অপ্রতিরোধ্য আমলাতন্ত্র

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ১১:২০ পিএম

উত্তরাধিকার সূত্রে পাকিস্তানি শাসকরা ব্রিটিশের তৈরি যে রাষ্ট্রটি পেয়েছিল, সেটা ছিল আদ্যোপান্ত আমলাতান্ত্রিক। সম্রাট-সম্রাজ্ঞীরা থাকতেন লন্ডনে, তাদের হয়ে রাষ্ট্রশাসনের ও প্রজাশোষণের কাজটা করত আমলারা ওপরেরগুলো ব্রিটিশ, নিচেরগুলো স্থানীয়। আমরা লড়াই করেছি আমলাতান্ত্রিক ওই রাষ্ট্রকে কেবল কেটে ছোট করার জন্য নয়, তাকে ভেঙে ফেলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যই। সেটা সম্ভব হয়নি। নতুন রাষ্ট্র বরং আগের চেয়েও বেশি মাত্রায় আমলাতান্ত্রিক হয়েছে। এ রাষ্ট্রে যারা শাসন করেন তারা আমলাদের ওপরই নির্ভর করেন, জনপ্রতিনিধিদের ওপরে না-করে। তা ছাড়া প্রকৃত জনপ্রতিনিধি তো পাওয়াই যায় না। আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে তৎপর অংশটি হলো গিয়ে গোয়েন্দা বাহিনী। অতীতকালের রাজা-বাদশাহদের মতোই একালের সরকারপ্রধানরাও খবরাখবর যা পান গোয়েন্দাদের মাধ্যমেই। বাংলাদেশের গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস আসলে পুঁজিবাদী উন্নতির এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তি বৃদ্ধির নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস।

রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক কায়কারবারের মুখোমুখি সবাইকেই হতে হয়। গ্রামে, শহরে ও বিদেশে। আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিশাল বিশাল অভিযোগ। ছিটেফোঁটা খবর সংবাদপত্রে আসে। তদন্ত হবে বলে শোনা যায়। বিচার হয়েছে বলে জানা যায় না। করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অযোগ্যতার তো বটেই, দুর্নীতির যেসব খবর প্রকাশ পেয়েছে তাতে মানুষের চোখ কপালে উঠেছে। এসব দুর্নীতির খবর বিশেষভাবে আসছিল দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায়। খবর সংগ্রহ করেছিলেন যে সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম, সম্প্রতি তিনি তার ওই পেশাদারি দায়িত্ব পালনের জন্য গিয়েছিলেন সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। সেখানে তাকে একা পেয়ে প্রবল বিক্রমে আটক করেন দপ্তরের কর্মচারীরা। আটকে রাখা হয়েছিল একটানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল তার মোবাইল ফোন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি মেঝেতে পড়ে যান। সে অবস্থায় হাসপাতালে না নিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শাহবাগ থানায়। খবর পেয়ে তার সহকর্মীরা অবস্থান নেন থানার সামনে। রাতভর তারা থানা পাহারা দেন। পরের দিন সকালে রোজিনা ইসলামকে হাজির করা হয় আদালতে। পরিণতি ঘটে কারাবাসে এবং ছয় দিন পরে জামিনে মুক্তি পান এই শর্তে যে তার পাসপোর্ট জমা রাখতে হবে। পাসপোর্ট হচ্ছে পরিচয়পত্র। রোজিনা ইসলাম জামিন পেয়েছেন, কিন্তু তার পরিচয়পত্র এখন আটক অবস্থায় এবং তার বিরুদ্ধে যে অন্যায় মামলাটি করা হয়েছে, সেটি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে ঘাড়ের ওপরে।

বুঝতে অসুবিধা নেই, আমলাতন্ত্র কত ক্ষমতাধর, কেমন বেপরোয়া। ওই ঘটনায় প্রতিবাদ হয়েছে। দেশে অনেক, বিদেশেও কম নয়। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা, কর্মী সব মহল থেকেই অস্বস্তির বিরল প্রকাশ দেখা গেল। কিন্তু সরকারের ভেতরে যে সরকার আছে, আমলাতন্ত্র যার নাম, সেটি মোটেই বিচলিত হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ওই নারী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, নিজেদের নিষ্পাপ ঘোষণা করে।

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে তথ্য-পাচারের আনীত অভিযোগটি। এটা করা হয়েছে একশত বছরের পুরনো একটি আইনকে বস্তা হাতড়ে ময়লা ঝেড়ে উদ্ধার করে এনে। আইনটি প্রবর্তন করা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। স্বদেশি যুগে। ১৯১১ সালে। সেই সময়ে সরকারি স্থাপনার ওপর স্বদেশি বিপ্লবীদের আক্রমণ ঘটছিল। স্পর্শকাতর স্থাপনা সম্পর্কে তথ্য যাতে বিপ্লবীদের হাতে চলে না যায় তার জন্যই ওই আইনি ব্যবস্থা। নাম অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ‘সরকারি গোপন তথ্য’ সংরক্ষণ। সরকারি কর্মচারীদের ভেতর বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ ছিলেন। তাদের নিবৃত্ত করাই ছিল এর লক্ষ্য। ১৯২৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। সেটিও কথিত গুপ্তচরদের নিবৃত্ত করার জন্যই; সাংবাদিকদের হেনস্তা করার জন্য নয়। বস্তুত ওই আইনে কোনো সাংবাদিককে কখনো হয়রানি করার ঘটনা ঘটেনি। ব্রিটিশ আমলে নয়, পাকিস্তান আমলে নয়, বাংলাদেশের গত পঞ্চাশ বছরের সময়কালেও নয়। কাজটি এবারই প্রথম করা হলো এবং করতে গিয়ে এটা দেখা হলো না যে এই আইন সাংবাদিকদের বেলায় প্রযোজ্য নয়। কারণ সাংবাদিকরা গুপ্তচর নন; তাদের পেশাই হলো সংবাদ সংগ্রহ। সংবাদ তারা তৈরি করেন না, সংগ্রহ করেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে সংগ্রহ করেন না, করেন জনগণের স্বার্থে। তারা সংবাদ সংগ্রহ না করলে তো সংবাদপত্রই থাকবে না। আর যে আইনটিতে এই মামলা সেটি ‘অস্তিত্বহীন’ বলেই আইনজ্ঞদের ধারণা। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে যে সংবিধান গৃহীত হয়েছে ১৯৭২-এ, সেখানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের যে তালিকা রয়েছে তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেকোনো আইনই বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে, এমনটাই বলা রয়েছে; আর অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যে মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেটা তো অস্পষ্ট নয়। প্রশ্ন তো থাকে এটাও যে ওই আইন এখনো বলবৎ আছে যারা বলছেন তারা কী এটাই বোঝাতে চাইছেন যে, বাংলাদেশ এখনো একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র? এর তথ্য জানার অধিকার নাগরিকদের নেই? এবং নাগরিকরা আসলে এর শত্রুপক্ষ?

ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি ছবিতে দেখা গেছে আমলাদের একজন সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গলা চেপে ধরেছেন। একেবারে আক্ষরিক অর্থেই। এটিকে সংবাদপত্রের তথা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের প্রতীক ভিন্ন অন্য কোনো নাম দেওয়া সম্ভব কি?

আমলাতান্ত্রিকতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য পারস্পরিক দোষারোপ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করছেন টিকা আমদানির ব্যাপারে তার মন্ত্রণালয় যোগাযোগগুলো ঘটিয়ে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চটপট কাজ করছে না। আবার সাংবাদিক-লাঞ্ছনার যে ঘটনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘটিয়েছে, তাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিদেশিদের কাছে নানা প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।

সাংবাদিক লাঞ্ছনা, এমনকি হত্যাকাণ্ডও, নতুন কোনো ঘটনা নয় আমাদের এই স্বাধীন দেশে। হামেশাই ঘটছে। কিন্তু এবারের ঘটনাটা যে-পরিমাণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে তেমনটি অন্য কোনোটির বেলায় তা ঘটেনি। এর কারণ হচ্ছে এটি ঘটেছে সচিবালয়ে এবং অন্য সাংবাদিকদের জ্ঞানের মধ্যে। ফলে প্রচার পেয়েছে সঙ্গে সঙ্গে। দ্বিতীয়ত, লাঞ্ছিত সাংবাদিক একজন নারী। তৃতীয়ত, এই সাংবাদিক তার পেশাদারি ক্ষেত্রে সুপরিচিত ও সম্মানিত। চতুর্থত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কে তিনি যেসব প্রতিবেদন ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছেন তাদের সবগুলোই ছিল চাঞ্চল্যকর এবং কোনোটিরই প্রতিবাদ আসেনি। অর্থাৎ কোনোটিই মিথ্যা নয়। সর্বোপরি, আক্রমণটা সরকারি দল বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠী ঘটায়নি; কাজটা আমলাতন্ত্রের, যার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের তো বটেই, দেশবাসীর অসন্তোষও ব্যাপক। আমলাতন্ত্রের ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে খুব সন্তুষ্ট তাও মনে হয় না।

একটা নতুন জিনিসও ঘটেছে। যেটা আশাপ্রদ। সেটি হলো ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের ঐক্য। প্রায় সব পেশার মানুষরাই এখন সরকার-সমর্থক ও সরকারবিরোধী এই দুই শিবিরে বিভক্ত। এমনকি পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখেছি সাংবাদিকরা পেশাগত তো অবশ্যই, রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেছেন। পাকিস্তানের দুই অংশের সাংবাদিকরাও এক হয়ে লড়েছেন। বাংলাদেশ আমলে যেটা আর দেখা যায়নি। এবার সাংবাদিকরা যে এক হলেন সেটা দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলেই। তা দেয়ালে পিঠ এখন অনেক পেশার মানুষেরই ঠেকে গেছে। মেহনতি মানুষদের তো ঠেকেছে সবার আগে। সাংবাদিকদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ আশা জাগায়। কিন্তু ভরসা করা কঠিন। কারণ তাদের বিভক্ত করার স্বার্থান্বেষী চেষ্টা যে হার মানবে তা নয়। সে-চেষ্টা অতিক্ষুদ্র তো নয়ই।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত