উপেক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ১১:২২ পিএম

কভিড-সংক্রমণে জর্জরিত দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘিরে বড় প্রত্যাশা কখনোই ছিল না। কিন্তু আশা-নিরাশার একটা হালকা দোলাচল ছিল। মনে হয়েছিল, এ বছর মানসিক স্বাস্থ্য খাতে অন্তত কিছু অর্থ বরাদ্দ হবে। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কোনো কথা শোনা যায়নি।

‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে’ ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী ৬ লাখ কোটি টাকার যে বাজেট প্রস্তাব সংসদে তুলে ধরেছেন, সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, জাতীয় জীবনে করোনাভাইরাস যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, সেজন্য স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়েছেন।

যদিও মহামারীর বাস্তবতায় স্বাস্থ্যের এই বরাদ্দ প্রত্যাশা কিংবা প্রয়োজন, কোনোটার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের জন্যও কোনো দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। বাজেটে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার সঙ্গে ‘মহামারীকালে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে’ ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি (২০২০-২১) অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাত বরাদ্দ পেয়েছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। পরে সংশোধনে তা বেড়ে ৩১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা হয়। জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য গেল বাজেটেও ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের স্বাস্থ্য বরাদ্দের আকার ছিল মূল বাজেটের ৫ দশমিক ১ শতাংশ, এবার তা ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ তার বেশির ভাগই সরকারি চিকিৎসার অবকাঠামোগত উন্নতি ও বেতন-ভাতার জন্য খরচ করা হবে। বাকিটা কভিডসহ অন্যান্য প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ব্যবস্থায়। প্রসঙ্গত, মানসিক স্বাস্থ্য কিন্তু প্রাইমারি হেলথ কেয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে পড়ে না। বহুবার দাবি জানানো হয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কিন্তু কর্ণপাত করেননি কেউ। স্বাভাবিকভাবেই এ বছরের বাজেটেও মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছে। কেবল মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য মেডিটেশন সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি আরও ১ বছর বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে বাজেটে।

অবশ্য প্রতি বছরই একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি চলে। স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয় না। অন্যদিকে ধুলোয় গড়াগড়ি খায় মানসিক স্বাস্থ্য। মানসিক স্বাস্থ্য খাতে যতটুকু যা বরাদ্দ আসে, তার প্রায় পুরোটাই ব্যয় হয় অবকাঠামো খাতে। সাধারণ মনোরোগীদের কথা ভাবাই হয়নি।

দেশের স্বাস্থ্য খাতের একটা পরিবর্তন দরকার, করোনাভাইরাস মহামারী সে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু এবারের বাজেটে তার প্রতিফলন নেই। এবারের বাজেটে সরকার কভিড ব্যবস্থাপনাকে কিছুটা গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্য খাতকে নয়। স্বাস্থ্যের যে বহুমাত্রিক দিক আছে, সেটাকে পরিবর্তনের জন্য যত গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল তা দেওয়া হয়নি।

অথচ সেই ১৯৪৮ সালেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যের যে সংজ্ঞা দিয়েছিল, তা এখন আরও প্রণিধানযোগ্য। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘কেবল নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।’ কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বাস্থ্য’ শব্দটি সীমাবদ্ধ হয়ে আছে ‘শারীরিক’ অংশটুকুর মধ্যে। পুরো পৃথিবীতে মানসিক স্বাস্থ্য গুরুত্ব পেলেও আমাদের এখানে পায়নি। আমাদের দেশের আমলারা মনে করেছে, মনোরোগীদের চিকিৎসা হাসপাতালে, বলা ভালো, পাগলাগারদে রেখেই করা উচিত। কিন্তু এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়টি কোনোমতেই হাসপাতাল-কেন্দ্রিক হতে পারে না! মানসিক স্বাস্থ্যের যে মূলগত লক্ষ্যসুস্থ হয়ে ওঠার পর একজন মানসিক রোগী সমাজে থেকেই চিকিৎসা গ্রহণ করবেন, সামাজিক জীবনযাপন করবেনউপেক্ষিত হয়েছে সে বিষয়টিই। যেকোনো উন্নত দেশের বাজেটে সাধারণত আয়-ব্যয়ের হিসাব পেশ করা হয়। কোন খাতে কত খরচ হবে, তার একটা দিকনির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে বাজেটের সঙ্গে একগুচ্ছ প্রকল্প ঘোষণা করে দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প শুনে আমরা করব কী! এগুলো তো কার্যনীতি! এসব প্রকল্প আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাষ্ট্র বা সরকারের অগ্রাধিকার আসলে কী। সেই অগ্রাধিকারের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য যে নেই, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট!

মনে রাখতে হবে, এটি কভিড-পরবর্তী সময়ের দ্বিতীয় বাজেট। পুরো করোনাকাল এবং সেই সঙ্গে লকডাউনের দীর্ঘ সময় জুড়ে মানুষের মনের ওপর নানা কারণে অকথ্য চাপ পড়েছে। টান পড়েছে কর্মসংস্থানে, রুটি-রুজিতে। হাজার হাজার মানুষ কাজকর্ম হারিয়েছে। অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। রুটি-রুজি নিয়ে অনেক মানুষ দিশেহারা জীবনযাপন করেছেন।

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় আমাদের চারি ধারে ভর করে আছে নানারকম আতঙ্ক। নিজের, পরিবারের বা প্রিয়জনের করোনা-আক্রান্ত হওয়ার, করোনাকালে চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ার এবং অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়, চাকরি হারানোর ভয়, বেতন কমার ভয়, ব্যবসা হারানোর শঙ্কা, উদ্বাস্তু হওয়ার ভয়। করোনাকাল যেন আমাদের জীবন থেকে যাচ্ছেই না। মানুষ ভয় উপেক্ষা করে পথে বের হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকের মন থেকে অস্বস্তি যায়নি। কত মানুষ তাদের পরিবার-পরিজন হারিয়েছে এই মহামারীতে। এ ছাড়া দেশের অসংখ্য নারী ও শিশু এ সময় ভয়াবহভাবে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের অবস্থা ছিল এমনবাইরে মহামারী, ঘরে নির্যাতনকারী। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, করোনাকালে অসংখ্য নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও খাদ্যাভাব এবং সহিংসতা ও নিপীড়নের ঝুঁকির মধ্যে অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের অনেক বেশি বয়সীদের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন। এ বিয়েগুলো মেয়েদের অধিকার ক্ষুণœ করছে এবং বিষণœতাসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ায় বয়ঃসন্ধিকালেই অনেক মেয়ে গর্ভধারণ, সহিংসতা ও অপুষ্টির ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।

এই মহামারীতে শিশুদের জীবনে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের সম্মুখীন। শিশুরা ঘরবন্দি হয়ে আছে প্রায় দেড় বছর ধরে। শিশুদের কাছে স্কুলটা শুধু লেখাপড়া বা ক্লাস করার জায়গা নয়, আনন্দেরও একটা জায়গা। যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, কিছুটা হলেও বাইরের জগতের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। নাচ, গান, ছবি আঁকা, কারাতে কিংবা সাঁতার শেখার ক্লাসগুলোও ছিল তাদের জন্য আনন্দের। ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলতে যেত, সাইকেল চালাত, সব বন্ধ হয়ে গেছে। পড়াশোনার নামে অনলাইন ক্লাস শিশুদের ওপর এক ধরনের অত্যাচার হয়ে দেখা দিয়েছে। গ্রামের শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও খারাপ। সেখানে হাতেগোনা কিছু শিক্ষার্থী ছাড়া অধিকাংশই পড়াশোনা করার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না।

কভিডের এ সময়টা যেন মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টাকে মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। আতঙ্ক, উদ্বেগ, বিষণœতা, আত্মহত্যার মতো সমস্যাগুলো নিয়ে সারা বিশ্বে আলোচনা চলছে। কিন্তু আমরা যখন বাজেট দেখলাম, তখন সেখানে মানুষের দুর্দশা, মানসিক সমস্যা সমাধানের কোনো চেষ্টা বা প্রতিফলন সেখানে খুঁজে পেলাম না। অর্থাৎ মানুষের দুর্দশা থেকে রাষ্ট্র কোনো শিক্ষা নিল না, উল্টো মনোরোগী বা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে বাকি জগতের যেন একটা সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে দিল!

অথচ মানসিক স্বাস্থ্য সত্যিকারেই একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, যা মোটেও উপেক্ষা করা যায় না। কারণ ২০৩০ সালের মধ্যে সব দেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজ (ইউএইচসি) অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মানসিক স্বাস্থ্য ছাড়া কোনো স্বাস্থ্য হতে পারে না এবং স্বাস্থ্য ছাড়া টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না।

কিন্তু আমাদের দেশের শাসকরা অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এদিকে আমাদের রাজনীতিও ক্রমেই এক দমবন্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। রাজনীতিতে চলছে কেবলই ত্রাস সৃষ্টি আর দেখে নেওয়ার হুমকি। স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হচ্ছে একটা প্রবল ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ! খুব সচেতনভাবেই এই ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে শুধু ক্ষমতা দখল কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য! এই পরিবেশে থাকতে হলে যেকোনো সাধারণ নাগরিকের মানসিক স্বাস্থ্য শান্তি বিঘিœত হওয়ার কথা! করোনার পাশাপাশি রাষ্ট্রও এক ধরনের ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে সাধারণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য টালমাটাল করে তুলছে। তাকে মনোরোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে মনোরোগীদের জন্য তার ভাঁড়ারে বিরাট শূন্য ছাড়া আর কিছুই নেই! এই দ্বিচারিতাই এখন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের মুখ!

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত