আজ থেকে দু’বছর আগের কথা। দুলাভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ১৩ শতক জমিতে ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে তুলেন চকপাঁচপাড়া গ্রামের একাদুল হক। চকপাঁচপাড়া ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। একাদুল হক এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর আর পড়াশোনা করেনি। বাড়ির পাশে পতিত জমিতে সবজি ও ব্রয়লার মুরগি চাষে মনোনিবেশ করে। মাত্র ৮০ হাজার টাকা দিয়ে পুরাতন টিনের একটি ঘর কিনে তার মেঝে পাকা করে, একদিন বয়সের এক হাজার বাচ্চা, খাবার ও ভ্যাকসিন কিনে একাদুলের যাত্রা ব্রয়লার মুরগি পালনে। একাদুল গত এপ্রিল মাসে তার তের শতকের ক্ষুদ্র খামারে উৎপাদিত এক হাজার মুরগি বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকা লাভ করে। শুধু একাদুল কেন? ওই গ্রামের মুজিবুর রহমান, বাহার উদ্দিন, আব্দুল জব্বার ও সানাউল্লাহসহ অনেক যুবক মুরগি পালন করে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করছে। এই টাকায় কারও সংসার চলছে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাড় হচ্ছে। এনজিওর ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ হচ্ছে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসার ওষুধ কেনা হচ্ছে। এই আয় থেকে সন্তানের প্রাইভেট পড়ার খরচও জোগাড় করছেন অনেক অভিভাবক।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে প্রাণিসম্পদ খুবই সম্ভাবনাময় খাত হলেও নিকট অতীতে খাতটির বিকাশে কখনই তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এক দশক আগেও উন্নয়ন কর্মকা-ের জন্য প্রাণিসম্পদ খাতে সামান্য বরাদ্দের বিষয় ছিল অকল্পনীয়। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কোরবানির গরুর চাহিদার জন্য নির্ভর করতে হতো পাশর্^বর্তী দেশের ওপর। ২০১৪ সালে ভারতের গরু রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দুই বছরের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এখন দেশে উৎপাদিত পশুতেই কোরবানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে উৎপাদিত পশু দিয়ে কোরবানির চাহিদা পূরণ প্রাণিসম্পদ খাতের একটি বিশাল অর্জন ও সফলতার স্বাক্ষর। তবে এ খাতের উন্নয়নের আরও অনেক সুযোগ রয়েছে। যেমন দুধের চাহিদা পূরণে যদি সম্পূর্ণভাবে দেশীয় খামারের ওপর নির্ভর করা হয়, তাহলে দুধ ও দুগ্ধপণ্য আমদানি বাবদ ব্যয় হওয়া বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পরিকল্পিতভাবে দুগ্ধ শিল্পের উন্নয়ন ঘটানোর মাধ্যমে সেটা করা সম্ভব। এতে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে তা নয়, তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
হালাল মাংসের কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক বাজারে আমাদের প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত। ছোট, বড়, মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি করে প্রাণীর জাত প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ভ্যালু চেইন উন্নয়ন করা সম্ভব হলে খুবই সহজে রপ্তানি বাজার তৈরি করা যেতে পারে। এতে হালাল মাংস রপ্তানির মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন দেশের প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা।
১৯৭১ সালে দেশে জনপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা ছিল ৩০ মিলি। গত ১০ বছরে সরকার কর্র্তৃক গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের ফলে বর্তমানে জনপ্রতি দৈনিক ২৫০ মিলি চাহিদার বিপরীতে দুধের গড় প্রাপ্যতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৬ মিলি। দেশে বার্ষিক দুধের চাহিদা ১৫.২০ মিলিয়ন মেট্রিক টন। উৎপাদন ১০.৬৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ঘাটতি ৪৫.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। দেশে চাহিদার তুলনায় দুধের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। রোজার সময় এই ঘাটতি আরও প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৮২১ কোটি টাকার দুধ আমদানি করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। আর গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সেই দুধ আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। শিক্ষিত কয়েক লাখ তরুণ দুগ্ধ শিল্পে নিয়োজিত হওয়ার কারণে দেশে চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি দিন দিন কমে আসছে। তারপরও দেশের দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি হয় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার। তবে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন মানসম্পন্ন ব্রিড তৈরিতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। উন্নত জাতের অভাবে দেশি গাভির দুধ উৎপাদন সক্ষমতায় বিশে^র অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষুদ্র খামারিরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্ষুদ্র খামারিদের নিবন্ধন করে ভর্তুকির আওতায় আনতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের এ খাতে নিয়োজিত করতে পারলে খাতটির সব ধরনের উৎপাদনে দক্ষতার ছোঁয়া লাগবে। এরই মধ্যে গুঁড়োদুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে। তাই আমিষের চাহিদা পূরণ ও দেশের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণিসম্পদ খাতকে ঢেলে সাজাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের আরও বড় পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে পোল্ট্রি ও দুগ্ধ খামার তৈরি, গরু মোটাতাজাকরণের মাধ্যমে খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। উৎপাদন ছাড়াও বিপণন ব্যবস্থায় নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা যেতে পারে। গ্রামের ছোট পরিসরে প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রাথমিক কারখানা গড়ে তোলা দরকার। কাঁচা ও ঘাস জাতীয় খাদ্যের চাহিদা পূরণে পতিত জমিকে কাজে লাগাতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে প্রাণিসম্পদ খাত।
আজ থেকে ৪০ বছর আগে অর্থাৎ আশির দশকেও বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক দুধের প্রাপ্যতা ছিল ৩০ মিলির কম। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারে সপ্তাহে একদিন রান্না হতো মাংস, তাও যৎসামান্য। ডিম খাওয়া হতো ভাগভাগি করে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনপ্রতি দৈনিক দুধের প্রাপ্যতা বেড়ে হয়েছে ১৭৬ মিলি। এ ছাড়া সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যুক্ত হয়েছে ডিম ও মাংস। পুষ্টি চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু ও কর্মক্ষমতা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ ৬৫ হাজার গবাদিপশু ছিল এবং হাঁস-মুরগি ছিল ২ কোটি ১০ লাখ। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকসেনা ও তার দোসররা প্রায় ২৫ শতাংশ হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু জবাই করে খেয়ে ফেলে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দেখা দেয় খাদ্য ও পুষ্টি সংকট। সেই বাংলাদেশে আজ চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে মাংস ও ডিম। ২০২০ সালে বাংলাদেশে গবাদি পশুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৬০ হাজার ও হাঁস-মুরগি ৩৫ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার। জাত উন্নয়নের ফলে গরু-মহিষের দুধ উৎপাদন বেড়েছে ৬ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ প্রত্যক্ষ ও ৫০ ভাগ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপিতে স্থিরমূল্যে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এছাড়া সস্তায় সব শ্রেণির মানুষের জন্য প্রাণিজ আমিষের জোগান দিচ্ছে পোলট্রি শিল্প। বর্তমানে পোলট্র্রি খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হচ্ছে ২৫ লাখ মানুষের। এই শিল্পের ওপর ভর করে সারা দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকান। পোল্ট্রি শিল্পে উৎপাদিত মাংসের বড় একটি অংশই বিক্রি হচ্ছে এসব খাবারের দোকানে। আর এ খাতেও কর্মসংস্থান হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের। এর বাইরে বর্তমানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কোয়েল, কবুতর ও টার্কি খামার। প্রাণিজ আমিষ সরবরাহে এসবের অবদানও কম নয়।
১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদন হয় ১০ লাখ মেট্রিক টন, মাংস উৎপাদন হয় ৫ লাখ মেট্রিক টন ও ডিম উৎপাদন হয় ১৫০ কোটি। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন, মাংসের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন এবং ডিমের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩৬ কোটি। বছরে জনপ্রতি ১০৪টি হিসাবে বর্তমানে দেশে ডিমের চাহিদা ১ হাজার ৭৩২ কোটি এবং দৈনিক জনপ্রতি ১২০ গ্রাম হিসেবে বছরে মাংসের চাহিদা ৭২ লাখ ৯৭ হাজার টন। সে বিবেচনায় বাংলাদেশ ডিম ও মাংস উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, উদ্বৃত্ত একটি দেশ। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মাংস উৎপাদনে এবং ২০১৯ সালে ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে করোনা সংক্রমণরোধে প্রাণিজ আমিষের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই লকডাউনের কারণে প্রাণিজ আমিষ বিশেষ করে দুধ, ডিম ও মাংসের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণন যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকেও সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে।
লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন