন বাংলার মানুষ মানসিক বল হারায়নি। দ্রুতই তারা ঘুরে দাঁড়ায়। এভাবেই মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পাতার ইতিহাস লেখা হয়ে যায়। এরপর দেশপ্রেম, বীরত্ব আর গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য রচিত হয় নয় মাসে। বাঙালির রক্তমূল্যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী লড়াইয়ে, সাধারণ বাঙালির সহযোগিতার হাত প্রসারণে, অপরিমেয় ধ্বংসযজ্ঞে আর অসংখ্য বাঙালি নারীর লাঞ্ছনার বিনিময়ে বাংলার মানুষ অর্জন করে তার স্বাধীনতা।

দীর্ঘ আন্দোলন আর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ অগ্রগতির সোপান ধরে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল শুরুতে তা হলো না। মুক্তিযুদ্ধস্নাত বাংলাদেশের মানুষের জন্য এর চেয়ে বেশি কষ্টের আর কিছু হতে পারে না। দীর্ঘ কালপরিসর পার করে স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু ভাগ্যাকাশের অন্ধকার অনেকদিন তাড়াতে পারেনি বাঙালি। অপরিণামদর্শী, স্বার্থবাদী, অমেধাবী আর প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আদর্শহীন রাজনীতিকদের হাতে লাঞ্ছিত হতে থাকে রাজনীতির মহৎ প্রতিষ্ঠানটি। বারবার রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটল কিন্তু জনগণের রাজনীতি ফিরে আসেনি অনেক দিন। ক্ষমতাবান নেতানেত্রীরা স্বার্থবাদী দলীয় রাজনীতির গন্ডি থেকে বেরুতে পারলেন না। বরঞ্চ রাজনৈতিক অসুস্থতা ছড়াতে লাগলেন চারপাশে। এই সংক্রমণে অসুস্থ হতে থাকল সব প্রতিষ্ঠান। অসুস্থ রাজনীতির ঘেরাটোপে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তার মর্যাদা হারাতে থাকে। রাষ্ট্রের প্রায় সব সেবা প্রতিষ্ঠান পরিণত হতে থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এর চেয়ে মর্মান্তিক হতাশার কারণ আর কী হতে পারে! প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে চোখ বুলিয়ে আর শ্রবণেন্দ্রিয় খোলা রেখে দৃষ্টি ছুড়ে দিলে বিবদমান দলসমূহের নেতানেত্রীদের গৎবাঁধা ঝগড়া শুনতে, দেখতে ও পড়তে হয়।

তবে আশার কথা, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তায় অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নতির মধ্যদিয়ে এখন আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছে যাচ্ছি। কিন্তু এরপরও কি আমরা স্বস্তিতে আছি? শিক্ষাক্ষেত্রে সুষ্ঠু নীতির অভাব এখনো অশনি সংকেত দেখিয়ে যাচ্ছে। শিশু শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম, বইয়ের বোঝা আর পরীক্ষার বাড়াবাড়ি একটি অসুস্থতার জন্ম দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র জ্ঞানমুখী না হয়ে সার্টিফিকেটমুখী হয়ে পড়ছে। এসব অস্বস্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যেন কটাক্ষ করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি বড় আকাক্সক্ষা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া। বাংলাদেশের মানুষ চরিত্রগতভাবে অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের প্রশ্রয়ে সাম্প্রদায়িক দল ও গোষ্ঠী মাঝেমাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়। কামনা করব মার্চের চৈতন্য আমাদের যূথবদ্ধ হতে শক্তি দিক সাম্প্রদায়িকতার বীজমন্ত্র থেকে মুক্ত হওয়ার।

ইতিহাসচর্চা মানুষকে আশাবাদী হতে শেখায়। ইতিহাস প্রামাণ্যভাবে বলে কোনো অন্ধকারই চিরস্থায়ী নয়। মেঘ কেটে গেলে আবার নতুন সূর্যের আভাস দেখা দেয়। একে পরিচর্যা করতে পারলে ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে আবার চারদিক উদ্ভাসিত করে তুলতে পারে। কিন্তু এর জন্য চেষ্টা করতে হয়। দেশের কল্যাণে এ চেষ্টার গুরুদায়িত্ব নিতে হয় প্রথমত রাজনীতিবিদদের। সরকারি দল বিরোধী দল সবারই সমান দায়িত্ব। দেশপ্রেমের শক্তিতে শুধু দলীয় নয় দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে এসব দলের নেতানেত্রীদের। দল বিবেচনায় নয় যোগ্য মানুষদের দেশ গড়ার কর্মযজ্ঞে যথাযথ সম্মান দিয়ে যুক্ত করতে হবে। রাজনীতিকরা অন্যায় আর দুর্নীতিমুক্ত থাকলেই কেবল সম্ভব প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করা। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনা। এমন অনুকূল অবস্থা তৈরি হলে আমরা পরিশীলিত হওয়ার পথ খুঁজে পাব। ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি যৌক্তিক শুদ্ধতার পথ খুঁজে পাবে। অন্য পেশাজীবী সংগঠনগুলোও অন্যায় দুর্নীতি থেকে নিজেদের বিযুক্ত করতে পারবে। এমন সরল পথে হাঁটতে পারলেই একটি জাতির ভাগ্যাকাশের অন্ধকার দূরীভূত হতে পারে।

একাত্তরের ইতিহাস থেকে কি আমরা আজ প্রণোদনা নিতে পারি না? যেভাবে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ২৪ বছরের শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে একাত্তরে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল একইভাবে নানা মত-পথের বাস্তবতা মেনে নিয়েও জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে ৫০ বছরের জড়তা পেছনে ফেলে আমাদের রাজনীতিকরা কি আজ সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ তৈরি করতে বিভেদের দূরত্ব কমাতে পারেন না? দেশের প্রয়োজনে অন্ধকারের শক্তিকে বর্জন করে নিজেদের পাপমুক্ত করতে পারেন না?

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের রাজনীতিকদের কাছে আজ এমনটিই প্রত্যাশা এদেশের অসংখ্য দেশপ্রেমিক মানুষের।

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত