বোরো সংগ্রহ অভিযানে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

আপডেট : ০৬ মে ২০২১, ০৩:০৫ এএম

বিগত ২৬ এপ্রিল খাদ্যমন্ত্রী এ বছরের বোরো সংগ্রহ অভিযান সম্পর্কে গৃহীত কতিপয় সিদ্ধান্ত এক ভার্চুয়াল সভায় গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করেছেন। এবারে এই মৌসুমে কেনা হবে ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল; দর প্রতি কেজি ৪০ টাকা, ১.৫০ লাখ টন আতপ চাল; দর প্রতি কেজি ৩৯ টাকা এবং ৬.৫০ লাখ টন; দর প্রতি কেজি ২৭ টাকা। ধান সংগ্রহ শুরু হবে ২৮ এপ্রিল এবং চাল সংগ্রহ শুরু হবে ৭ মে থেকে; এবং তা চলবে আগস্ট পর্যন্ত। এবারের সংগ্রহ অভিযান নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এখন সরকারি ভাণ্ডারে চালের মজুদ মাত্র ২.৯৮ লাখ টন। মজুদ গড়ে তুলতে সরকার বিলম্বিত পদক্ষেপে চাল আমদানিতে মরিয়া। এদিকে মড়ার উপর খাঁড়ার জবরদস্ত ঘা হয়ে অতিমারী কভিড-১৯ তার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সদম্ভে এগিয়ে চলেছে। ভারতে এর থাবা এতই চরম আকার ধারণ করেছে যে, আমাদের সীমান্ত পর্যন্ত বন্ধ করতে হয়েছে; ফলে সেখানকার আমদানি-রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়েছে। ওই দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা এখন অনুমান করা কঠিন। খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ মিয়ানমারে এ মুহূর্তে খাদ্যঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম দৃশ্যমান লক্ষণ লু হাওয়ায় দেশের অনেক অঞ্চলে ধান চিটা হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মোটা চালের বাজারদর এখনো বেশ চড়া। এর মধ্যে আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য পত্র দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।

একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে দেখলাম, মিল মালিকরা এবার চালের সংগ্রহ মূল্য প্রতি কেজি ৪৩ টাকা যৌক্তিক মনে করেন। সেখানে কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, মূল্যের বিষয়টি সমাধান করতে সরকারের উচিত মিলারদের সঙ্গে অবিলম্বে বৈঠকে বসা। তার আরেকটি পরামর্শ হলো মজুদ বৃদ্ধি করতে কৃষকদের কাছ থেকে কিছুটা বেশি আর্দ্রতাযুক্ত ধান ক্রয় করা; কারণ, পরে এ ধান শুকানোর নানা রকম সুযোগ রয়েছে। নীল রতন হালদার আরেকটি নিবন্ধে এবারের ধান-চালের মূল্য নিয়ে একটি মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন। তার মতে গতবারের তুলনায় এবার ধানের মূল্য কেজিতে ১ টাকা এবং চালের মূল্য ৪ টাকা বৃদ্ধি করায় ৪০ কেজি ধানে একজন কৃষক বেশি পাবেন ৪০ টাকা, আর ওই ৪০ কেজি ধানের ২৭ কেজি ফলিত চালের জন্য মিলার অতিরিক্ত পাবেন (২৭ী৪)=১০৮ টাকা। সরকারি সংগ্রহ অভিযানে ধান কেনা ও তার মূল্য সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই এই নিবন্ধ।

সত্যি কথা বলতে কি, বর্তমান বাস্তবতায় সম্প্রদায় হিসেবে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করে মূল্য সমর্থন দেওয়ার সুযোগ নেই; তাদের একটি ভগ্নাংশের জন্য কিছু করা যায় মাত্র। এখন সরকারি পর্যায়ে কার্যকর ধারণক্ষমতা ২০ লাখ টন। সাইলোর ২.৭৫ টন ধারণক্ষমতা শুধু গম সংরক্ষণের জন্য; সেখানে গম না থাকলেও অন্য কোনো পণ্য রাখা যায় না। সারা দেশে বাকি যে ১৭.২৫ লাখ টন ধারণক্ষমতা রয়েছে, তাতে বর্তমান মজুদ (চাল ও গম) ৫.১০ লাখ ও আমদানি খাতে অপেক্ষমাণ ৭.৫ লাখ টনসহ বেশ কিছু খালি বস্তা সংরক্ষণ করতে হবে। তাতে গুদামে খালি জায়গা থাকবে মাত্র ৫ লাখ টনের মতো। জুনের মধ্যে ৪-৫ লাখ টন খাদ্যশস্য উত্তোলিত হলে তখন খালি জায়গা দাঁড়াবে ১০ লাখ টনের। এবার ৬.৫ লাখ টন ধানের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, তার জন্যই প্রয়োজন হবে ৮ লাখ টন ধারণক্ষমতা। কারণ, ধানের আয়তন চালের দেড় গুণ। তখন লক্ষ্যমাত্রার ১১.৫ লাখ টন চালের মধ্যে মাত্র ২ লাখ টন কেনা যাবে, বাকিটা স্থান সংকুলান অভাবে কেনা সম্ভব হবে না।

এবার লক্ষ্যমাত্রার ১১.৫ লাখ টন চাল সরবরাহ করতে মিলারদের ১৭ লাখ ধান কিনে ছাঁটাই করতে হবে। এর পরোক্ষ প্রভাবে বাজার চড়া হবে। তা ছাড়া চাল সংরক্ষণে জায়গাও কম লাগে; একটি ৫০০ টনি গুদামে যেখানে ৪৫০ টন ধান সংরক্ষণ করা যায়, সেখানে চাল করা যায় ৭৫০ টন। ফলে আগে চাল কেনা হলে মিলারদের ধান ক্রয়ের চাপে বাজারদর বেড়ে যায়; তাতে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত সব চাষির ভালো মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এবার বোরো মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা চালের আকারে ২ কোটি টনের বেশি, ধানের আকারে যার পরিমাণ ৩ কোটি টন। দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৬৫ লাখ। সরকারি লক্ষ্যমাত্রার আওতায় প্রতি পরিবার থেকে ১ টন করে ধান কেনা হলে মাত্র ৮ লাখ পরিবার উপকৃত হবে; বাকি বিশাল অংশ থেকে যাবে তালিকার বাইরে। বঞ্চিত বৃহৎ কৃষক সম্প্রদায়ের মাঝে নিশ্চয়ই এর জন্য হতাশা বিরাজ করবে। আবার ধানে গুদাম আবদ্ধ হয়ে থাকায় পুরো চালও কেনা যাবে না; অর্জন করা সম্ভব হবে না সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা, তাতে বাজারে সাময়িক মন্দাভাব নেমে আসতে পারে। ফলে সাধারণ চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার ধান ছাঁটাই করে যখন গুদাম খালি করা সম্ভব হবে, তখন সময়ের ব্যবধানে চালের দাম বেড়ে যাবে। তখন আর চাল সংগ্রহের সুযোগ থাকবে না। গতবার এমনটা হয়েছিল। এজন্য চাষিদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তাদের নিজেদের দ্বারা পরিচালিত সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তলার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকার সেখানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারে।

ধানের মূল্যের সঙ্গে চালের দাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধান থেকে চাল উৎপাদনের সরকারি অনুপাত ৬০:৪০। শতাংশের হিসাবে ধান থেকে ৬৬.৬৬ ভাগ চাল পাওয়া যায়। এই অনুপাত বিবেচনায় গত বছর চালের দাম ধানের চেয়ে অনেক কম করে নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা হিসেবে ১০০ কেজির দাম ২৬০০ টাকা। ছাঁটাই কমিশন ও পরিবহন ভাড়া বাবদ কুইনটালে ১০০ টাকা ধরা হলে ২৭০০ টাকায় চাল উৎপাদিত হতো ৬৬.৬৬ কেজি। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে খরচ পড়ত ৪০-৫০ টাকা। এবারের এ রকম হিসাবে চালের খরচ পড়ছে ৪২ টাকা। সরকার নির্ধারণ করেছে ৪০ টাকা; এ দরও ধানের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তবে মন্দের ভালো। এবার আশা করা যায় উল্লেখযোগ্য কোনো ফসলহানি না হলে এবং সংগ্রহ কাজে জটিলতা পরিহার করে গতিশীলতা আনা গেলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব।

অনেকের ধারণা এবার চালের দাম কেজিপ্রতি যে ৪ টাকা বাড়ানো হয়েছে, তা বুঝি মিলাররা অনুদানের টাকার মতো সরাসরি পকেটস্থ করে ফেলবেন। আসল কথা হলো মিলার তো আর ধান চাষ করেন না, তিনি বাজার থেকে ধান কিনে মিলে চাল প্রক্রিয়াজাত করেন। গুদামে ৪০ টাকা কেজি ধরে চাল বিক্রি করে কিছু লাভ করতে হলে তাকে বাজার থেকে ২৬ টাকা কেজির নিচে শু নো ধান কিনতে হবে। তারা তো আর দাক্ষিণ্য করতে ব্যবসা পেতে বসেননি; ধান সংগ্রহের তালিকা থেকে বাদপড়া বিপুলসংখ্যক চাষিদের কাছ থেকে লাভজনক দরে ধান কিনতে পারলেই কেবল তারা গুদামে চাল জমা দিয়ে লাভ করবেন। গতবার ধানের বাজার দরে সেটা সম্ভব না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। মিলারদের আমরা মধ্যস্বত্বভোগী ও মুনাফাখোর হিসেবে যতই গালমন্দ করি না কেন, চাল উৎপাদন কাজে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য। পণ্যের মূল্য সংযোজনের প্রতিটি পর্যায়ে উদ্যোক্তা তার মুনাফা যুক্ত করে পণ্য বিক্রি করবেন, এটাই স্বাভাবিক। মিলাররা সেটা করলে দোষের কিছু নেই। তবে তারা যদি তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে তবে তার প্রতিকার ও প্রতিরোধ কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি। রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো তারাও এখন ‘নেসেসারি ইভিল’ হয়ে উঠেছেন। এজন্য নির্দোষ ডিজিটাল পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা অত্যন্ত অপরিহার্য। বর্তমানে ধান ছাঁটাই করে চাল উৎপাদন কাজে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ অনেক স্বয়ংক্রিয় চালকল গড়ে উঠেছে। এদের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। অবকাঠামো, পুঁজি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বিবেচনায় ছোট এই গোষ্ঠীটি যথেষ্ট শক্তিশালী। এই অলিগার্কের দাপটে ইতিমধ্যে অনেক হাস্কিং মিলের পথে বসার উপক্রম হওয়ায় বাজারে পূর্ণ প্রতিযোগিতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবীক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে।

যাই হোক, এক্ষণে সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠভাবে বোরো ফসলের উৎপাদনের পরিমাণ নির্ণয় করা। উৎপাদন ঘাটতি থাকলে অগ্রভাগে চাল আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য তারতম্য না থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযান অবাধ ও ঝামেলামুক্ত করে দ্রুত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য যেখানে চাল কেনার সুযোগ নেই, সেখানে অগ্রাধিকার দিয়ে ধান কিনতে হবে, অন্যত্র চাল কেনায় গুরুত্ব দিতে হবে; সেখানে ধান পরে কেনা সুবিধাজনক হবে। সেই সঙ্গে দ্রুত ধান ছাঁটাই করার ব্যবস্থা নিতে হবে। মিলারদের চাল জমা দেওয়ার সময় বাড়ানো যাবে না, সময়মতো চাল জমা না দিলে তা বাতিল করে যারা সমর্থ হবেন, আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে তাদের চাল সরবরাহের অনুমতি দিতে হবে। তাতে বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে এবং ধানের দর বেড়ে যাবে। ফলে তালিকা থেকে বাদপড়া চাষিরা উপকৃত হবেন। সরকারেরও নিরাপত্তা মজুদ দ্রুত গড়ে উঠবে।

লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত